kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

কে ফিরিয়ে দেবে জাহালমের তিন বছর

মো. নুরুল আনোয়ার

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কে ফিরিয়ে দেবে জাহালমের তিন বছর

সারা বিশ্বে মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হচ্ছে আধুনিক বিচার ব্যবস্থা। ভারতবর্ষে মোগল শাসন বা তার আগেও বিচারব্যবস্থা ছিল। সেই ব্যবস্থাগুলোর সবই যে কল্যাণকর, এমন নয়। সাজাও ছিল অদ্ভুত রকমের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর এবং বীভৎস। মোগল শাসনামলে বিচারব্যবস্থায় ন্যায়পরায়ণতার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। ইংরেজরা ভারত দখলের প্রথম শত বছর মোগল বা মুসলিম বিচার ব্যবস্থা চালু রেখেছিল। ১৮৫৭-৫৯ সালের প্রথম স্বাধীনতাসংগ্রামের পর ব্রিটিশরাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কাছ থেকে শাসনভার গ্রহণকরত বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগকে নতুন রূপ দেয়। বিচারব্যবস্থাকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে—একটি ফৌজদারি, অন্যটি দেওয়ানি; যা এখন পর্যন্ত ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে চালু আছে। অবশ্য সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন, বিয়োজন ও সংযোজন করা হয়েছে। বাস্তবের নিরিখে কিছু নতুন আইনও পাস হয়েছে। ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিচারিক কার্যক্রম চলে যথাক্রমে ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যবিধিতে। অপরাধের বিবরণ ও সাজার বিধান আছে মূলত পেনাল কোডে এবং অন্য মাইনর আইনে। সাক্ষ্যগ্রহণের পদ্ধতি আছে সাক্ষ্য আইনে। এসব আইন প্রয়োগ ও ব্যবহারের প্রয়োজনে বিচার বিভাগের সৃষ্টি হয়েছে এবং কিভাবে বিচার বিভাগ স্থাপিত হবে ও কার্যক্রম চালাবে, তা ওই আইনগুলোতেই বর্ণিত আছে। সংক্ষেপে বলা যায়, ওইরূপ বিচারালয় এবং বিচারব্যবস্থা চালুর পর বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পাওয়ায় ও অপরাধীদের সাজা দৃশ্যমান হয়েছে। আগে নিম্ন আদালত প্রশাসনিক বিভাগ পরিচালনা করত। এখন সব আদালত বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে (মোবাইল কোর্ট বাদে)। উল্লিখিত বিচারব্যবস্থা চালুর পর থেকে লাখ লাখ বিচারপ্রার্থী ন্যায়বিচার পেয়ে নিজেদের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষা করেছে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা পেয়েছে সাজা, সমাজে এসেছে স্বস্তি। এটা সবাইকে মানতে হবে। যাঁরা বিচারের দায়িত্বে থাকেন তাঁরাও সাধ্যমতো-জ্ঞানত চেষ্টা করেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে। সে জন্য দণ্ডবিধির ৭৭ ধারায় বিজ্ঞ বিচারকরা বিচার পরিচালনাকালে ‘সরল বিশ্বাসে’ কৃতকাজের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সোজা কথায় সরল বিশ্বাসে দেওয়া জামিন, সাজা, জরিমানা, ইনজাংশন বা অন্য কোনো আদেশের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ক্ষতিপূরণের জন্য কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা করতে পারবে না। In good faith বা সরল বিশ্বাসে কৃতকাজের চুলচেরা বিশ্লেষণও নেই। সমস্যাটি সেখানে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি আদালতের কোনো আদেশ বা কার্যক্রমে সংক্ষুব্ধ হন, তবে তিনি উচ্চ আদালতে যেতে পারেন। কথাটি আপাত নির্দোষ, যুক্তিসম্মত এবং শ্রুতিমধুর। বাস্তব সেই ব্যক্তিটির জন্য বড়ই নির্মম। উচ্চ আদালতে যেতে যে অর্থ ব্যয়, সময় ক্ষতি, কর্মবিরতি এবং দুশ্চিন্তা ঘটে, তার মূল্য কে দেবে? এভাবে বাধ্য হয়ে মামলার তদবিরে কত মানুষ যে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, পরিবার ধ্বংস হয়, তার কি কোনো শেষ আছে? আছে কি কোনো গবেষণা? আদালতের হাজারটা কল্যাণমুখী রায় বা আদেশের মাঝে যে কিছু হৃদয়-কাঁপানো ভুল, মানুষের জীবন ধ্বংস, সম্পত্তি বেহাত হয়ে সর্বনাশ ঘটে যায়, সেগুলোর দিকেও নজর দেওয়া আশু প্রয়োজন। আদালতের অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অবহেলা, উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা এবং দুর্নীতির দ্বারা কৃতকাজটি কি ‘সরল বিশ্বাসে কৃত’ কাজের আবরণে আড়াল করা যায়? আদালতের যে ক্ষমতাটি নিয়ে বেশি কথা, সমালোচনা এবং আপত্তি, সেটি হচ্ছে জামিন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬-৪৯৮ ধারাগুলোয় যেকোনো বিচারাধীন, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জামিন দেওয়ার অবারিত ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে, তবে একটি কথাও জুড়ে দেওয়া হয়েছে With due care and caution. আইন প্রণেতারা এভাবে এত অবারিত ক্ষমতা আদালতকে দিয়েছেন, যাতে নিরপরাধ ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সাধারণভাবে আদালত জামিনের ব্যাপারে মানবিক থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে সতর্কতাও অবলম্বন করেন। কিছু অগ্রহণযোগ্য অযোগ্যতা, অবহেলা, অসতর্কতা, অসততা; যা বিচারপ্রার্থী মানুষের জীবনকে করে তুলে দুর্বিষহ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণও হারাতে হয়। কালের কণ্ঠ’র গত ৩ তারিখের প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘জামিনে পালিয়ে দণ্ড ফাঁকি’। এ ধরনের অগণিত জামিনের উদাহরণ আছে।

এবার আসা যাক মুদ্রার অপর পৃষ্ঠায়। জামিন পাওয়ার যোগ্য অথচ জামিন হচ্ছে না—এ সংখ্যা লিখে শেষ করা যাবে না। পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া দরিদ্র কৃষককে কোমরে দড়ি বেঁধে আদালতে হাজির এবং হাজতে প্রেরণের ঘটনা পাঠকরা দেখেছেন পত্রিকার পাতায়। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংক থেকে ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা জালিয়াতির দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা ৩৩ মামলায় টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ইউসুফ আলীর ছেলে পাটকল শ্রমিক জাহালম আটক হয়ে তিন বছর ধরে জেলে। মামলা তদন্ত, জেলে আটক, মামলা চলাকালে বারবার তিনি বলেছেন, তিনি আসামি আবু সালেক নন—জাহালম। তাঁর সেই আহাজারি না দুদক, না পুলিশ, না আদালত—কারো মন গলাতে পারেনি।

অবশেষে মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে জাহালমের বক্তব্যই সঠিক এবং এই জালিয়াতি মামলার প্রকৃত আসামি ঠাকুরগাঁওয়ের আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে আবু সালেক। প্রশ্ন হলো, দুদকের তদন্তের পদ্ধতির মধ্য দিয়ে এ ধরনের ভুল অসম্ভব, তবু হয়েছে। একটি বিষয় বোধগম্য হচ্ছে না, অপরাধী ঠাকুরগাঁওয়ের আবু সালেকের বদলে দুদক টাঙ্গাইলের জাহালমকে কিভাবে খুঁজে বের করল?

দুদুকের তদন্ত পদ্ধতির গুরুতর ত্রুটি প্রমাণিত। পুলিশ জাহালমকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে প্রেরণকালে জাহালমের দাবিটি ফরওয়ার্ডিংয়ে উল্লেখ করতে পারত। আদালত আসামিকে হাজতে প্রেরণকালে তাঁর বক্তব্যটি গ্রহণ করে দুদক এবং পুলিশকে বিষয়টি তদন্তের আদেশ দিতে পারতেন। তা না করে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র গ্রহণ করে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। মানবাধিকার সংস্থা তদন্ত না করলে জাহালম হয়তো জেল-জরিমানা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরতেন। ট্রাইব্যুনালের সরকারি উকিলের ভূমিকা সংবাদটিতে উল্লেখ নেই। এ ক্ষেত্রে মনে হয়, সহজ হতো—১. অনতিবিলম্বে জাহালমকে জামিনে মুক্ত করা। ২. ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারা মোতাবেক পিপি জাহালমকে অভিযোগমুক্ত করতে আদালতে আবেদন করতে পারেন। ৩. জামিনে থেকে বিচার শেষে খালাস পাওয়া। সংবাদটি গোচরে আসার পর মহামান্য হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গত ৩ ফেব্রুয়ারি জাহালমের সব মামলা অবলোকন করে মুক্তি দিয়েছেন, অথচ এ কাজ প্রথমেই বিচারিক আদালত করতে পারতেন।

এবার একটি সিনেমার কাহিনির মতো অবশ্য সত্য ঘটনা পাঠকদের জন্য উল্লেখ করছি। মৌলভীবাজারের এক চা বাগানে জামালপুর নিবাসী শাহীন মিয়া চাকরি করতেন। থাকতেন স্ত্রী সাহারা বেগম সজনী এবং পাঁচ বছরের কন্যাশিশু নিয়ে। তাঁদের তরুণী গৃহপরিচারিকা লাকী হঠাৎ একদিন না বলে বাসা থেকে উধাও হলে তিনি থানায় জিডি করেন। অন্যদিকে মেয়েটির বাবা দুষ্ট লোকের প্ররোচনায় মৌলভীবাজার শিশু ও নারী নির্যাতন আদালতে তাঁর মেয়েকে হত্যা করে গুম করার মামলা ঠুকে দেন। আদালত এসি ল্যান্ডকে দিয়ে তদন্ত করিয়ে ‘কগনিজেন্স’ নিয়ে মামলার বিচার শুরু করেন। মিথ্যা মামলার কথা জানতে পেরে শাহীন মিয়া পরিবার নিয়ে জামালপুর চলে আসেন। ২০০৭ সালের ১০ আগস্ট ওই আদালতের বিচারক ফজলুর রহমান শাহীন মিয়া ও তাঁর স্ত্রী সজনী বেগমকে যাবজ্জীবন জেল এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। কনভিক্ট ওয়ারেন্ট বলে জামালপুর পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে জামালপুর জেলে পাঠায়। এভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁরা জেল খাটতে বাধ্য হচ্ছিলেন। পাঠক ভাবুন, কত অমানবিক, নিষ্ঠুর এবং নির্দয় বিষয়টি। এ পর্যায়ে কয়েক মাস জেলে অবস্থান করার পর জামালপুরের নতুন পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম জেল পরিদর্শনে গিয়ে ঘটনাটি জেনে গোপনে তদন্ত করে সত্য জানতে পারেন এবং জামালপুরে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় একটি মামলা নিয়ে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল থেকে ‘গুম ও নিহত’ লাকী ও তার বাদী বাবাকে গ্রেপ্তার করে জামালপুরে নিয়ে আসেন এবং বিস্তারিত জানিয়ে জামালপুর আদালতে সোপর্দ করেন। পুলিশ সুপার হাইকোর্টের অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের গোচরে বিষয়টি নিলে হাইকোর্টের নির্দেশে মিথ্যা মামলা এবং অন্যায় বিচারের হাত থেকে তাঁরা মুক্তি পান। প্রকৃত ঘটনা হলো, ওই লাকী পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে বাহুবলে বসবাস করতে থাকে। তাদের একটি কন্যাসন্তানও জন্ম নেয় এবং চমকের বিষয় হচ্ছে, সেই মিথ্যা মামলার বাদী লাকীর বাবাও মেয়ের সঙ্গে বসবাস করছিলেন। এ ধরনের শাহীন মিয়া কি শুধু একজন?

মূলকথা হচ্ছে আদালত ন্যায়বিচার করবেন। প্রকৃত অসহায় ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেবেন। স্বল্পতম এবং কাম্য সময়ে মামলার রায় ঘোষণা করবেন। সুনির্দিষ্ট মামলাগুলো বিশ্লেষণ করতে পারি—১. শাহীন মিয়া দম্পতির যাবজ্জীবন সাজাকে কি অন্য কিছু না বলে অযোগ্যতা, অদক্ষতা, উদাসীনতা বলা যায় কি না? ২. জাহালমের তিন বছরের অবৈধ কারাবাসের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? জীবনের এই মূল্যবান সময় কে ফিরিয়ে দেবে—অর্থনাশেরই বা কী হবে? ৩. শাস্তি হবে নিশ্চিত, তবু মামলার জামিন দান এবং প্রদত্ত দণ্ড যথাসময়ে কার্যকর করতে না পারায় প্রতিকার কিভাবে হতে পারে? ৪. মিথ্যা মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তির সাজা এবং আটকের প্রতিকারের পথ কী? ৫. দেওয়ানি মামলায় অগ্রহণযোগ্য ও অসহনীয় দীর্ঘসূত্রতার প্রতিকার কী? এর থেকে উত্তরণ খোঁজার পথ কি কারো নেই?

‘কমলা কান্তের দফতর’-এ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই উক্তিটি এখনো প্রাসঙ্গিক, ‘বিচারের বাজারে গেলাম, দেখলাম, সেটা কসাইখানা, টুপি মাথায় গামলা মাথায়, ছোট-বড় কসাই সকলে ছুরি হাতে গরু কাটিতেছে। মহিষাদি, বড় বড় পশু সকল শৃঙ্গ নাড়িয়া ছুটিয়া পালাইতেছে। ছাগ-গরুসহ সকল পশু ধরা পড়িতেছে।’

 

লেখক : সাবেক আইজিপি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা