kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

মাদক গডফাদারদের আত্মসমর্পণে কি মাদক বন্ধ হবে?

এ কে এম শহীদুল হক

৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মাদক গডফাদারদের আত্মসমর্পণে কি মাদক বন্ধ হবে?

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ১০২ জন মাদক কারবারি (যাদের ইয়াবা গডফাদারও বলা হয়) অস্ত্র ও মাদকদ্রব্যসহ আত্মসমর্পণ করে। এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জিরো টলারেন্স নীতির পলিসির আওতায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানেরই ফলাফল। মে ২০১৮ থেকে পুলিশ ও র‌্যাব মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। এ অভিযানে পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে এনকাউন্টারে প্রায় ৪০০ মাদক কারবারি নিহত হয়েছে বলে জানা যায়। টেকনাফেও কয়েকজন নিহত হয়েছে। পুলিশি অভিযানে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওই মাদকসম্রাটরা পুলিশের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমপর্ণ করে। এ ধরনের আত্মসমর্পণ সমাজে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানকে আরো গতিশীল করবে এবং অন্যরাও অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ হবে। মাদক চোরাচালানও হ্রাস পাবে।

আত্মসমর্পণকে কেন্দ্র করে টেকনাফ এলাকায় জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বেশির ভাগ মানুষ আত্মসমর্পণকে স্বাগত জানিয়ে আশার আলো দেখতে পায়। আবার কেউ কেউ মনে করে, এতে তেমন কোনো ফল হবে না। তাদের কথা, আত্মসমর্পণকারীরা মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক এলাকায় বিরাজ করছে। তারা বিচিত্র উপায়ে এবং নতুন নতুন এজেন্ট নিয়োগ করে মাদক তথা ইয়াবা চোরাচালান অব্যাহত রাখবে। তাদের এ কথার কিছুটা বাস্তবতাও দেখা যায়। আত্মসমর্পণের দিন এবং তারও পরবর্তী সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিপুলসংখ্যক ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এত কিছু করেও মাদক কারবারিদের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দাবি, অভিযান ও আত্মসমর্পণের পর  টেকনাফ দিয়ে ইয়াবার সরবরাহ প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে গেছে। কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পৃথিবীর কোথাও মাদককে শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার ডলার ব্যয় করে। তবু প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো ও কলম্বিয়া থেকে মাদক আসা বন্ধ করতে পারেনি। তবে অনেক দেশেই মাদকের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে নাগরিকদের মধ্যে স্বস্তি আনতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপের দেশগুলো এবং এশিয়ার সিঙ্গাপুরকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। আমাদেরও সে লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। মাদকের লাগাম ধরে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে।  সরকার সে লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। কিন্তু কাজটি বড়ই কঠিন।

মাদক কারবার যারা করে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, বিবেক, বিচারবুদ্ধি ও মানবিকতা লোপ পায়। তারা অমানুষ হয়ে যায়। টাকা রোজগারের নেশায় তারা কিশোর, তরুণ ও যুবকদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। জাতিকে পঙ্গু বানিয়ে দিচ্ছে। একজন মাদক কারবারি কি একবারও চিন্তা করে না যে তার নিজের ছেলে অথবা মেয়েটি যদি মাদকাসক্ত হয়, তখন তার ও তার সংসারের পরিণতি কী হবে। মাদকাসক্ত ছেলে বা মেয়ের শেষ পরিণতি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া। সংসারের সব সুখ-শান্তি বিনষ্ট হয়ে সংসার ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। টাকা রোজগারের জন্য কোনো লোকেরই দেশ ও জাতির জন্য এত বড় ক্ষতি করা উচিত নয়। যারা করে তারা দেশদ্রোহী, সমাজ ও মানবতাবিরোধী, তাদের সমাজচ্যুত করা উচিত এবং আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।

কক্সবাজারের টেকনাফ বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশের প্রধান রুট। এ কারণে টেকনাফে অসংখ্য লোক ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত। ইয়াবা তৈরি হয় মিয়ানমারে। মিয়ানমারের মাদক কারবারিরা সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় বাংলাদেশে ইয়াবা সরবরাহ করে। গ্রেপ্তারকৃত মাদক কারবারিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, ইয়াবা ক্রয়ের জন্য কোনো অগ্রিম বা নগদ টাকা দিতে হয় না। ইয়াবার চালান কক্সবাজার জেলার সীমানা পার হলে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। ভারত, দুবাই, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশে বসবাসরত হুন্ডি ব্যবসায়ীদের পেমেন্ট দেওয়া হয়। তারা মিয়ানমারের কারবারিদের ইয়াবার মূল্য পরিশোধ করে। এ ধরনের অনেক হুন্ডি ব্যবসায়ী আছে, যারা মাদক কারবারে অর্থ লেনদেন করে।

শুধু মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার বা তারা আত্মসমর্পণ করলে কিংবা এনকাউন্টারে নিহত হলেই মাদক কারবার বন্ধ হয়ে যাবে—এটা ভাবার সুযোগ নেই। যদি দেশের ভেতরে মাদকের চাহিদা থাকে, তবে যেকোনো উপায়েই হোক, মাদকাসক্তদের কাছে মাদক পৌঁছে যাবে। এক জরিপে দেখা গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১০ শতাংশ মাদক জব্দ করতে পারে। বাকি মাদকদ্রব্য গোপনে ও কৌশলে মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে যায়। এক কারবারি কারবার ছাড়লে অন্য কারবারি সৃষ্টি হবে। পুরনো রুটের পরিবর্তে নতুন নতুন  রুটের সৃষ্টি হবে। নতুন নতুন পাচারকৌশলও সৃষ্টি হবে। কারণ মাদক কারবার খুবই লাভজনক একটি কারবার। একজন মাদক কারবারি এক লাখ ইয়াবা তার নির্ধারিত স্থান পার করে দিলে কমপক্ষে দুই লাখ টাকা মুনাফা পায়। কাজেই অধিক টাকা রোজগারের নেশায় কারবারি কিংবা পরিবহনকারীরা  জীবনের ঝুঁকি নিতে কুণ্ঠা বোধ করে না। অপরাধীরা সব সময় মনে করে, তারা গোপনে অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে। কেউ বুঝতে বা জানতে পারবে না। তাই তারা অপরাধ সংঘটন করতে সাহস পায় এবং ঝুঁকি নিয়ে থাকে। এ কারণেই সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল হয় না। তবে কার্যকর উদ্যোগ নিলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে ব্যাপকভাবে অভিযান করে হয়তো মাদক সরবরাহ হ্রাস করা যাবে। কিন্তু তা কত দিন বজায় থাকবে। ভেতরে চাহিদা থাকলে কোনো না কোনো পন্থায় সরবরাহ আসবে। এ জন্য সরবরাহ বন্ধে যে অভিযান চলমান তার পাশাপাশি চাহিদা হ্রাসের পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। চাহিদা হ্রাসের জন্য যারা মাদকাসক্ত আছে, তাদের আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক ও বিশেষায়িত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। মাদকসেবীরা চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হলে তারা আর মাদক চাইবে না। মাদকের চাহিদা কমে যাবে। সুস্থ মাদকসেবীদের পুনর্বাসন ও ফলোআপের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। আর নতুন করে যেন মাদকাসক্ত সৃষ্টি না হয় তার জন্য ব্যাপক গণসচেতনতা ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। মাদকের কুফল ও ভয়ানক পরিণতির কথা কিশোর, তরুণ ও যুবকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করে মাদকের বিরুদ্ধে তাদের মাইন্ড সেট তৈরি করে মাদকের প্রতি ভীতি জন্মাতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, এনজিও, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তি তথা আলেম-উলামা সমাজ, সুধীসমাজ—সর্বোপরি প্রতিটি পরিবার এবং সব শ্রেণি ও পেশার লোকদের মাদকবিরোধী প্রচারণায় ও গণসচেতনতামূলক কার্যক্রমে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততায় মাদকের ব্যাপকতা হ্রাস করা সম্ভব। সচেতনতামূলক কার্যক্রম সর্বদা চলমান রাখতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে মাদক ও জঙ্গির কুফল সম্পর্কে বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে এ বিষয়ে জ্ঞান দিতে হবে। শুধু আইন-আদালত ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা এ সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। এটা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

আত্মসমর্পণ করা মাদক কারবারিদের পুনর্বাসনের  জন্য সরকার চিন্তাভাবনা করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেছেন। এ বিষয়ে সরকারকে সুচিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যারা মাদক কারবার করে বিপুল পরিমাণ ধনদৌলতের মালিক হয়েছে, তাদের আর্থিকভাবে পুনর্বাসনের  প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। জীবনের ভয়ে তারা আত্মসমর্পণ করেছে। তারা শুভ বুদ্ধির উদয়ের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেনি। মাদকের নেটওয়ার্ক তাদের জানা। মাদক কারবার করে কাঁচা টাকা রোজগারের যে নেশা তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে তারা সহজে মুক্ত হতে পারবে—এটা সহজভাবে বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের সূচনাতেই বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। সুযোগ পেলেই তারা পুনরায় মাদক কারবার শুরু করতে পারে। হয়তো নতুন কৌশলে অতি সতর্কতা ও সংগোপনে এ কাজ করবে। তাই তাদের সামাজিক ও প্রশাসনিক চাপে রাখতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে যদি মামলা থাকে, তা প্রশাসনিক আদেশে প্রত্যাহার করা সমীচীন হবে না। বিচারের মাধ্যমেই তা নিষ্পত্তি করতে হবে। মাদক কারবারের মাধ্যমে যে সম্পদ অর্জন করেছে সে ব্যাপারে সরকার ছাড় দেবে কি না, তা ভেবে দেখতে পারে। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রেপ্তারকৃত এবং আত্মসমর্পণকৃত মাদক কারবারিরাই হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তথ্য দিতে পারবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সদস্যকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে শতভাগ সততা নিয়ে মাদক কারবারি ও পরিবহনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বা অন্য কোনো সংস্থার কোনো সদস্যের  নৈতিকতার স্খলন হলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর  প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে কুণ্ঠা বোধ করা যাবে না।

আত্মসমর্পণকৃত মাদক কারবারি যারা দরিদ্র তাদের পুনর্বাসনের চিন্তা করা যায়। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বেশ কয়েকজন দরিদ্র মাদক কারবারিকে পুনর্বাসন করতে পেরেছিলেন। পরে সেটা আর ফলোআপ করা হয়েছে কি না, তা জানা নেই। পুনর্বাসনকৃত ব্যক্তিদের নিয়মিত ফলোআপ করতে হয়, যাতে তারা পুনরায় মাদক কারবারে ফিরে না যায়। একইভাবে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ফলোআপের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে পুনরায় তারা মাদকাসক্ত না হয়।

মাদকের সরবরাহ বন্ধ, মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, দরিদ্র মাদক কারবারি ও পরিবহনকারীদের পুনর্বাসন এবং সবার সক্রিয় অংশগ্রহণে ব্যাপক গণসচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনসাধারণের এদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।   

লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল

বাংলাদেশ পুলিশ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা