kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

ভাষার দাবিতে স্বাধিকারের মন্ত্রে উজ্জীবিত জাতি

বিমল সরকার

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাষার দাবিতে স্বাধিকারের মন্ত্রে উজ্জীবিত জাতি

আমাদের ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের মনে পড়ে মাতৃভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন করে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদান ও মহান ভাষাসৈনিকদের কথা। একইভাবে মনে পড়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কথা। আরো মনে পড়ে পশ্চিমা শাসক-শোষকগোষ্ঠীর অন্য প্রতিভূদের কথাও। দিবালোকের মতো সত্য এবং অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে জিন্নাহ থেকে শুরু করে ইয়াহিয়া খান পর্যন্ত (১৯৪৭-৭১) যাঁরা পাকিস্তান শাসন করেছেন, বলতে গেলে তাঁরা সবাই ছিলেন অবাঙালি। অথচ পাকিস্তানের বৃহৎ জনগোষ্ঠী, ৫৬ শতাংশ অধিবাসীর মাতৃভাষা বাংলা। সমগ্র পাকিস্তানের মোট আট কোটি লোকের মধ্যে পাঁচ কোটিই ছিল বাংলাভাষী। বাকি তিন কোটি পশতু, বেলুচ, সিন্ধি, পাঞ্জাবি প্রভৃতি ভাষাভাষী। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় পাকিস্তানে পশতুভাষী লোক ছিল প্রায় এক কোটি। বেলুচ ও সিন্ধিভাষীর সংখ্যা আরো নিচে। আর উর্দুভাষীর সংখ্যা তো ছিল বাংলাসহ প্রধান চার-পাঁচটি ভাষার অনেক নিচে। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরও মাতৃভাষা উর্দু ছিল না।   

পাকিস্তান রাষ্ট্রটির সঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন জিন্নাহ। করাচিতে জন্ম হলেও মুম্বাই শহরে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর করাচিতে ফিরে গিয়ে সেখানকার ‘সিন্ধু মাদরাসা হাই স্কুলে’ ভর্তি হন তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে উত্তীর্ণ হন প্রবেশিকা পরীক্ষা। আর ২০ বছর বয়সে ১৮৯৬ সালে তো বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশেই ফিরে আসেন। এক অনন্যসাধারণ রাজনৈতিক প্রতিভা বলে এখনো বিবেচনা করা হয় জিন্নাহকে। কিন্তু এত সব সত্ত্বেও দেশি ভাষা, সংস্কৃতি ও রীতিনীতি সম্পর্কে তত ওয়াকিবহাল ছিলেন না তিনি। এসব ক্ষেত্রে রীতিমতো পাশ্চাত্য ধারায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন জিন্নাহ। এ নিয়ে তাঁকে ঘিরে দেশবাসী, বিশেষ করে জিন্নাহর সমগোত্রীয়দের মধ্যেই আলোচনা-সমালোচনার কোনো কমতি ছিল না। এমতাবস্থায় এমনকি উর্দুভাষা বলায়ও তিনি সাবলীল পারদর্শী ছিলেন না, এটা আশ্চর্যের কোনো বিষয় ছিল না। 

ভাষার বিষয়টিই যে তাঁর দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ভাবনার ফসল নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্য শেষ পর্যন্ত এমন কাল হয়ে দেখা দেবে সে কথা এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বোধ করি আন্দাজই করতে পারেননি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি থেকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর স্বপ্ন-সাধ নিয়েও ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর কাছে সীমাহীন আবেগেরই বিষয় ছিল যে পাকিস্তান নামের স্বাধীন রাষ্ট্রটির আত্মপ্রকাশ শুধু সময়ের ব্যাপারমাত্র। আর উপমহাদেশের বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত এই স্বাধীন নতুন রাষ্ট্রের প্রধান হতে যাচ্ছেন তিনি নিজে।

 

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান সৃষ্টির পর মাত্র একটি বছর বেঁচে ছিলেন। ফলে সফলতা-বিফলতাসহ পাকিস্তানের অনেক কিছুই দেখার ও শোনার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য তাঁর হয়ে ওঠেনি। এক জাতি ও এক ধর্মের দোহাই দিয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েম করলেও পরবর্তী সময়ে বাংলার মুসলমানদের এক জাতি বা এক ধর্মের মানুষ হিসেবে ভাবতে পারেননি তিনি। এ জন্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির দাবিকে উপেক্ষা করে ঢাকায় এসে জিন্নাহ সদম্ভে উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন, ‘উর্দু অ্যান্ড অনলি উর্দু শেল বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।’ তাঁর মৃত্যুর তিন বছর পর ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনও পল্টন ময়দানে জনসভায় প্রদত্ত ভাষণে জিন্নাহর সুরেই বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’

উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যে জিন্নাহর প্রাণপণ চেষ্টা তাঁর উর্দুপ্রীতির একটি মাত্র নমুনা। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তি ও স্বাধীনতা প্রদানের। সিদ্ধান্ত হয় যে ভারত ও পাকিস্তান নামে স্বাধীন স্বতন্ত্র দুটি রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করবে। সেদিনই রাতে প্রচারমাধ্যম ‘আকাশবাণী’ থেকে খবরটি প্রথম প্রচারিত হয়। নেতা বা কলাকুশলীরা একের পর এক বলে গেলেন যে এই উপমহাদেশকে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ করার ব্যাপারে তাঁরা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পালা। আয়োজন করা হলো অনুষ্ঠানের। বক্তাদের মধ্যে প্রথমে বললেন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন। খুবই সংক্ষিপ্ত ও সংযত ভাষণ তাঁর। ইংরেজিতে যে কটি কথা বললেন মাউন্টব্যাটেন, সবই প্রত্যয়নিষ্ঠ। মাউন্টব্যাটেনের পরের বক্তা জওয়াহেরলাল নেহরু, স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। হিন্দি ভাষায় বেশ আবেগভরে সংক্ষেপে বক্তব্য শেষ করেন নেহরু। এর পরের বক্তাই জিন্নাহ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্রষ্টা বলা হয় যাঁকে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল। তবে আকাশবাণী থেকে জিন্নাহর সেদিনের ভাষণটি যেন তাঁর কীর্তির চেয়েও বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিল। এমন অসংগতির দৃষ্টান্ত সচরাচর দেখা বা শোনা যায় না। যাঁদের জন্য এত মান-অপমান সহ্য করে সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি পাকিস্তান গড়লেন, তাঁদের প্রাণের ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার যোগ্যতাটিও তাঁর ছিল না। জিন্নাহ তাঁর ওই ঐতিহাসিক ভাষণটি দিলেন ইংরেজিতে।

পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব। লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই নিহিত ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের বীজ। আর এ বীজটির অঙ্কুরোদ্গম হয় জিন্নাহর ‘উর্দুপ্রীতিটি’ প্রকাশিত হওয়ার পরপরই। ভাষার দাবি স্বাধিকারের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত ও একতাবদ্ধ করে গোটা বাঙালি জাতিকে। আর এভাবেই অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে ভাষার অধিকার এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের আত্মপ্রকাশ।

লেখক :  কলেজ শিক্ষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা