kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ওয়ালিউর রহমান

২৮ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল

২৫ আগস্ট কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় আমি বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেলের একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের অংশবিশেষ পড়লাম। তিনি বলেছেন, ‘পুরনো হাইকোর্ট ভবন থেকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অন্যত্র সরিয়ে নিলেও তাতে বিচার কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়বে না।’

বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল যিনি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আইন উপদেষ্টা, তাঁর কাছ থেকে আমি কথাগুলো শুনে শুধু অবাক হয়েছি।

তিনি যেভাবে কথাগুলো বললেন, তাতে মনে হয়েছে, হয় তিনি ব্যাপারটি সিরিয়াসলি নেননি অথবা তিনি বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসটি ঠিকমতো পড়েননি বা মাথায় রাখেননি।

দৃশ্যত হয়তো তিনি ভুলে গেছেন, ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ কিভাবে স্বাধীন হয়েছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এ কথাই বারবার বলেছেন যে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যই প্রমাণ করে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। বাঙালি জাতির এই যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি। স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণ হয়ে তারা একটা স্বাধীনতাকামী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি এ দেশটিকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে চেয়েছিলেন। যেটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সম্ভব হয়নি।

আমি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালটা কী? এটি হলো একটি আইন International Crimes Tribunal Act (১৯৭২)। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসের ২০ তারিখে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তত্কালীন পার্লামেন্টে গৃহীত হয় এবং সেটি আমাদের সংবিধানে সংরক্ষিত আছে। জিয়াউর রহমানের উসকানিতে যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে খুন করা হয়, এর পরপরই জিয়াউর রহমান Collaborators Act বিলুপ্ত করলেন ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৭৫। এই অপঃটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে করা হয়েছিল। কারণ তিনি যুদ্ধাপরাধী, যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কাজ করেছে, যারা ৩০ লাখ মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছে, যারা আমাদের তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হানি করেছে, যারা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, সেই কুখ্যাত তথাকথিত শান্তি কমিটি আলবদর, রাজাকার, আলশামসের মাধ্যমে মূলত জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে তথা পাকিস্তানিদের সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। এটি যারা ইতিহাস পড়ে বা নাড়াচাড়া করে, তাদের কথা নয়, এটি পাকিস্তানে জাস্টিস হামিদুর রাহমানের কমিশন রিপোর্টই বলে।

তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভবন অন্যত্র সরিয়ে নিলেও তাতে বিচার কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়বে না। খুব দুঃখ আমার, কষ্ট আমার যে ৪৫ বছর পরে সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার মুখ থেকে আমাদের এই কথা শুনতে হচ্ছে। তিনি আমাদের গৌরবের ইতিহাস ভুলে যাচ্ছেন। এটা বিচারের প্রভাব পড়ার প্রশ্ন নয়, এটা হলো আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক, স্বাধীনতাকামী মানুষের একটা উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। এই পুরনো হাইকোর্ট ভবন শুধু হাইকোর্ট ভবন নয়, এটা আমাদের ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকামী মানুষের গৌরবান্বিত প্রতিচ্ছবি। এর পেছনে আরো অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এই স্বাধীনতা অর্জনের বিপক্ষে যারা কাজ করেছে, যারা অন্যায় করেছে, তাদের বিচারের জন্য আমি কাজ করেছি এবং আমি জানি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আমার কাছে কী চেয়েছিলেন। আমি তখন জেনেভায় ছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে ফোন করলেন যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইনের প্রকৃতি কী হবে, আমাকে ডিরেকশন দিলেন এবং বললেন, বাংলাদেশে কাদের সঙ্গে আমাকে যোগাযোগ রাখতে হবে। আমি ড্রাফট পেয়েছি, আমি Justice Jackson-এর ডান হাত, বাঁ-হাত, Professor Otto Von Trifterer I Professor Jeschek-এর সঙ্গে বসেছি। পরবর্তী সময়ে ICJ (International Commission of Jurists) জেনেভার তদানীন্তন প্রধান এবং আয়ারল্যান্ডের ফরমার ফরেন মিনিস্টার Mr. Ian McDormatt, এই দুজনকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইনের খসড়া চূড়ান্ত করি। 

কেন এই আইনটি তৈরি করা হলো? কেন বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় এটা এলো? কারণ তিনি বিচার করতে চেয়েছিলেন দেশের এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, যারা জেনোসাইড করেছে, যারা নারীদের রেপ করেছে, যারা এই বাংলার মাটিকে পুড়িয়ে অপবিত্র করেছে, যারা এই বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপরে নির্বিচারে অত্যাচার চালিয়েছে, যারা Scorched earth পলিসির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি শ্মশান ভূমি তৈরি করতে চেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে এই বিচার। এবং সেই আইনটি যখন ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে আনল, তাদের সেই সিদ্ধান্তটি ছিল বাংলার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তটির দাবিদার নিঃসন্দেহে আমাদের জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর ছত্রচ্ছায়ায়  থেকে আমরা গুটিকয় ব্যক্তি চেষ্টা করেছি এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সফল হয়েছি। যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের সবারই বিচার করা হচ্ছে ও হবে।

আমাদের দুটি ট্রাইব্যুনাল একই ভবনে। জার্মানিতে ছিল ১৮টি ট্রাইব্যুনাল। তার মধ্যে ন্যুরেমবার্গ ছিল এক নম্বর, আর সারা জার্মানিতে ছিল বাকি ১৭টি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যে Allied Powers চেষ্টা করেছিল, আর যেন কখনো এ রকম মানবতাবিরোধী অপরাধ না হয়। এই বিচারের মাধ্যমে আমাদেরও সেই একই প্রচেষ্টা। আমরা যেন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি এবং আর যেন কেউ বাংলার মাটিতে এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ বা জেনোসাইড করতে না পারে।

আমি কী বলার চেষ্টা করছি আশা করি সবাই তা বুঝতে পারবেন। এই বর্তমান আদালত যে ভবনে আছে, তিনি সেটিকে তুলনা করেছেন ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের সঙ্গে। আমি চিন্তা করলাম যে আমাদের প্রধান আইনরক্ষক যিনি, তিনি শুধু আমাদের দেশের স্বার্থই রক্ষা করবেন না, তিনি দেশের ইতিহাসকেও রক্ষা করবেন না, কিন্তু সেই ইতিহাসকেও তিনি বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যাচ্ছেন। যে ছোট ভাইয়েরা এবং বোনেরা তাঁকে প্রশ্ন করেছিল তিনি তার উত্তর একটিও সঠিকভাবে দিতে পারেননি। এই যে হাইকোর্ট-ট্রাইব্যুনাল ভবন, এটা শুধু বিচারিক ভবন নয়, এটা একটা Iconic ভবন, যা আরো হাজার বছর একটা ঐতিহাসিক ভবন বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে, এখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হয়েছিল। এই ভবন হবে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের একটি সিম্বলিক আইকন। যখন বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হবে তখন এটি হবে একটি জাদুঘর। সেই জাদুঘরে এ দেশের সব মানুষ আসবে, তারা দেখবে, শুনবে, বুঝবে যে কিভাবে ১৯৭১ সালে, কিভাবে কারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল, কেন তাদের বিচার করা হয়েছিল এবং আমরা তাদের কিভাবে বিচার করেছি। সেই বিচারের প্রতিফলনের ওপর আজকের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে। তরুণ প্রজন্ম বুঝতে পারবে, কেন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হয়েছিল। তখন তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জেগে উঠবে, সেটিই আমাদের দেশকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

পৃথিবীতে যত জায়গায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছে, সেই সব ভবনকে পরবর্তী সময়ে জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে Palais DU Justice যেখানে ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল কাজ সম্পন্ন করেছিল, সেটিকে মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লোকজন আসছে এবং তারা দেখছে নািসরা কী করেছিল। একইভাবে সিয়েরা লিওন, যুগোস্লাভিয়া প্রভৃতি দেশে যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছিল, সেসব ভবন বা স্থাপনাকে পরে মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়েছে। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে তত দিন এই ভবন থাকবে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে। কাজেই বোঝার চেষ্টা করুন, ভবনটির মূল্য কী। ভালো করে ইতিহাস জানতে Gary Bass (Professor, Yale University), Nixson Kissinger, and Bangladesh Blood Telegram, Anthony mascarenhas, Lipshultz এদের বইগুলো পড়লে হয়তো কারো কোনো দ্বিধা থাকবে না।

লেখক : বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, জাতীয় নিরাপত্তা ও ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশন সেন্টারের চেয়ারম্যান। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহায়ক হিসেবেও কাজ করেন

মন্তব্য