kalerkantho


আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের আভাস দিলেন ম্যাখোঁ

গাজীউল হাসান খান

১৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের আভাস দিলেন ম্যাখোঁ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ অর্ধশতাধিক বিশ্বনেতার উপস্থিতিতে ১১ নভেম্বর প্যারিসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবসানের শতবর্ষপূর্তি ও তাতে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। সেদিন ঐতিহাসিক প্যারিস নগরীর জনপ্রিয় সাঁজালিজের প্রান্তে অবস্থিত জনপ্রিয় আর্ক দ্য ট্রিয়ম্পের নিচে সমবেত নেতাদের ও বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ, যা রাজনীতিকদের দৃষ্টি খুলে দিতে পারে। আমেরিকার বর্তমান ‘শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ কিংবা ‘জাতীয়তাবাদে’ বিশ্বাসী বলে অভিহিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনেই তিনি জাতীয়তাবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও তথাকথিত জনরঞ্জনবাদী রাজনীতির কুফল সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে হুঁশিয়ার করেছেন। ম্যাখোঁ বলেছেন, প্রকৃত দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদ—দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয়। তথাকথিত জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এখানে তিনি যা বলতে চেয়েছেন তা হচ্ছে, উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদ, ফ্যাসিবাদ এবং শেষ পর্যন্ত জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের জন্ম হতে পারে। তথাকথিত জাতীয়তাবাদের নামে বিচ্ছিন্নতাবাদ একটি মুক্তবিশ্ব অর্থাৎ মুক্ত অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা ধ্বংস করতে পারে। এতে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনা, অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যের পরিমাণ আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আবার উগ্রবাদ, সন্ত্রাস এবং ভিন্ন চেহারায় ফ্যাসিবাদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চেপে বসতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে উগ্র জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণার বহিঃপ্রকাশ ও অনেকটা তারই ভিত্তিতে উপনিবেশ বিস্তারের প্রয়াস বিশ্বব্যাপী সর্বনাশ ডেকে এনেছে। বিভিন্ন অঞ্চল ও ভাষাভাষীর মানুষকে বিরাট অপশাসন ও শোষণ-বঞ্চনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ আরো উল্লেখ করেছেন যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবসানের শতবর্ষপূর্তি হলেও এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তা ছাড়া পৃথিবী থেকে তেমন যুদ্ধের আশঙ্কা এখনো মুছে যায়নি। উগ্র জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণা, ধর্মীয় সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদের উত্থান থেকে আবারও একটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব নয়। জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনীতি এবং কূটনীতির নামে আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নতুন নয়। সমাজতন্ত্রের আচ্ছাদনে নিজস্ব প্রভাব বলয় ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে অত্যন্ত দৃশ্যমান ছিল। তেমনি গণতন্ত্রের নামাবলি ধারণকারী যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা গেছে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার বিশাল আয়োজন।

১৯১৮ সালের নভেম্বরে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাধ্যমে চার বছর স্থায়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থামানো হলেও ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ভার্সাই চুক্তি নামে ফ্রান্সে প্রণীত এক ঘোষণার মাধ্যমে তৎকালীন জার্মানির ওপর চাপানো হয়েছিল অনেক অন্যায্য ব্যবস্থা। তারই ফলে জার্মানিতে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল বলে ১১ নভেম্বর প্যারিসে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর পরাজিত জার্মানির বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা এবং তার বিভিন্ন অবিচ্ছেদ্য অঞ্চল যেভাবে মিত্র শক্তির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, তাতে ভেঙে পড়ে জার্মান অর্থনীতি। ফলে জার্মানিতে ক্রমে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদ এবং উত্থান ঘটে অ্যাডল্ফ হিটলারের মতো নেতার। এই হিটলারই ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন ও তাদের ইউরোপীয় অন্যান্য মিত্র শক্তির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবসানের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজকের বিশ্বনেতাদের এবং বিশ্ববাসীকে অত্যন্ত সময়োচিতভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিশ্বযুদ্ধ বাধার কারণ ও পরিণতি সম্পর্কে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দীর্ঘ সাত দশকের শান্তিপূর্ণ সময়ে বিশ্বে অর্জিত বিভিন্ন বিষয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন ম্যাখোঁ। তিনি বলেছেন, এ সময়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, শিক্ষায়ন, কৃষি সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিরাট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। সম্প্রসারিত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিস্তার ঘটেছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের। এতে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা দূর হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। দ্রুত শিক্ষা বিস্তারের কারণে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক চিন্তা-চেতনা বিকাশ লাভ করেছে। এ পরিবর্তন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান, হ্যাবসবার্গ, রুশ এবং অটোমান সাম্রাজ্যের চিরদিনের মতো অবসান ঘটে। উপনিবেশবাদ ও রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্র ও অঞ্চলবিশেষে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা নিজস্ব স্থান খুঁজে নিতে শুরু করে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সংঘটিত হয় সমাজতান্ত্রিক (বলশেভিক) বিপ্লব। এর পাশাপাশি নয়া উপনিবেশবাদ ও নয়া সাম্রাজ্যবাদও তত্ত্বগতভাবে বিশ্বরাজনীতিতে নিজস্ব স্থান করে নেওয়ার প্রয়াস পেয়েছিল। ক্ষেত্রবিশেষে পরবর্তী পর্যায়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে পুঁজিবাদের চরম বিকাশ ঘটে। এতেও তথ্য-প্রযুক্তির আদান-প্রদান, শিল্পায়ন ও কৃষি সম্প্রসারণের ফলে স্বল্পোন্নত দেশগুলো মুক্তবাজারের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে ক্রমে ক্রমে নিজেদের পশ্চাৎপদতা ও দারিদ্র্য দূর করতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল। এশিয়া এবং বিশেষ করে ইউরোপের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে (জার্মানি, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, রাশিয়া, ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি) যুদ্ধবিগ্রহের অবসানের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল প্রথম বিশ্ব সংস্থা ‘লীগ অব নেশনস’। এতে পশ্চিম ইউরোপ ছাড়াও পূর্বে বাল্টিক থেকে বলকান এবং মধ্য এশিয়ায় যুদ্ধবিগ্রহের প্রকোপ কমে আসে। ১৯২৩ সালে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থল তুরস্কে নতুন প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল। তখন থেকেই অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ব্রিটিশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিক দেশগুলোর মধ্যে স্বাধীনতার শক্তিশালী স্পৃহা জেগে ওঠে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়।

শতবর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন উপলক্ষে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও তার ভয়াবহতা তুলে ধরার জন্য ১১ নভেম্বর স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় প্যারিস, লন্ডন, বার্লিনসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় নগরীতে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও নাগরিকরা যাতে যুদ্ধের পরিণাম, বিশেষ করে কারণগুলো সম্পর্কে অবহিত হতে পারে এবং তা থেকে দূরে থাকে—সে শিক্ষা বা সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এর মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে প্যারিসের আর্ক দ্য ট্রিয়ম্প এবং এর পার্শ্ববর্তী টুম্ব অব আননোন সোলজার্স অর্থাৎ অজানা সৈনিকদের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়েছিল। সে বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলসহ প্রায় ৭০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় এক কোটি সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ছিল ব্রিটিশ সৈনিক ও সাধারণ মানুষ। আহতের সংখ্যা অগণিত। ধ্বংস হয়েছে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা পুনরুদ্ধার করা কখনো সম্ভব হয়নি। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ১৯১৪ সালের নভেম্বরের ১১ তারিখ যখন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন অনেকে ভেবেছিল সে বছর ক্রিসমাসের আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু অবাক কাণ্ড এই যে সে যুদ্ধ চার বছর স্থায়ী হয়েছিল। সেই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, তুরস্ক, বুলগেরিয়াসহ কিছু দেশ। এবং অপরদিকে রাশিয়া, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, ইতালি, রুমানিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। অথচ মজার বিষয় হচ্ছে, উল্লিখিত কোনো বড় দেশের কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়নি। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এক ক্ষুদ্র শহর বসনিয়ার সারায়েভোতে ১৯১৪ সালের ২৮ জুন আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ক্রাউন প্রিন্স আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড ও তাঁর স্ত্রী সুফি। তাঁরা নিহত হয়েছিলেন সার্বিয়ার অভিযুক্ত জাতীয়তাবাদীদের হাতে। সার্বিয়া ও তার উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি চাচ্ছিল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির শাসনের অবসান ঘটাতে। সে ঘটনায় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সরকার সার্বিয়ার সরকারকে সম্পূর্ণভাবে দোষারোপ করে সার্ব জাতীয়তাবাদীদের চিরতরে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দাবি পূরণ করা কোনোমতেই সম্ভব ছিল না সার্বদের পক্ষে। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ওপর থেকে দাবি প্রত্যাহার করাও সম্ভব ছিল না সার্বদের।

সার্ব জাতীয়তাবাদী ও সার্বিয়া সরকারের পক্ষে তখন প্রকাশ্যে সমর্থন জানায় শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র রাশিয়া। উপায়ান্তর না দেখে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ঔপনিবেশিক সরকার তখন সার্বদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা না করে জার্মানির কাইজার দ্বিতীয় উইলহামের সমর্থনের জন্য। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির শাসকরা তখনই মনে করেছিলেন যে রাশিয়া সে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলে তার মিত্র দেশ ফ্রান্স এবং এমনকি গ্রেট ব্রিটেনও শেষ পর্যন্ত দূরে থাকবে না। সে অবস্থায় উপনিবেশবাদী শক্তি জার্মানি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অপর উপনিবেশবাদী শক্তিকে ঠেকাতে সার্বিয়াকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে দিয়েছিল। সে কারণে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই অর্থাৎ ২৮ জুলাই রাশিয়া, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও সার্বিয়া প্রস্তুত হয়ে গেল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও জার্মানির বিরুদ্ধে। যথারীতি শুরু হয়ে গিয়েছিল এক ভয়াবহ সংঘর্ষ, যা শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হয়েছিল চার বছর স্থায়ী বিশ্বযুদ্ধে। এত ব্যাপক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তৎকালীন ঔপনিবেশিক শক্তি জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া, গ্রেট ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি কারোরই ছিল না। সে ব্যাপক ও ভয়াবহ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বিশ্বের বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তি মূলত দুটি প্রধান জোটে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তখন তারা ভাবতেও পারেনি সে যুদ্ধের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কিংবা ভয়াবহতার কথা। এতে কত শিশু পিতৃহীন হবে কিংবা কত নারী স্বামীহারা হবে, তখন কেউ ধারণাও করতে পারেনি। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হচ্ছে ভূমি, সম্পদ, ক্ষমতা ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শাসকগোষ্ঠী খুব তাড়াতাড়িই সেসব ভুলে যায়। নতুবা এত বড় একটি ভয়াবহ যুদ্ধের দুই যুগের মধ্যেই আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয় কিভাবে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিলেন কাইজার দ্বিতীয় উইলহাম। বিদায় নিয়েছিল অটোমান ও হ্যাবসবার্গ রাজশক্তি। রাশিয়ায় রাজশক্তিকে উত্খাত করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল; কিন্তু দূর হয়নি আরো ভয়াবহ যুদ্ধবিগ্রহের আশঙ্কা। গণতন্ত্রের সূচনা ও শিল্প বিপ্লবের ফলে সরকার পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন এলেও নিত্যনতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কার ও যুদ্ধবিগ্রহের হুমকি-ধমকি এখনো কমেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও ধনতান্ত্রিক কিংবা পুঁজিবাদী স্বার্থে নিত্যনতুন আর্থ-সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে অনেকের মতে, হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জার্মানির প্রতি সীমাহীন অন্যায় ও অবিচারের কারণে। ফ্রান্স ও ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন মিত্র শক্তি যুদ্ধের পর জামার্নিকে আরো দুর্বল করার লক্ষ্যে তাদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ বণ্টন করে দিয়েছে অন্যদের মধ্যে। জার্মানির ওপর আরোপ করা হয়েছিল দুর্বহ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা, যা নিয়মিতভাবে প্রদান করতে অক্ষম হয়ে পড়েছিল তারা। তা ছাড়া সমুদ্রে তাদের বাণিজ্যপথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এসবের বিরুদ্ধে অ্যাডল্ফ হিটলার জার্মান জাতীয়তাবাদের নামে এক উগ্র রাজনীতি ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন সে দেশে।

হিটলারের সে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং জার্মানিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করার প্রয়াস শান্তিপ্রিয় বিশ্ববাসীর জন্য এক চরম উদ্বেগ ও ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিটলার সমগ্র জার্মানবাসীকে যেন এক বিকারগ্রস্ত জাতিতে পরিণত করেছিলেন। নির্বিবাদে হত্যা করেছিলেন ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষকে। বর্ণবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, জাতিগত বিদ্বেষ এবং বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী কায়দায় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে লাগলেন। এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যাবতীয় সমস্যার সমাধান না খুঁজে তাঁর দেশকে আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন শুধু জার্মানির হারানো অঞ্চল ফিরে পাওয়াই নয়, তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপসহ বিশ্বে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে। আকাশ ও সমুদ্রপথে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। তিনি শক্তি দিয়ে সব কিছু মোকাবেলা করতে চেয়েছিলেন। সে কারণে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া আবার তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এক বিশাল যুদ্ধের ডঙ্কা আবার যখন বেজে উঠল তখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও আর দূরে সরে থাকা সম্ভব হয়নি। কারণ জাপানি বোমারু বিমান যখন যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার আক্রমণ করল তখনই বোঝা গিয়েছিল, সামনের সে যুদ্ধের পরিণাম হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে আরো অনেক ভয়াবহ। কিন্তু পর পর ঘটে যাওয়া দুটি বিশ্বযুদ্ধ থেকে আমরা কী শিক্ষা নিয়েছি? সে প্রশ্নই ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সেদিন প্যারিসে বিশ্বনেতাদের ও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে আবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে। সে সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ নয়।

মঞ্চে উপবিষ্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে লক্ষ্য করে ম্যাখোঁ তাঁর বক্তব্য না দিলেও মনে হয়েছিল, তাঁদের উদ্দেশেই যেন সব নিবেদন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযুক্ত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা নতুন করে আমেরিকাকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করার সিদ্ধান্ত বিশ্ববাসীর কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। অন্যদিকে রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্রিমিয়া দখল জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করারই একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। আজও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে ফিলিস্তিনিদের ভূমি জবরদখল করে রয়েছে ইহুদিবাদী ইসরায়েল। এত মৃত্যু ও এত রক্তপাতের পরও রাশিয়ার সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে রয়েছেন সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদ। আমেরিকা ও ব্রিটেনের সমর্থনে ইয়েমেনে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব। এসব নিষ্পত্তির জন্য আরেকটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ কি আমরা ডেকে আনছি না? অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম, অপশাসন-শোষণ এখন এমন একটি বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়তে পারে। এই পারমাণবিক যুগের যুদ্ধ আগের মতো হবে না। এ যুদ্ধে একটি বোমায় লাখ লাখ মানুষ নিশ্চিহ্ন হতে পারে। সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে পারে সারা বিশ্ব। সে আশঙ্কার কথাই সেদিন প্যারিসে ব্যক্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ। হুঁশিয়ার করতে চেয়েছেন বিশ্বাসী এবং বিশেষ করে বিশ্বনেতাদের।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com

 



মন্তব্য