kalerkantho

রবিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৮। ২৪ অক্টোবর ২০২১। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

উন্নত বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষাসহায়ক ভাতা

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

২৮ মে, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উন্নয়ন ধারণাটি ব্যাপক, বহুমাত্রিক ও আপেক্ষিক বিষয়। বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে মানব উন্নয়ন বা মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বাধিক ও সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেকোনো রাষ্ট্রের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য প্রয়োজন যথাযথ শিক্ষাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা। শিক্ষা মানুষের মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ তৈরি করে, যা উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রতিটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। এসব কর্মসূচির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে দ্রুতগতিতে সামনে নিয়ে আসার জন্য কিংবা বিশেষ সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার ক্রাইম রোধের জন্য ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের প্রতি সপ্তাহে ২৫০ পাউন্ড করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশনস হেডকোয়ার্টার্স। শর্ত ছিল যে শিক্ষার্থীদের ‘সাইবার সামার স্কুল’-এ যোগ দিতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যন্ত একটি এলাকায় কুমারী মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। উথুকেলা পৌর কর্তৃপক্ষ সেখানে এমন এক ধরনের বৃত্তি চালু করেছে, যা পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা কুমারিত্ব রক্ষা করা। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষায় বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান দিক হতে পারে পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাসহায়ক ভাতা বা শিক্ষাবৃত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষাবৃত্তি বা বৃত্তি হলো শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার জন্য এক ধরনের আর্থিক পুরস্কার। বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হয়ে থাকে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—শিক্ষার্থীর মেধা, আর্থিক অবস্থা, প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি। বৃত্তিপ্রাপ্ত বা বৃত্তিভোগী বলতে বোঝায়, যে নিয়মিত অর্থ সাহায্য পায়। আমাদের দেশে বৃত্তিপ্রাপ্ত বলতে বোঝায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো ফলের জন্য প্রতিষ্ঠান বা সরকার বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে প্রাপ্ত অর্থ। মূলত মেধাবীদের শিক্ষার খরচ লাঘব এবং আরো বেশি উৎসাহিত করার জন্য এই ভাতা প্রদান করা হয়। অর্থের অভাবে শিক্ষাবঞ্চিতদের শিক্ষায় আকৃষ্ট করা ও ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কর্মসূচি চালু হয়, যার নাম উপবৃত্তি।

১৯৯৪ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু হলেও নারীশিক্ষায় নবযুগের সূচনা হয় ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ের ছাত্রীদের জন্য চালু হয় উপবৃত্তি। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বর্তমানে স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ের ছাত্ররাও উপবৃত্তি পেয়ে থাকে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্ভাবনী ধারণা, সানুগ্রহ অভিপ্রায় ও নির্দেশনা অনুযায়ী ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট’ গঠিত হয়েছে। ট্রাস্টের প্রধান লক্ষ্য দেশের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেন মা-বাবা ও অভিভাবকের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে শিক্ষার সুযোগ তথা সর্বজনীন মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) হিসাব মতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সর্বমোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩,৬৯,৬১,৯৭৮ জন। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ১৬,৬৪,৫৭৭ জন ছাত্র-ছাত্রীকে সরাসরি অর্থ বা বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মোট শিক্ষার্থীর ৪৫ শতাংশই কোনো না কোনো প্রণোদনা বা বৃত্তি-উপবৃত্তি পেয়ে থাকে। এই বৃত্তি-উপবৃত্তি বা মেধাবৃত্তি প্রদান করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।

বর্তমানে সরকারের পরিকল্পিত ও সুষম দারিদ্র্যবান্ধব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে দারিদ্র্যের হার কমে ২২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী অতিদারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে। সে হিসাবে দেখা যায়, শুধু অতিদারিদ্র্য নয়, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী সব শিক্ষার্থীকেই সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় লেখাপড়া করার সুযোগ পাওয়ার কথা। কেননা বাংলাদেশে বিদ্যমান মেধাবৃত্তি, বৃত্তি বা উপবৃত্তি প্রদানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৪৫ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী সরাসরি আর্থিক সহযোগিতা পায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়াও আর্থিক সাহায্য প্রদান করা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বৈদেশিক ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ প্রায় সব মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। উপরন্তু দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর জন্য ফেলোশিপ, মেধাবৃত্তি ও অন্যান্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়ে থাকে ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিগত পর্যায়েও।

এ ধারা অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃত্তি-উপবৃত্তি ও মেধাবৃত্তি তথা শিক্ষাসহায়ক ভাতাও বাড়বে এবং দেশের কোনো শিক্ষার্থীই অর্থের অভাবে লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত থাকবে না। যদি তা-ই হয়, টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে একধাপ এগিয়ে থাকবে প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক

[email protected]



সাতদিনের সেরা