kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

শুভ মাঘী পূর্ণিমার তাৎপর্য

ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আজ শুভ মাঘী পূর্ণিমা। বৌদ্ধদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনে তথাগত বুদ্ধ ভিক্ষু সংঘের উদ্দেশে, প্রাতিমোক্ষ উদ্দেশে ও বৈশালীর চাপাল চৈত্যে স্বীয় পরিনির্বাণ দিবস ঘোষণা করা হয়। তাই বিশ্বের বৌদ্ধরা এই দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে থাকে। বাংলাদেশের বৌদ্ধরাও তথাগত বুদ্ধের পরিনির্বাণ ঘোষণা দিবস হিসেবে বিভিন্ন বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকায় গুরুত্বসহকারে তা পালন করে। তথাগত বুদ্ধ ৪৫ বর্ষা অর্থা অন্তিম বর্ষা রাজগৃহের বেণুবনে অধিষ্ঠান করেছিলেন। সেই সময় তিনি বর্ষাব্রতের মধ্যে ভীষণভাবে রোগাক্রান্ত হন। তখন তাঁর বয়স ৮০ বছর। বেণুবনে বর্ষাব্রত পরিসমাপ্ত করে দেশভ্রমণে বহির্গত হয়ে ক্রমে বেণুবন বিহার হয়ে বৈশালীর চাপাল চৈত্যে উপনীত হলেন। প্রধান সেবক আনন্দকে বললেন, ‘হে আনন্দ! এই বৈশালীর উদয়ন চৈত্য, গৌতম চৈত্য, সপ্তআম্র চৈত্য, বহুপুত্রক চৈত্য, সারন্দন চৈত্য, চাপাল চৈত্য বড়ই মনোরম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। হে আনন্দ! চলো আমরা চাপাল চৈত্যে গিয়ে বিহার করি।’ তখন আনন্দসহ চাপাল চৈত্যে গমন করলেন। এ সময় তথাগত বুদ্ধ আনন্দকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আনন্দ! তথাগতগণ ইচ্ছা করলে স্বকীয় ঋদ্ধি বলে এক কল্পকাল বর্তমান দেহে অবস্থান করতে পারেন। হে আনন্দ! তথাগতের চার ঋদ্ধিপাদ ভাবিত, বহুলিকৃত, রথগতিসদৃশ, অনর্গল, অভ্যন্তর, বাস্তুভূমিসদৃশ, সুপ্রতিষ্ঠিত, পরিচিত ও সম্যক নিষ্পাদিত হয়েছে। সে জন্য তথাগত ইচ্ছা করলে কল্পকাল অবস্থান করতে পারেন।’ মারদ্বারা প্রলুব্ধ প্রধান সেবক আনন্দকে তথাগত বুদ্ধ সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া সত্ত্বেও এ কথার তাত্পর্য বুঝতে অসমর্থ হলেন। দ্বিতীয়, তৃতীয়বার ইঙ্গিত দিলেও আনন্দ মারদ্বার অধিকৃত হয়ে তথাগত বুদ্ধের ইঙ্গিতের তাত্পর্য উপলব্ধি করতে পারলেন না। অতঃপর তথাগত বুদ্ধ বৈশালীর চাপাল চৈত্যে গিয়ে শুভ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে স্মৃতিমান ও সম্প্রযুক্ত অবস্থায় স্বীয় আয়ুসংস্কার বর্জন করেন। ‘এখন থেকে তিন মাস পর শুভ মাঘী পূর্ণিমা পর্যন্ত আমার প্রাণবায়ু চলতে থাকুক, সজীব, সচেতন থাকুক, তত্পর নিরুদ্ধ হোক’—এরূপ সংকল্প করেন। অকস্মা অতি ভীষণ ভূমিকম্প আরম্ভ হলো। মুহুর্মুহু প্রলয়ঘোর দেবগর্জন শ্রুত হতে লাগল। এই আকস্মিক ভূমিকম্প ও বজ্রধ্বনিতে আনন্দের মনে ভীষণ ভয় ও বিস্ময়ের সঞ্চার হলো। তিনি তথাগত বুদ্ধের কাছে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তদুত্তরে তথাগত বুদ্ধ বললেন, ‘শোনো আনন্দ! বোধিসত্ত্ব যখন মাতৃকুক্ষি থেকে ভূমিষ্ঠ হন তখন তাঁর পুণ্যতেজে ভূমিকম্প হয়। যখন বোধিসত্ত্ব সম্যক সম্বোধি লাভ করেন তখন তাঁর জ্ঞানতেজে ভূমিকম্প হয়। যখন তথাগত বুদ্ধ ধর্মচক্র প্রবর্তন করেন তখন পৃথিবী সাধুবাদ প্রদানে ভূমিকম্প হয়। যখন তথাগত আয়ুসংস্কার পরিত্যাগ করেন তখন পৃথিবী কারুণ্যে কম্পিত হয়। আর যখন তথাগত পরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন তখন পৃথিবী রোদনধ্বনিতে কম্পিত হয়।’ অতঃপর বৈশালীর চাপাল চৈত্যে অবস্থানরত ভিক্ষু সংঘ ও বৈশালীবাসী শুভ মাঘী পূর্ণিমার জ্যোত্স্নাময়ী রাতে তথাগতের সমীপে সমবেত হলেন। তিনি ভিক্ষু সংঘের কাছে আপন আয়ুষ্কাল নির্ধারণপূর্বক পরিনির্বাণের দিন-তারিখ ঠিক করলেন, ‘এ মাঘী পূর্ণিমার তিন মাস পর শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে পরিনির্বাণ লাভ করবেন।’ তথাগত বুদ্ধের কাছে তাঁর স্বীয় আয়ুষ্কাল পরিত্যাগের বার্তা শুনে আনন্দ একান্ত শোকাকুল হয়ে কাতর কণ্ঠে প্রার্থনা করলেন, ‘প্রভু! জগতের কল্যাণে আরো কল্পকাল অবস্থান করুন।’ তখন দৃঢ়তার সঙ্গে আনন্দের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করে শোকবিহ্বল আনন্দকে সান্ত্বনা প্রদানে উপদেশ দিলেন। ‘হে আনন্দ! আমি তোমাকে পূর্বেই বলেছি আমরা প্রত্যেকেই সব প্রিয়বস্তু, সব মনঃপূত বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে, বিরূপ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। কোনো মতেই তার অন্যথা হবে না। তথাগতের যা জাত, ভূত, সংস্কৃত বিপরিণামশীল পঞ্চস্কন্ধ, তা নষ্ট হবে না, তা তো হতে পারে না। হে আনন্দ! তথাগত কর্তৃক যে অবশিষ্ট আয়ুষ্কাল পরিত্যক্ত হয়েছে, তিনি তিন মাস পর দেহত্যাগ করবেন বলে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তথাগত তা কোনোমতেই প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। অতঃপর তথাগত বুদ্ধ আনন্দকে সঙ্গে নিয়ে মহাবনে কুঠাগার শালায় গমন করলেন। তথা সমবেত ভিক্ষু সংঘকে তথাগত ৩৭ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্মের উপদেশ প্রদান করলেন। সংঘের উদ্দেশে এটা তথাগত বুদ্ধের অন্তিম দেশনা, যা বৌদ্ধধর্মের সারমর্ম এতে নিহিত রয়েছে। হে ভিক্ষুগণ! তোমাদের যে ধর্মসমূহ আমি অভিজ্ঞানে দেশনা করেছি, সে সমুদয় তোমরা উত্তমরূপে আয়ত্ত করে সুন্দররূপে আচরণ করো। সে বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করো, তৎসমুদয় সর্বত্র বিস্তার করো যেন এই ব্রহ্মচর্যমূলক ধর্ম স্থায়ী হয়। চিরদিন বিদ্যমান থাকে এবং বহুজনের হিত ও সুখ হয়। দেবমানবের হিত সুখ সম্পাদিত হয়। ভিক্ষুগণ তোমাদের প্রকাশ করছি যে বয়োধর্ম্মা সঙ্খরা অপ্পমাদেন সম্পাদেথ—‘সংস্কারসমূহ ক্ষয়শীল অপ্রমাদের সঙ্গে নির্বাণ সাধনায় ব্রতী হও।’

বুদ্ধের শিক্ষায় আমাদের জীবনকে সুন্দর ও ঋদ্ধ করতে পারি। মানুষ হিসেবে আমাদের বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, শুধু আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করাই নয়, অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনের প্রতি সবিশেষ মনোযোগ, স ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনীয়। সর্বজীবের প্রতি মানবিক কর্তব্য পালনের জন্য কারো নির্দেশের অপেক্ষায় থাকাটাও অনেক সময় অমানবিক। আমরা মানুষ হিসেবে মানুষের গরজে মঙ্গলকর কর্তব্য পালন করব এটা মা, মাটি  মানুষের ধর্ম, এটা জগ ও জীবের প্রকৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ধর্ম। আমরা স্মরণ করতে পারি, এ বিষয়ে তথাগত বলেছেন, ‘মা’ যেভাবে সব আপদ-বিপদ থেকে নিজের সন্তানকে অপার মৈত্রীবন্ধনে বুকে জড়িয়ে রাখেন, রক্ষা করেন, তোমরাও সেইরূপ মৈত্রীভাবে সব জীবের প্রতি পোষণ করিও। এটি বুদ্ধের শিক্ষার অন্যতম মৈত্রী চর্চা। বুদ্ধের উপদেশ হলো—

হীনং ধম্মং ন সেবেয্য পমাদেন ন সংবসে

মিচ্ছাদিটিঠং ন সেবেয্য ন সিয়া লোকবন্ধনো।

হীন ধর্মে রত বা প্রমত্ত হয়ো না। মিথ্যা দৃষ্টিসম্পন্ন কি সংসারবর্ধক হয়ো না। রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শের আকর্ষণে ইন্দ্রিয়ভোগ্য জগতে আবদ্ধ হয়ে থাকাই হীনধর্মে লিপ্ত হওয়া, সব কুশল কর্মে বিরুৎসাহ হলো প্রমাদের লক্ষণ। লক্ষ্য, পথ, কুশল, অকুশল সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার নাম হচ্ছে মিথ্যা দৃষ্টি। মিথ্যা দৃষ্টিই মানুষের তৃষ্ণাকে উদ্দীপ্ত করে, তাকে জন্ম-মৃত্যুর কঠিন শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। ওই শৃঙ্খলে বাধা পড়ে বারবার সংসারে আসাই হলো লোকবর্ধন। যারা মুক্তিকামী স্বত্বগণ সর্বদাই কুশল কর্মে রত থাকে।

লেখক : সম্পাদক, সৌগত

[email protected]



সাতদিনের সেরা