kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কে হচ্ছেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কে হচ্ছেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এনডিএ কি ক্ষমতায় ফিরতে পারবে? ১৩০ কোটি লোকের বেশির ভাগই মনে করে, যেভাবে তিনি পাঁচ বছর ধরে জনগণের ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছেন, তাতে আরো একবার তাঁকে সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। সম্প্রতি পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিজেপির পর্যুদস্ত হওয়া সেটাই ইঙ্গিত করে। এর মধ্যে হিন্দি বলয়ের তিনটি রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় ছিল।

এই পাঁচটি রাজ্যে হেরে যাওয়ার পর থেকেই বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ এবং আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের প্রকাশ্যে জনসভায় শরীরী ভাষায়ই মালুম হচ্ছে, বিজেপি ধরেই নিয়েছে এবার আর তারা জিততে পারবে না। তাই তারা গোটা দেশে একজনকেই আক্রমণ করছে। তিনি হলেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। ২০১৪ সালে দেওয়া ১৯টি প্রতিশ্রুতির একটিও পালন করেননি মোদি। গুজরাট থেকে শুরু করে রাজ্যে রাজ্যে জাতপাতের রাজনীতি কায়েম করেছেন।

হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভাজনই তাদের রাজনীতির উপজীব্য। যা পাঁচ বছর পর ভারতবাসী আর মেনে নিতে পারছে না। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্বরাজ ইন্ডিয়া পার্টির সভাপতি, বিশিষ্ট নির্বাচন বিশেষজ্ঞ যোগেন্দ্র যাদব একটি টিভি চ্যানেলে বলেছেন, বিগত শতকের চারের দশকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যেভাবে টু-নেশন থিওরি চালু করেছিলেন, মোদি-অমিত শাহরা সেই একই কায়দায় জাতপাতের বিভাজন করেই চলেছেন। উচ্চবর্ণের সংরক্ষণ করতে গিয়ে আরো বিপাকে পড়েছেন। উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠেছে। বিজেপির ভরসা ছিল অসমসহ উত্তর-পূর্বের ২৫ আসন তারা দখল করবে। যোগেন্দ্র যাদবের হিসাব অনুযায়ী ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে বিজেপি একটি আসনও পাবে না।

এবার দেখা যাক, ভারতের কোন রাজনৈতিক দলের কী পরিস্থিতি। মোদির নেতৃত্বে এনডিএ শরিক তামিলনাড়ুর এআইডিএমকে বিজেপিকে ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। বেরিয়ে গেছে দীর্ঘদিনের শরিক মহারাষ্ট্রের শিবসেনা। উত্তর প্রদেশে বেরিয়ে গেছে ‘আপনা দল’। অন্ধ্রের তেলেগু দেশম পার্টি। গোয়ার মহারাষ্ট্র গোমন্তক পার্টি। ওড়িশার বিজু জনতা দল। যেসব আঞ্চলিক দল বেরিয়ে গেছে, তাদের মধ্যে কর্ণাটকের জেডিএস, অন্ধ্রের তেলেগু দেশমসহ আরো ছোটখাটো কয়েকটি দল। অসমের অসম গণপরিষদও (এজিপি) বিজেপি জোট ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত চারটি সর্বভারতীয় দল আছে। জাতীয় কংগ্রেস, বিজেপি, কমিউনিস্ট পার্টি এবং মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টি। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যাওয়া আরেকটি আঞ্চলিক দল। দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে আম আদমি পার্টি। জম্মু-কাশ্মীরের বহু পুরনো আঞ্চলিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স। নেতা ফারুক আবদুল্লা। তিনি ঘোষণা করেছেন, তাঁর দল স্বাধীনতার পর থেকে কংগ্রেসের সঙ্গে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। হিন্দি বলয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য বিহারের লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডি পার্টি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশ। এই রাজ্যে লোকসভায় মোট ৮০টি আসন। রাজ্যের দুটি আঞ্চলিক দল সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদরের নেতৃত্বে সমাজবাদী পার্টি এবং আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর নেতৃত্বে বহুজন সমাজ পার্টি জোট বেঁধেছে। ৮০টির মধ্যে এরা ৭৬টি আসনে লড়াই করবে। উত্তর প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসন রায়বেরিলি ও আমেথি। এই দুটি আসনে তারা প্রার্থী দেবে না। রায়বেরিলি থেকে দাঁড়াবেন সোনিয়া গান্ধী। তিনি একান্তই না দাঁড়ালে ওই আসনে দাঁড়াবেন তাঁর কন্যা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। আর আমেথি কেন্দ্র থেকে দাঁড়াবেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী।

আগে মোটামুটিভাবে স্থির হয়েছিল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি একই সঙ্গে উত্তর প্রদেশে লড়াইয়ে থাকবে। তাদের জোট বাঁধার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মোদি-অমিত শাহরা বলেছেন, এটা অনৈতিক জোট। বিজেপির অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছেন, ‘আমরা দেখে নেব।’ কিভাবে দেখবেন। তা প্রকাশ্যে এসে গেছে। ওই দুই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন দুর্নীতি হয়েছিল। সেই দুর্নীতির ব্যাপারে সিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। মায়াবতীকে পাশে বসিয়ে অখিলেশ যাদব দাবি করেছেন, মায়াবতীকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা হবে। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর উত্তর প্রদেশ থেকে জওয়াহেরলাল নেহরু, লালবাহাদুর শাস্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, চন্দ্রশেখর, ভিপি সিং প্রমুখ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

অখিলেশ যা-ই বলুন, তাঁদের জোট কয়টি আসন পাবে, তা তিনি ব্যাখ্যা করেননি। অন্যদিকে রাজনৈতিক মহল মনে করে, মায়াবতীর দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। যোগেন্দ্র যাদবের ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত হিসাব—কংগ্রেস ১৭১ থেকে ১৮০টি আসন পাবে। তাদের জোটসঙ্গীরা পাবে শতাধিক আসন। এরই মধ্যে তামিলনাড়ু থেকে মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশে আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে কংগ্রেসের প্রাক-নির্বাচনী জোট হয়ে গেছে। কংগ্রেসের জোট হয়েছে জম্মু-কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গেও। এই জোট ঘোষণার পরই উত্তর প্রদেশের কংগ্রেস সভাপতি রাজবাব্বর ঘোষণা করেছেন, কংগ্রেস উত্তর প্রদেশে কমপক্ষে ৫০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। সে ক্ষেত্রে উত্তর প্রদেশ থেকে পরবর্তী সময়ে অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন।

তবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট শরিকরা একের পর এক ঘোষণা করে দিয়েছে, তাদের নেতা রাহুল গান্ধী। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবিদার। তাঁর পরিবার থেকেই প্রকাশ্যে এই দাবির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র মনে করেন, আগেকার মতো প্রণব বাবুর চাপে পড়ে তারা কিছুতেই তৃণমূলের সঙ্গে জোট বাঁধবে না। সে ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার বামপন্থীদের সঙ্গে জোট বাঁধা। রাহুল নিজেও চান না মমতার সঙ্গে জোট বেঁধে কংগ্রেসের ক্ষতি করতে। মমতার ওপর যে রাহুলের কোনো বিশ্বাস নেই। তা তিনি গোপনও রাখেননি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। দলীয় সভা তো বটেই, অন্যত্রও তাঁর দলের নেতা-মন্ত্রীরা বলে বেড়াচ্ছেন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী হবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর জায়গায় রাজ্যে দায়িত্ব সামলাবেন তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের এই প্রচারে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মোটেও যে গুরুত্ব দিচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে হাত ধরে নিয়ে এসেছেন এই মমতাই। সারদা, রোজভ্যালিসহ তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতির ইস্যুতেও স্পষ্ট হয়ে গেছে, বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের তলায় তলায় যোগ।

আর সেই লক্ষ্যেই রাহুল গান্ধীর মহাজোটের পাল্টা ফেডারেল ফ্রন্টের তত্ত্ব নিয়ে বাজারে নেমেছেন তৃণমূল নেত্রী...। তিনি বিজেপির বিরোধিতায় আগামী ১৯ জানুয়ারি কলকাতার ব্রিগেড গ্রাউন্ডে একটি সভা ডেকেছেন। সেখানে কয়েকটি আঞ্চলিক দলের নেতৃত্বেরও থাকার কথা। মমতার আশা, ওই বিরোধী নেতারা ব্রিগেড মঞ্চ থেকে তাঁর নামই পরবর্তী সময়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করবেন। কিন্তু বাস্তব হলো, সেই আঞ্চলিক দলগুলোর অনেক নেতাই কংগ্রেসের সঙ্গে প্রাক-নির্বাচনী জোট করে ফেলেছেন।

নির্বাচন এসে যাওয়ায় হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী উথালপাথাল হচ্ছে। ভারতের ৮০ কোটি ভোটার ঠিক করবে তারা কাকে চায়—নরেন্দ্র মোদি, মায়াবতী, না রাহুল গান্ধী?

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা