kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দুর্নীতি নির্মূলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে

এ কে এম আতিকুর রহমান

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



দুর্নীতি নির্মূলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে

টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা গত ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত তাঁর প্রথম সভায় ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, দুর্নীতি সংঘটিত হওয়া মাত্রই তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২০৪১ সাল নাগাদ দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নেওয়ার জন্য তাঁর সরকার প্রবৃদ্ধি হারের লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশে নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দেশে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের জন্য হবে খুব কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ।

দুর্নীতি শব্দটি সবার কাছে পরিচিত, এমনকি দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির কাছেও। দুর্নীতি ব্যক্তিগত লাভের জন্য অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহারকে বোঝায়। অবৈধ সুবিধা অর্জনের জন্য এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সংঘটিত অসততার দৃষ্টান্ত। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই মূলত ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নিজের স্বার্থে ঘুষ নেওয়ার বা অর্থ আত্মসাৎ করার মতো জঘন্য অপরাধমূলক কাজটি করে থাকে। ‘দুর্নীতি’ শব্দটিকে সামাজিক বিজ্ঞানীরা ‘ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি দায়িত্ব পালনের নিয়মনীতি থেকে বিচ্যুতি’ এবং ‘ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি দপ্তরের অপব্যবহার বা অমর্যাদা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

দুর্নীতির মূল কারণ হচ্ছে মানুষের লোভ। এই লোভ হতে পারে ক্ষমতার জন্য, অর্থ বা অন্য কিছুর জন্য। যেকোনো কারণেই হোক না কেন, লোভ একটি মানুষকে পশুতে পরিণত করে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীন করে তোলে। সে সততা, ব্যক্তিত্ব ও ভালো-মন্দ বোধ হারিয়ে ফেলে। দুর্নীতি করার জন্য তার মনের ভেতর যে প্রবৃত্তি কাজ করে তা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। এমনকি ধর্মীয় অনুশাসনও তাকে সঠিক পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮-তে দুর্নীতিবিষয়ক অঙ্গীকারের ভূমিকাটি খুব সুন্দরভাবে লেখা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, এটিই আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে দুর্নীতি আমাদের সমাজকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে যেকোনো ক্ষেত্রই যেমন—অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ইত্যাদি এখন আর নিরাপদ নয়। এ ছাড়া ইশতেহারটিতে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতির অবসান ঘটানোর জন্য সরকার ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের গত ১০ বছরের অর্জনেরও বর্ণনা রয়েছে ওই ইশতেহারে। একসময় পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। তবে ইদানীং দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকার প্রশংসার দাবিদার। সরকার সব জেলা প্রশাসকের দপ্তরে ‘অভিযোগ বাক্স’ স্থাপন করেছে, যাতে জনগণ দুর্নীতির অভিযোগ সেখানে জমা দিতে পারে। তবে স্বীকার করতেই হয় যে দুর্নীতি নির্মূল করার অগ্রগতি এখনো তেমন একটা সন্তোষজনক অবস্থায় উপনীত হতে পারেনি।

নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগের এ বিষয়ক পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বলা হয়েছে, যেমন—দুর্নীতি দমন কমিশনকে আধুনিকীকরণ, মন্ত্রীদের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালীকরণ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপকে আরো জোরদার করা ইত্যাদি।

সাধারণ মানুষ দুর্নীতিকে একটি ব্যাধি হিসেবে দেখে থাকে। বাংলাদেশে এটি তৃতীয় স্তরে বিরাজমান ক্যান্সার। কেমোথেরাপি ছাড়া এ রোগের নিরাময় একেবারেই কঠিন। কেমোথেরাপি প্রয়োগ করতে হবে ধীর লয়ে, মাত্রা হিসাব করে এবং অবশ্যই সম্পূর্ণ কোর্স শেষ না হওয়া অবধি তা চালিয়ে যেতে হবে। দুর্নীতি শুধু একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারের মানুষদের মানবিক গুণাবলিকেই নয়, সমগ্র সমাজকেই ধ্বংস করে দেয়। দুর্নীতি একটি মানুষকে এতটাই লোভী করে তোলে যে সেসব সীমার বাইরে চলে যায়। আমাদের শৈশবকালে সবাই দুর্নীতিবাজ বা ঘুষখোর মানুষদের চিনত এবং তাদের সংখ্যা এখনকার তুলনায় অনেক কম ছিল। মানুষ তাদের, এমনকি ওই সব পরিবারের শিশুদেরও ঘৃণার চোখে দেখত। তবে দিনে দিনে সে অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। এখন দুর্নীতিবাজরা সমাজে ভালো অবস্থানে অধিষ্ঠিত, ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ে রয়েছে তাদের সহজ যাতায়াত। সর্বত্র দুর্নীতির প্রতিযোগিতা চলছে, কখনো ক্ষমতার বা প্রতিপত্তির জন্য, কখনো আবার অর্থের জন্য। কন্যার বিয়ের জন্য মা-বাবা এমন বরকেই বেছে নেন যার বেতন-ভাতার বাইরেও অবৈধ অর্থের জোগান আছে। অনেকে এমনও বলে থাকেন যে ঘুষ গ্রহণের কৌশল জানে না বলেই অমুক কর্মকর্তা সৎ।

বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের এতটাই উৎসাহিত করা হয় যে দুর্নীতি করতে কেউ আগেপিছে আর ভেবে দেখে না। এরই মধ্যে দুর্নীতির শিকড় আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়ে গেছে। মূলত দুর্নীতি সামাজিক অবক্ষয়ের গতিকে ত্বরান্বিত করে। এটি এরই মধ্যে আমাদের সামাজিক বাঁধন, নিয়মকানুন ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করে ফেলেছে। একসময় দুর্নীতিগ্রস্ত বা অসৎ মানুষ খুঁজে পেতে কষ্ট হতো, এখন সৎ মানুষের খোঁজ পাওয়াই যে কঠিন হয়ে পড়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষগুলোই আমাদের প্রতিবেশী এবং ক্ষমতাধর হিসেবে সবাই তাদেরই সমীহ করে চলছে। এসব দুর্নীতিবাজ লোকের সঙ্গে বাস করা ছাড়া আমাদের কি আর কোনো উপায় নেই?

ড. এ পি জে আবদুল কালাম ছিলেন ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি। ২০১৫ সালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর পাওয়া তাঁর সম্পদের মধ্যে ছিল কিছু বই, ব্যবহৃত কাপড়চোপড়, একটি বীণা, একটি সিডি প্লেয়ার এবং একটি ল্যাপটপ। তাঁর কোনো টেলিভিশন ছিল না। মানিক সরকার ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তিনি যখন সরকার ছেড়ে চলে যান তখন তাঁর ব্যাংক হিসাবে ছিল মাত্র দুই হাজার ৪১০ টাকা। ভবিষ্যতে আমাদের দেশে এমন জনপ্রতিনিধিদের দেখা পাওয়ার সামান্য আশাও কি আমরা করতে পারি?

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভুটানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীকে অবশ্যই তাঁর পেশা, আয়, সম্পদ ও দায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অপরাধ সম্পর্কিত তথ্য জনগণের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করতে হয়। পরবর্তীকালে যদি নির্বাচন কমিশনের গোচরে আসে যে কোনো প্রার্থী কোনো তথ্য গোপন করেছেন, তাহলে তাঁর আবেদনপত্র বাতিল হয়ে যায়। ভুটান মাত্র কয়েক বছর ধরে গণতন্ত্র চর্চা করে এলেও এ নিয়মটি প্রথম সংসদীয় নির্বাচন থেকেই চালু রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ভুটান সরকার এবং সে দেশের জনগণ রাজনীতিবিদদের সম্পদ সম্পর্কে খোলাখুলিভাবেই জানতে পারে। আমরা কি আমাদের শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ আশা করতে পারি? আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমাদের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাঁরা কি সবার আগে তাঁদের সম্পদের ঘোষণা দিতে এগিয়ে আসতে পারেন না? এতে জনগণের কাছে তাঁদের স্বচ্ছতা স্পষ্ট হবে, গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং ওই উদ্যোগ সব মহলেই প্রশংসিত হবে।

দুর্নীতি নির্মূল করা গেলে যে কাজগুলো করা সহজ হবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—১. সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ২. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো, ৩. আমাদের সব কর্মকাণ্ডে দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা আনয়ন, ৪. সমাজে ন্যায়বিচার ও শান্তি নিশ্চিতকরণ, ৫. ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিদ্যমান আয়বৈষম্য হ্রাস, ৬. স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ৭. জনগণের কাছে রাজনীতিবিদদের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি, ৮. আশানুরূপ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হার অর্জন, ৯. উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিধি বৃদ্ধি, ১০. অর্থপাচার রোধ, ১১. শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন, মূল্যবোধ ও রীতিনীতি ইত্যাদি।

আমরা জানি দুর্নীতির মূলোৎপাটনে সরকারের নিজস্ব চিন্তাভাবনা রয়েছে। তবু দুর্নীতি হ্রাসের জন্য যে বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা যেতে পারে তার মধ্যে রয়েছে—(ক) জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আরো কার্যকর ও বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ, (খ) ব্যাংক লেনদেন, সরকারি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা, সরকারি ক্রয়-বিক্রয় এবং যেকোনো সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় ক্ষেত্রের মনিটরিং কাজে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা; এবং (গ) আন্তর্জাতিক মানে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আধুনিকীকরণ ইত্যাদি।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতিমালা প্রণয়ন কোনো কঠিন কাজ নয়। একটি দেশের দুর্নীতির স্তর শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা বাস্তবিক অর্থেই হাজার গুণ কঠিন কাজ। সর্বোপরি এ জন্য থাকতে হবে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বজ্র কঠিন অঙ্গীকার। অন্যথায় আমাদের ভবিষ্যৎ দুর্নীতির চোরাগলিতে হারিয়ে যাবে। তাই আমাদের সরকারের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং লাখো শহীদের রক্তস্নাত আমাদের পবিত্র মাটি থেকে দুর্নীতিকে চিরতরে নির্মূল করার জন্য তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।

আমরা জানি দুর্নীতি নির্মূল করা মোটেও সহজ কাজ নয় এবং রাতারাতি তা করাও সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের আর সময় নষ্ট না করে নির্মূল প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়তে হলে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা