kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এই সময়

ট্রাম্প কি নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করলেন

তারেক শামসুর রেহমান

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



ট্রাম্প কি নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করলেন

শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন ট্রাম্প। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের অর্থ বরাদ্দের জন্য কংগ্রেসকে এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, মেক্সিকো সীমান্তের বর্তমান অবস্থাই ‘জরুরি অবস্থা’ জারির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই যুক্তির সঙ্গে একমত নয় ট্রাম্পবিরোধীরা। ওদিকে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গেও দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন। ভেনিজুয়েলায় সম্ভাব্য একটি সামরিক হামলা কিংবা আইএনএফ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করতে যাচ্ছেন? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা এখন এই বিষয়ের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং সমাজতন্ত্রের পতন ঘটে। এরপর দীর্ঘ ২৬ বছর বৃহৎ শক্তির মাঝে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়নি। কিন্তু প্রথমে ইউক্রেন, পরবর্তী সময়ে সিরিয়ার পরিস্থিতি এবং চলতি ২০১৯ সালের শুরুতে ভেনিজুয়েলা ও আইএনএফ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের ঘটনায় দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এখন অনেকটা পরস্পর মুখোমুখি। সিরিয়া ও ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতিতে এই দুই পরাশক্তি পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতির পরিস্থিতিতে যখন প্রভাববলয় বিস্তারের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ওই সময় একদিকে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব, অন্যদিকে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব; যদিও সত্তর-পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক চীন বিশ্বরাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল। স্নায়ুযুদ্ধ দীর্ঘ ৪৫ বছর বিশ্বকে অনেকটা দ্বিধাবিভক্ত করে রেখেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ইউক্রেনের পরিস্থিতি (২০১৪) বদলে দেয় দৃশ্যপট। প্রেসিডেন্ট ইয়ানোকোভিচকে উত্খাত, বন্দরনগরী ক্রিমিয়ার রাশিয়ায় সংযুক্তি, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে রাশিয়ার উসকানি ইত্যাদি কারণে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। এমনকি রাশিয়া তার সীমান্তে ব্যাপক সেনা সমাবেশ ঘটালে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের একটা ‘যুদ্ধের’ আশঙ্কা সৃষ্টি করেছিল। এমনই এক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তথা ন্যাটোর মিত্র দেশগুলো ইউক্রেনের পাশে এসে দাঁড়ায়। সেই থেকে সেখানে এক ধরনের ‘যুদ্ধ’ চলে আসছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ওয়ার ইন ডনবাস’ (War in Donbuss)। ক্রিমিয়ার সংকটের (গণভোটে রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি ও পরে তা কার্যকর) পরপরই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের দোনেতসেক এবং লুহানসক অঞ্চলে (ডনবাস) ক্রিমিয়া মডেলে আন্দোলন গড়ে ওঠে। বিচ্ছিন্নতাকামীরা স্বঘোষিত ‘পিপলস রিপাবলিক অব দোনেতসেক’ ও ‘পিপলস রিপাবলিক অব লুহানসকের’ ঘোষণা দেয়। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ক্রিমিয়ার মতো রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি চায়। তাদের অনেকেই রাশিয়ার বংশগত। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ঠেকাতে ইউক্রেন সেখানে সেনাবাহিনী পাঠায়। অন্যদিকে রাশিয়া বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চাচ্ছে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক। আর রাশিয়ার ভয়টা এখানেই। যদি ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেয়, তাহলে রাশিয়ার সীমান্তে ন্যাটো তার সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে পারবে। এতে রাশিয়াকে চাপের মুখে রাখা যাবে। রাশিয়ার সেনাবাহিনীর ভয়টা এখানেই। ২০১৪ সালের পর থেকেই ইউক্রেনে এক ধরনের ‘প্রক্সিযুদ্ধ’ চলে আসছে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে রাশিয়া।

এর পরের দৃশ্য সিরিয়ায়। ২০১১ সালে ‘আরব বসন্ত’ পুরো আরব বিশ্বে একটা পরিবর্তন এনেছিল। সেখানে দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলোর পতন ঘটেছিল (তিউনিসিয়া, মিসর, ইয়েমেন ও লিবিয়া)। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম সিরিয়া। সেখানে আসাদবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম হলেও (২০১১-২০১২ পরবর্তী সময়ে) ক্ষমতা থেকে আসাদকে সরানো যায়নি। ২০১৪ সালে সেখানে প্রথমবারের মতো জঙ্গি ইসলামিক গোষ্ঠী ‘দি ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট’ (পরবর্তীকালে শুধু ইসলামিক স্টেট)-এর জন্ম হয়, যারা ইরাকের একটি অংশ ও সিরিয়ার একটি অংশ নিয়ে তথাকথিত একটি ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠা করে। এই খিলাফতে যোগ দিতে এবং একটি জঙ্গি রাষ্ট্র গঠন করতে হাজার হাজার মুসলমান যুবক সিরিয়ায় যায় এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আইএসের উত্থান সারা বিশ্বসম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করে তোলে। আইএসের যোদ্ধারা দীর্ঘদিন আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিশাল এক সিরিয়ান এলাকা দখল করে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। এমনই এক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা (ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া) ২০১৪ সালে আইএস অবস্থানের ওপর বিমান হামলা শুরু করে সিরিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। এমনকি মার্কিন বিমান সিরিয়ার আসাদ সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকায়ও বোমাবর্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি নিয়ন্ত্রিত ও আসাদবিরোধী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সকেও সমর্থন করে অস্ত্র দিয়ে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বিমানবাহিনীও ওই যুদ্ধে জড়িয়ে যায় (২০১৫ সাল থেকে)। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পৃথক বিমান হামলায় আইএস ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সেখান থেকে উত্খাত হয়। কিন্তু আসাদকে উত্খাত করা সম্ভব হয়নি শুধু রাশিয়া ও ইরানের কারণে। সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ‘অবস্থান’ ভিন্ন ভিন্ন। সিরিয়া সংকটের যখন কোনো সমাধান হচ্ছিল না তখন ভেনিজুয়েলা সংকটে জড়িয়ে পড়ল রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র।

অনেকেই এটা জানে যে ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদের দিকে মার্কিন তেল সংস্থাগুলোর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ তারা তাদের নিজেদের কবজায় নিয়ে যেতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের মতে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের রিজার্ভ রয়েছে ভেনিজুয়েলায়। এর পরিমাণ তিন লাখ ৮৭৮ মিলিয়ন ব্যারেল (২০১৭ সালের পরিসংখ্যান)। পরের রিজার্ভ রয়েছে সৌদি আরবে, দুই লাখ ৬৬ হাজার ৪৫৫ মিলিয়ন ব্যারেল। ফলে এই তেল যে একটি ফ্যাক্টর, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। মাদুরো নিজেও স্বীকার করেছেন যে ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ জব্দ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। হুগো শাভেজের আমলে ভেনিজুয়েলা একটি ধনী দেশে পরিণত হয়েছিল। রাজধানী কারাকাসে তেলসম্পদের বদৌলতে অনেক হাইরাইজ ভবন তৈরি করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল বিনিয়োগকারীরা আসবে। কিন্তু সেসব ভবন এখন খালি। কোনো বিনিয়োগকারী নেই। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মুদ্রাস্ফীতি সেখানে চরমে। ২০১৬ সালের হিসাবে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ছিল ৮০০ শতাংশ। আর আইএমএফের মতে, ২০১৯ সালে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১০০ শতাংশ (১০ মিলিয়ন)। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সেখানে পাওয়া যায় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ২০১৮ সালে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আইএমএফ ভেনিজুয়েলার এই পরিস্থিতিকে ১৯২৩ সালে জার্মানি, আর ২০০০ সালের জিম্বাবুয়ের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছে (রয়টার্স প্রতিবেদন, ৯ অক্টোবর ২০১৮)। ফলে সংগত কারণেই মানুষের মাঝে হতাশা আছে সেখানে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ভেনিজুয়েলার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী দেশে যাচ্ছে। কোনো কোনো যুবতী বা কিশোরী মেয়ে তার লম্বা চুল বিক্রি করছে জীবিকা নির্বাহের জন্য। অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্য ঘটনা। খাদ্যঘাটতি সেখানে রয়েছে। মাদুরোর অতি বাম নীতি বা পযধারংস ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এখানে যে ব্যর্থতা রয়েছে, তা সমাধান করতে পারেননি মাদুরো। তাই ডানপন্থী সংগঠনগুলো এর সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু মাদুরোকে উত্খাত কিংবা সেখানে একটি প্রো-ওয়েস্টার্ন সামরিক অভ্যুত্থান কি কোনো সমাধান এনে দেবে?

ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলায় একটি ‘সামরিক আগ্রাসন’ চালানোর কথা বললেও তা শেষ পর্যন্ত কতটুকু তিনি কার্যকর করবেন, এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এমনিতেই অভ্যন্তরীণভাবে তিনি নানা সমস্যার সম্মুখীন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে তিনি কংগ্রেসের কাছে কয়েক বিলিয়ন ডলার চেয়েছিলেন। কংগ্রেস তা দেয়নি। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার ‘জড়িত’ থাকা (হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল হ্যাক করার ঘটনা) ও সে ব্যাপারে তাঁর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। এ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ভেনিজুয়েলায় ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নির্দেশ দিতে পারেন ট্রাম্প। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই রেজিম চেঞ্জের নীতি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বেশ কয়েক বছর ধরে অনুসরণ করে আসছে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন আর লিবিয়ায় গাদ্দাফির উত্খাতের পেছনে এই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নীতি কাজ করেছিল। আবার সিরিয়ায় তা কাজ করেনি। সিরিয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার জড়িয়ে যাওয়া এবং আসাদ সরকারকে সমর্থন করায় এই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নীতি সেখানে কাজ করেনি। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও এমনটি হতে যাচ্ছে। কেননা রাশিয়া, এমনকি চীনও মাদুরোর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি সেখানে সামরিক আগ্রাসন চালায়, তা হীতে বিপরীত হতে পারে। এটা শুধু নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের আশঙ্কা বাড়াবে না, বরং পুরো লাতিন আমেরিকায় একটি মার্কিনবিরোধী শক্তিশালী জনমতের জন্ম দিতে পারে। এই যখন পরিস্থিতি তখন আমাদের জন্য আরেকটা খারাপ খবর হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া কর্তৃক আইএনএফ (Intermediate range nuclear forces treaty) চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া। চুক্তি ভঙ্গ করে রাশিয়া পরমাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে—এই অভিযোগ তুলে গত ১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র আইএনএফ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। এর পরদিন রাশিয়াও বেরিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে দুই পরাশক্তির মাঝে আবার নতুন করে পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হলো। এরই মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ঘোষণা করেছেন যে শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ দ্রুতগামী হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর কাজ শুরু করবে রাশিয়া। বলা ভালো, ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন (রিগ্যান ও গর্বাচেভের মধ্যে চুক্তি) এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ওই চুক্তিবলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পাল্লার (৫০০ থেকে পাঁচ হাজার ৫০০ কিলোমিটার) সব পরমাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের চার বছরের মধ্যে দুই হাজার ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছিল রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। এখন যদি বৃহৎ শক্তি অস্ত্র উৎপাদন শুরু করে, তাহলে বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়বে।

একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে প্রভাববলয় বিস্তারের নতুন এক প্রতিযোগিতা। স্নায়ুযুদ্ধ-২ নামে তা কোনো কোনো পর্যবেক্ষক তাঁদের লেখায় উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে পার্থক্য একটাই—আর তা হচ্ছে একসময় যা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এখন তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চীন এখন একটি শক্তি। চীনের অবস্থান রাশিয়ার পক্ষে। ভেনিজুয়েলা, সিরিয়া কিংবা ইউক্রেন সংকটে চীন রাশিয়াকে সমর্থন করেছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ও যুক্তরাষ্ট্রকে চীন থেকে আলাদা করেছে। একসময় ছিল যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন স্নায়ুযুদ্ধকালে তৃতীয় বিশ্ব তথা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে তাদের পাশে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে তৃতীয় বিশ্বেও বিভক্তি দেখা গিয়েছিল। একুশ শতকে এসে আঞ্চলিকভাবে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ শক্তিশালী। ভারতের মতো দেশ একটি উঠতি শক্তি। ভারত এরই মধ্যে ব্রিকস ও ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’-এর মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চীন-ভারত-রাশিয়া অক্ষ গড়ে তুলছে। ফলে অতীতের মতো যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনা কম। বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরস্পরবিরোধী অবস্থান বিশ্বে এখন উত্তেজনা বাড়াবে মাত্র।

লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা