kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৪ অক্টোবর ২০১৯। ৮ কাতির্ক ১৪২৬। ২৪ সফর ১৪৪১       

সাফল্য দেখার অপেক্ষায় জাতি

কর্নেল এস এম শওকত আলী (অব.)

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাফল্য দেখার অপেক্ষায় জাতি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ৭ জানুয়ারি ২০১৯ সালে চমক দেওয়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে নতুন সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর টানা তৃতীয় মেয়াদের শাসনকালের শুভ অগ্রযাত্রা শুরু করেছেন অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে। দেশে-বিদেশে এই একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার বন্যা শুরু হলেও ধীরে ধীরে এর সমালোচনার দিকটি ম্রিয়মাণ হয়ে আসছে। তার অনেক কারণের মধ্যে এখানে দুটি কারণ উল্লেখ করতে চাই। প্রথমত, নির্বাচনকালীন চলমান সরকারের দৃঢ়তা; যার ফলে একদিকে যেমন নির্বাচন পরিস্থিতিকে বিগত কয়েকটি নির্বাচন থেকে অধিক নিরাপত্তাদানের আবহ ধরে রাখা হয় এবং জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি নিম্ন পর্যায়ে রাখতে সক্ষম হয়। এতে মনে হয়েছে নির্বাচন গণতান্ত্রিক পন্থায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক শক্তি ও পরাশক্তি চীনের পক্ষ থেকে বিজয়ী দলের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দিত করায় রাশিয়া, সৌদি আরব, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী দেশ নতুন সরকারকে অভিনন্দিত করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মহাজোট সরকার দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বিগত ১০ বছরে যে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে, তার পরও এটা দৃশ্যমান হয়েছে দেশের আমজনতা এতেই সম্পূর্ণ তৃপ্ত হয়েছিল তেমনটি শতভাগ ধরে নেওয়া যাবে না। বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী সেটা অনুধাবনে সক্ষম হয়েছিলেন নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনকালীন প্রচারণার সময়। তিনি দেশের মানুষের মনের কথা ও অনুভূতি তাঁর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পেয়েছিলেন। যার ফলে আমরা দেখতে পেয়েছি তিনি নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছিলেন। সে যা-ই হোক, নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুচিন্তিত বিশ্লেষণের ফল হিসেবে আমরা নবগঠিত সরকারে দুটি অভূতপূর্ব দৃশ্য অবলোকন করলাম। প্রথমত, আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৮ আসন পাওয়ার ফলে সরকার গঠন করেছে। আর দ্বিতীয়ত, এই নবগঠিত মন্ত্রিসভায় আগের অনেকের স্থান হয়নি। এ দুটি ক্ষেত্রই কতটা স্পর্শকাতর ও দুঃসাহসিক তা রাজনীতি বিশ্লেষক ও বোদ্ধাদের কাছে সুস্পষ্ট। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে একক সিদ্ধান্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে চমক দিয়েছেন তাঁকে অতি চমক বলেই অভিহিত করা শ্রেয়। এই বাদপড়াদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁদের ছাড়া বর্তমান সময়ে এককভাবে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন হতে পারে, সে কথা অতি পণ্ডিত রাজনীতিক বোদ্ধাদেরও অনুমানের বাইরে ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাস্তবতা সব কল্পনাকে হার মানিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে কেন বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী এই কালোত্তীর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন বা নিতে বাধ্য হলেন। যে সতীর্থরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর শুধু সুদিনেরই সহযাত্রী নন, অনেক দুর্দিনেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মোকাবেলা করেছেন, তা রাজনৈতিক দুর্যোগ হোক কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দীর্ঘ পথ চলেছেন শুধু সংসদে ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী দল হিসেবে নয়, রাজপথের উত্তাল দিনগুলোতেও। আবার এর মধ্যে অনেকেই আছেন জনমানসে সফল মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে অভিহিত। এর একমাত্র উত্তরটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই জানেন। এর বাইরে যে বা যাঁরা এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবেন সেটা হবে নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে নিছক অনুমানপ্রসূত। এ কথা সত্য যে বিগত বছরগুলোতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতা দিয়ে শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিক মহলেও নিজেকে অপরিহার্য করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেকে উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। রাজনীতির অনেক বোদ্ধাকেও বলতে শুনেছি এই মুহূর্তে সার্বিক বিবেচনায় দেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের বিকল্প খুঁজে পাওয়া শুধু কঠিনই নয় অসম্ভবও বটে। হয়তো এমনটা হতে পারে যে তিনি বিদায়ী অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজনের সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে অধিক বিজ্ঞ ও শাণিত করে নতুন প্রজন্মকে আগামীতে দেশের নেতৃত্বের জন্য গড়ে তোলার আবশ্যকতা অনুভব করেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করেই হয়তো বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী নতুন ক্যাবিনেট গঠনের এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জনগণ তাদের ম্যান্ডেট টানা তৃতীয়বারের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলকে উজাড় করে দিয়েছে, এবার তাদের প্রতিদান পাওয়ার পালা আর সেই প্রতিদান দিতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে অগ্রসরমান। এখন দেখার বিষয় হলো, যে প্রত্যাশায় দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন ও অর্থনৈতিক সুব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে নতুনদের কাঁধে দায়িত্বভার অর্পণ করা, তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব কতটা সফলতার সঙ্গে পালন করেন বা প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ও আস্থার প্রতিফলন কতটা ঘটাতে পারেন। তাঁদের লক্ষ্য দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা। আমরা বিশ্বাস করতে চাই এই নবীন-প্রবীণের সংমিশ্রণের ক্যাবিনেট তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব দৃঢ়তা, নিষ্ঠা, সততা ও সফলতার সঙ্গে পালন করতে সক্ষম হবেন। তাঁদের সামনে যে অগণিত প্রতিবন্ধকতা, তাঁরা একে কতটা অনুকূলতায় রূপান্তরিত করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন—সেটাই দেখার বিষয়। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে মানুষের সততা, দৃঢ়তা ও সদিচ্ছা থাকলে পাহাড় সমান বাধাও নির্দ্বিধায় অতিক্রম করে যাওয়া যায়। তাঁদের সাফল্য দেখার অপেক্ষায় দেশের মানুষ।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা