kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

মন ও ভাবনার মূল্যায়ন দরকার

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মন ও ভাবনার মূল্যায়ন দরকার

মন থেকে চিন্তার উৎপত্তি, নাকি চিন্তা থেকে মনের উৎপত্তি। বিষয়টি বোঝা কঠিন হলেও এ দুটি উপাদান দিয়েই মানুষকে চিনতে পারা যায়। তরুণ, প্রবীণ থেকে শুরু করে আমজনতার কথা যদি আমরা ভাবি, তাহলে কোথায় যেন একটা ফাঁক পরিলক্ষিত হয়। এখান থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের নিজেদের পরিবর্তনের উপাদানগুলো খুঁজে নিতে হবে। মনোবিজ্ঞান এ ক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য করতে পারে। সেখান থেকে আমাদের বন্ধ চোখগুলো খুলে সারা পৃথিবীকে একটা উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরা দেখতে পাব।

১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্ক শহরে নিজ অ্যাপার্টমেন্টের সামনে কিটি জেনোভেস নামের এক নারীকে প্রকাশ্যে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। সেটি ছিল ওই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর অন্যতম। সেটি এত আলোচিত হওয়ার কারণ হিসেবে ঞযব ঘব িণড়ত্শ ঞরসবং দাবি করেছিল যে ওই সময়ে ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিল ৩৭-৩৮ জনের মতো, যাদের কেউ ওই নারীকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেনি। এরপর এই ঘটনা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়। জনাকীর্ণ একটি জায়গায় কেউ বিপদে পড়লে আশপাশের কেউ সাহায্য করার জন্য এগিয়ে না আসার কারণ বুঝতে হলে দুটি বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। ‘উরভভঁংরড়হ ড়ভ জবংঢ়ড়হংরনরষরঃু’ এবং ‘ইুংঃধহফবৎ ঊভভবপঃ’। সবাই ভাবে, অন্য সবাই তো আছে সাহায্য করার জন্য, আমি কেন নিজেকে ঝামেলায় জড়াব।

সাম্প্রতিক পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নের যুক্তিবাদী চিন্তার ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও নীতিবাদী চিন্তার প্রসার তরুণদের মধ্যে না থাকায় নানা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে। এর দ্বারা মনও প্রভাবিত হচ্ছে। ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী টেলরের মতে, সংস্কৃতি হলো ‘সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, আইন, নৈতিকতা, প্রথাসহ যে সক্ষমতা ও অভ্যাস রপ্ত করে তার জটিল সমাহার।’ ফলে নীতিবিদ্যা সংস্কৃতির প্রধান একটি উপাদান হিসেবে প্রয়োগ করে তরুণদের নেতিবাচক ধারণাকে ইতিবাচক করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বিভিন্ন দেশের নির্বাচনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমরা তরুণ ও প্রবীণ সম্প্রদায়ের কথা ভাবতে পারি। নির্বাচনে তরুণ ও প্রবীণদের মধ্যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার ভিন্নতা লক্ষণীয়। প্রবীণরা রাষ্ট্রীয় নির্বাচনকে অতীতের বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার নিরিখে বিবেচনা করেন। অন্যদিকে তরুণদের ক্ষেত্রে নির্বাচন বর্তমান ও আগামীর সম্ভাবনাময় দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়ন কতটা সফল হবে, তার সম্ভাব্য ফলাফলের ওপর নির্ভর করে।

এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। মুন জায়ে ইন ৪০ শতাংশ ভোট নিয়ে ৯ মে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। নির্বাচনী বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, প্রজন্মের লড়াইয়ে জিতল দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা। তাহলে কি পুরনো প্রজন্মের পরাজয় ঘটেছে। বিষয়টি এভাবে সহজ-সরল গাণিতিক নিয়মে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। দেশটি এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হলেও বেকারত্ব বৃদ্ধি, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনীহা তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছিল।

ব্রিটেনের নির্বাচনেও বয়সভিত্তিক প্রভাবকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এখানেও নবীন ও প্রবীণের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার বিষয়টি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কাজ করেছে। প্রবীণদের মধ্যে কনজারভেটিভ পার্টির সমর্থন বেশি আর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে লেবার পার্টির সমর্থন বেশি। প্রবীণরা বিনা মূল্যে শিক্ষা, কম মূল্যে বাড়ি ও সহজে মানসম্মত চাকরি লাভের সুবিধা পেলেও তরুণরা এর কিছুই পাচ্ছে না।

আবার সরকারি কল্যাণ সেবার অধিক সুবিধাভোগীও প্রবীণরা।

অন্যদিকে লেবার পার্টি তরুণদের শিক্ষা ফি বাতিল, দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ, সহনীয় মূল্যে আবাসন ও শ্রেণিবৈষম্য নিরসনসহ উদার ও মানবিক নীতিগুলো অনুসরণ করে তরুণ প্রজন্মের সমর্থন আদায়ের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণ ও প্রবীণদের রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার মতো নানা উপাদান রয়েছে। নতুন প্রজন্মের সৃষ্টিশীল ভাবনা ও প্রবীণদের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয়ের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের ইতিবাচক ধারণাকে বাস্তবে পরিণত করা সম্ভব। বিষয়টি অন্যভাবেও ভাবা যেতে পারে। সেটা হলো তরুণরাও লক্ষ্য স্থির করে তা অর্জন করতে পারে। আবার প্রবীণরা সৃষ্টির ধারণা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে পারে। এ ধরনের প্রতিটি অবস্থার ক্ষেত্রে মানসিকতা ও ভাবনার বিষয়টি বিশ্লেষণ করে আমাদের অগ্রসর হতে হবে, তাহলেই সব ক্ষেত্রে আমাদের মূল্যায়ন করার সক্ষমতা বাড়বে ।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা