kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

মানুষের কল্যাণ ছিল তাঁর রাজনীতির উদ্দেশ্য

ড. মো. আনিসুজ্জামান

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষের কল্যাণ ছিল তাঁর রাজনীতির উদ্দেশ্য

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুর খবরটি আমাকে দিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার। অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার বললেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আমাদের রক্ষা করেছেন। সৈয়দ আশরাফ না থাকলে আমরা আজকের অবস্থায় হয়তো থাকতে পারতাম না। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের রক্ষা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশকে মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম নায়ক। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সম্পর্কে অধ্যাপক গোলাম সারোয়ারের মন্তব্য সম্পর্কে ভিন্নমত করার কিছু নেই।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ৫ মে একটি কালো অধ্যায়। হেফাজতে ইসলামীর তাণ্ডব সেদিন ঢাকা শহরের মানুষ দেখেছে। ধর্মের নামে মানুষ কত বীভৎস হতে পারে, মানুষের জীবন কত মূল্যহীন হতে পারে আমরা দেখেছি। হেফাজতের হাত থেকে পবিত্র কোরআন শরিফ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। হেফাজতিরা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে আগুন দিয়েছে, আওয়ামী লীগের অফিস ধ্বংস করেছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত হেফাজতি রাজত্ব কায়েম করেছিল। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া হেফাজতের পক্ষ নিয়েছিলেন। দেশের মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিল শঙ্কিত, ভীত, উদ্বিগ্ন। হেফাজতের মারমুখী অবস্থানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি প্রতিরোধ করার সাহস দেখায়নি। সিভিল সোসাইটি উদাসীন ছিল না, কিন্তু কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ‘সাদা রং’-এর সিভিল সোসাইটি হেফাজতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। উদ্বিগ্ন, উদ্ভ্রান্ত, ভীত মানুষের সামনে কালা পাহাড়ের মতো এসে দাঁড়ালেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। দৃঢ়তার সঙ্গে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘আপনারা চলে যান। আমাদের শক্তি প্রয়োগে বাধ্য করবেন না।’ মিডিয়ায় আশরাফুল ইসলামের সেই ঘোষণা শুনেছি। হেফাজতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নবানরা সেদিন কোনো রকমে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছেন। জনবিচ্ছিন্ন ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী একবার হেফাজতের ঘাড়ে চেপে বসেছিল, আবার হয়তো অন্য কোথাও আশ্রয় নেবে। জনবিচ্ছিন্ন মানুষের কিছু করার থাকে না।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাঙালি জাতিকে আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমেরিকার দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করায় আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, দুই পয়সার মন্ত্রীকে মানে কে? এরপর আবার কেউ যখন বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে, সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা প্রতিবাদ করেছে। বাঙালিকে প্রতিবাদ করার সাহস সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দিয়ে গেছেন। বিদেশি মন্ত্রী-এমপিরা তাঁদের দেশ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেন না। আমেরিকার সব কিছু কি ঠিকমতো চলছে? ট্রাম্প কি সব ঠিক করছেন? ট্রাম্পের অনেক কিছুই সমালোচিত। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যাঁদের দুই পয়সার মন্ত্রী বলেছিলেন তাঁরা তাঁদের দেশ নিয়ে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেন না।

প্রতিটি দেশের সমাজ-সংস্কৃতি ভিন্ন। সমাজ-সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে দেশের শাসন কাঠামো গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের শাসন কাঠামোর মূল ভিত্তি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শাসন কাঠামোর মূল বিষয়গুলো নির্ধারিত হয়েছে। মূল কাঠামো থেকে সরে যাওয়াই বিচ্যুতি। পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশ মূল কাঠামো থেকে সরে গেছে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশকে মায়ের মর্যায় ভালোবাসতেন। অন্তরে তাঁর ছিল লাল-সবুজের পতাকা। এই পতাকার জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন। সে জন্য দেশকে কেউ ছোট করুক এটা তিনি সহ্য করতেন না।

রাজনীতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার খুব বেশি প্রয়োজন নেই—সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তা প্রমাণ করেছেন। দেশের মানুষকে ভালোবাসাই রাজনীতির মূল শিক্ষা। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশকে ভালোবাসতেন। দেশের মানুষের কল্যাণ ছিল তাঁর রাজনীতির উদ্দেশ্য। লন্ডনের চাকরি, আপনজন এবং উন্নত জীবন ফেলে দেশের মানুষের জন্য ভালো কিছু করার উদ্দেশ্যেই তিনি ফিরে এসেছিলেন। তিনি ভালো কিছু করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অন্য উচ্চতায় গেছে। দেশ এগিয়েছে। তিনি  কথা বলতেন কম। প্রয়োজনীয় কথা বলতেন। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস কম কথা বলতেন, শুনতেন বেশি। সবার কথা শুনে সক্রেটিস উত্তর দিতেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মধ্যে এই গুণ ছিল। মিডিয়ায় আসতে খুব একটা দেখা যায়নি। প্রয়োজনের সময় তাঁকে সব সময় পাওয়া গেছে।

সময়ের আগেই বাংলাদেশের ক্লাসিক্যাল রাজনৈতিক নেতা  সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম চলে গেলেন। তিনি শুধু আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশের সম্পদ। তাঁর শূন্যতা সহজেই পূরণ হবে না। তিনি বাংলাদেশে যে আদর্শ রেখে গেছেন, সেই পথে দেশ বহু দূর এগিয়ে যাবে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাঙালিকে সাহস জোগাবেন, শক্তি দেবেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামদের মৃত্যু হয় না, মানুষের মনে বহু দিন বেঁচে থাকেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আদর্শ বেঁচে থাক চিরদিন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য