kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

উন্নয়ন ভাবনায় জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা

ড. এম শামসুল আলম

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



উন্নয়ন ভাবনায় জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা

গত ২৮ জুলাই শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে দেখা করে এবং দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার দাবি জানায়। মুখ্য সচিব ১৫ দিনের মধ্যে সরকারকে একটি প্রস্তাব দিতে বলেন এবং সংযোগের আশ্বাস দেন। অবশ্য প্রস্তাব পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই সংযোগ পাওয়া যায়।

দুই.

বিগত বিএনপি জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎসচিব আ ন হ আখতার হোসেন সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তখন বিদ্যুৎ বিভাগের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব এক নির্বাহী আদেশে মুখ্য সচিব ড. কামাল সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির হাতে আসে। তিনি মূলত বিদ্যুৎ খাত চালিয়েছেন। তাতে কোনো নীতি বা পরিকল্পনা প্রতিফলিত হয়নি। বিদ্যুৎ খাত পরিচালনার এ মডেল থেকে বিগত ও বর্তমান আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকার বেরিয়ে আসেনি। বরং সে মডেল অনুসরণেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন হচ্ছে। সেদিন সচিব আ ন হ আখতার হোসেন বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় যেমন ক্ষমতাবান ছিলেন, পরবর্তী সময়ে সচিব আবুল কালাম আজাদও তেমন ক্ষমতাবান হন। বিদ্যুৎ খাত তখনকার মুখ্য সচিব সরকারি আদেশের আওতায় যতখানি শাসন করেছেন, আদেশ ছাড়াই এখনকার মুখ্য সচিব ততোধিক শাসন করছেন। সে শাসনে রাষ্ট্রের দর্শন, নীতি ও আদর্শ নয়, মুখ্য সচিবের অভিপ্রায়ই প্রাধান্য পাচ্ছে। ওপরে বর্ণিত সংযোগ পাওয়ার ঘটনায় তাই মনে হয়।

তিন.

টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপি ছিল এক হাজার ৪৫ ডলার এবং প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে অব্যাহত। এবারের বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ শতাংশ। সে জন্য ১০ শতাংশ হিসেবে বিদ্যুতের প্রবাহ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে হবে। সে হিসেবে বিদ্যুৎ উত্পাদনে ব্যবহূত জ্বালানি মিশ্রণে জ্বালানি প্রাপ্র্যতার অনুপাতিক অংশ ও ব্যয়হার বিবেচনাক্রমে স্ব-স্ব জ্বালানির টেকসই প্রবৃদ্ধি নির্ধারিত হলে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। তদনুযায়ী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে সরকারি ও ব্যক্তি খাত বিনিয়োগ নিশ্চিত এবং উভয় বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হলে চাহিদামাফিক ন্যায্য মূল্য হারে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হতে পারে। সেই সরবরাহকৃত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বণ্টন ও বিতরণে সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। ফলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে এবং কিছুটা বিলম্ব হলেও নিম্ন-মধ্যম থেকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হতে পারব। এখন খতিয়ে দেখা দরকার, রাষ্ট্রের জ্বালানি খাত উন্নয়ন দর্শন ও কৌশল এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে যা কিছু হচ্ছে, তা যৌক্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। প্রবাসীদের আয় ও পোশাক রপ্তানি খাতের আয় বাদে শিল্প খাতের রপ্তানি আয় জিডিপির জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ না হওয়ায় পোশাক খাতের মতো ইস্পাত, সিমেন্ট ও কাফকোর রপ্তানীকৃত সার উত্পাদনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বর্ণিত সংযোগ-সিদ্ধান্তে এ বিবেচনা অনুপস্থিত। তাতে যেমন গ্যাস বণ্টন ও বিতরণে সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়নি, তেমন সরবরাহের সঙ্গে চাহিদার ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তায় ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধি অর্জনেও ঝুঁকি বেড়েছে।

চার.

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকার প্রতিবছর ৯ আগস্ট ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ দিবস পালন করে। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস পালন ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন নীতি ও কৌশল পরস্পরবিরোধী। ১৯৭৫ সালের এই দিনে তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের গ্যাসফিল্ডগুলো বিদেশি তেল-গ্যাস কম্পানির ব্যক্তিমালিকানা থেকে সরকারি মালিকানায় আনা হয় এবং এ খাত উন্নয়নে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় বিশ্বের বহু দেশে প্রমাণিত হয় যে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদের ওপর জাতীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করা অপরিহার্য। ফলে ইরাক, লিবিয়া, ভারত, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশই তখন তাদের তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ জাতীয় মালিকানায় নিয়ে আসে। আমাদের পেট্রোবাংলার মতোই মালয়েশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ’পেট্রোনাস’। সঠিক উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করায় পেট্রোনাস এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান। অথচ ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে পেট্রোবাংলা আজ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় হুমকিস্বরূপ।

পাঁচ.

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ওপর জাতীয় মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে জ্বালানি খাতকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী করার জন্য পেট্রোলিয়াম আইন ১৯৭৪ প্রণীত হয়। সেই আইনে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পেট্রোবংলার জন্ম এবং তার আওতাধীন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্পাদনে বাপেক্স, শুধু উত্পাদনে সিলেট গ্যাসফিল্ড কম্পানি ও বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড কম্পানিসহ গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কম্পানিগুলো পর‌্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয়। কয়লা খাত উন্নয়নেও অনুরূপ কম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপিসির আওতায় তরল জ্বালানি পরিশোধন ও সরবরাহে বিভিন্ন কম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্বালানি খাতের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পেট্রোবাংলাকে ডিভিশনের মর‌্যাদা দিয়ে জ্বালানি বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয় এবং তার চেয়ারম্যান পদে সচিবের মর‌্যাদায় জ্বালানি খাতের পেশাদার অভিজ্ঞ ও দক্ষ বিশেষজ্ঞ ড. হাবিবুর রহমানকে আনা হয়। জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এভাবেই একদিকে জ্বালানি সম্পদকে ব্যক্তিমালিকানা থেকে জাতীয় মালিকানায় আনা হয়, অন্যদিকে জ্বালানি খাতের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণে পেট্রোবাংলাকে ডিভিশনের মর‌্যাদা দিয়ে প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা দেওয়া হয়। ফলে জ্বালানি খাতের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় পেট্রোবাংলা গড়ে উঠে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সুতরাং ৯ আগস্ট জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসের গুরুত্ব এখানেই এবং এভাবেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জ্বালানি বিভাগ তা মনে করে না। অথচ প্রতিবছর তারা ৯ আগস্ট জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস হিসেবে এ দিবস উদ্যাপন করে। জাতীয় জীবনে এ এক নিষ্ঠুর প্রহসন। আবার পিও (রাষ্ট্রপতির আদেশ) ৯-এর আওতায় বিদ্যুৎ খাতের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিডিবির জন্ম ও তার অধীনে সরকারি মালিকানায় বিদ্যুৎ উত্পাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও বিপণন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বিদেশি বিনিয়োগে আইওসির মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন গুরুত্ব পাচ্ছে এবং সঞ্চালন ও বিতরণে ব্যক্তি খাত বিনিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব কম্পানির শেয়ারও বিক্রি করা হচ্ছে। তদুপরি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণী পর‌্যায়ে সরকার তথা মন্ত্রণালয়কে নীতিনির্ধারক হিসেবে সীমাবদ্ধ রেখে বিইআরসি আইন ২০০৩ মতে, ইউটিলিটি পর‌্যায়ে রেগুলেটর হিসেবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রেগুলেটর বিইআরসি প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাধীন ও সার্বভৌম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠার জন্য এ খাতের ওই সব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়। কিন্তু এ উন্নয়ন প্রবৃদ্ধি অর্জনে উপযোগী হতে পারেনি।

ছয়.

গত ২৫ আগস্ট জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বিদ্যুৎ খাতের ইউটিলিটি পর‌্যায়ের সব সরকারি মালিকানাধীন সংস্থা বা কম্পানির পরিচালনা বোর্ডে জ্যেষ্ঠ সিভিল সার্ভেন্টদের সংখ্যায় মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। খবরে দেখা যায়, সরকারি মালিকানাধীন দুটি বিদ্যুৎ উত্পাদন কম্পানির পরিচালনা বোর্ড চেয়ারম্যান বিদ্যুৎসচিব। প্রতি বোর্ডে সদস্য হিসেবে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন তাঁর সহকর্মী পাঁচজন সিভিল সার্ভেন্ট। বিদ্যুৎ সঞ্চালন কম্পানি পিজিসিবির বোর্ড চেয়ারম্যান মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, তাঁর সঙ্গে সদস্য আছেন বিদ্যুৎসচিবসহ তিনজন সিভিল সার্ভেন্ট। বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানি ডেসকোর চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহম্মেদ কাইকাউস, তাঁর সঙ্গে সদস্য রয়েছেন পাঁচজন সিভিল সার্ভেন্ট। ডিপিডিসির বোর্ড চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব তাপস কুমার রায়, তাঁর সঙ্গে সদস্য রয়েছেন পাঁচজন সিভিল সার্ভেন্ট। এভাবে বিদ্যুৎ খাতের মতো গ্যাস, কয়লা, জ্বালানি তেল খাতগুলোর সরকারি মালিকানাধীন কম্পানির পরিচালনা বোর্ড জ্বালানি বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে সংখ্যাধিক্য সিভিল সার্ভেন্ট সদস্য নিয়ে চলছে। সেসব বোর্ডে শিক্ষাবিদ, আইনবিদ ও ব্যবসায়ীর উপস্থিতি নামে মাত্র। বিদ্যুৎ বা জ্বালানি প্রকৌশলীর মতো পেশাদার ব্যক্তিদের উপস্থিতি গৌণ। সরকার তার মালিকানাধীন এসব কম্পানির পরিচালনা করাতে চায় তার লোক দিয়ে। সরকার তার লোক বলতে বোঝে চাকরিরত সিভিল সার্ভেন্টদের। অথচ এ খাত দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না, দুর্নীতিমুক্তও হয় না ওই সব ব্যক্তি এসব কম্পানির পরিচলানায় থাকার কারণে। অভিজ্ঞ, যোগ্য ও সৎ পেশাদার ব্যক্তিদের হাতে সে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে না। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার দুর্নীতি কমিয়ে আনবে, তা অসম্ভব।

সাত.

যেকোনো খাতে সুশাসন বজায় থাকলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। তার কর্মকাণ্ড দুর্নীতিমুক্ত হতে পারে এবং তা দক্ষতা ও সক্ষমতা স্বল্পতার শিকার হয় না। নীতি ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সে খাত উন্নয়নে গৃহীত পরিকল্পনা ও কৌশল জনস্বার্থসম্মত হয়। অসমতা বা বৈষম্যের শিকার হয় না। ফলে স্বল্প সময়ে, স্বল্প খরচে মানসম্মত উন্নয়ন ফল জনগণ পায় এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুশাসন নেই। ভয়াবহ অস্বচ্ছতা বিরাজ করছে। এ খাতে আপস্ট্রিম থেকে ডাউনস্ট্রিম অবধি সব পর‌্যায় দুর্নীতিগ্রস্ত। অনুসন্ধান, উত্পাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ খাত পরিচালনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা ও অক্ষমতার শিকার বিধায় তা সমন্বয়হীন এবং ক্ষেত্রবিশেষে সামঞ্জস্যহীন। ফলে পারসপেক্টিভ পরিকল্পনা, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো, মহাপরিকল্পনা—এসবের সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রম সামঞ্জস্যহীন। তাই গৃহীত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন কার্যক্রম অপরিকল্পিত ও অ্যাডহকভিত্তিক বলে গণ্য করা হয়। ফলে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। উন্নয়ন টেকসই হওয়ার ব্যাপারে সংশয় বাড়ছে।

আট.

প্রতিবছর ৯ আগস্ট কেবল জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস পালন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আজকের সরকার ’৭৫-এর আগের সরকারের নীতি ও আদর্শ অবলম্বনে জ্বালানি খাত উন্নয়নে যদি মনোযোগী হতো, তাহলে জনগণ দেখত—১. বাপেক্স গুণে-মানে আইওসি ও বিডিংয়ে অন্যান্য আইওসির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আছে। দেশ-বিদেশে, জলে-স্থলে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্পাদনে রয়েছে। ২. তেল, গ্যাস, কয়লা ও বিদ্যুৎ উত্পাদন, সঞ্চালন ও বিতরণকারী সংস্থা বা কম্পানির নানা পদে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পরিবর্তে অভিজ্ঞ ও যোগ্য পেশাদার ব্যক্তি রয়েছে। তাঁরা মন্ত্রণালয়ের কাছে দায়বদ্ধ। ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দুর্নীতিমুক্ত। ৩. বিইআরসির বিরুদ্ধে জ্বালানি উপদেষ্টা ও মুখ্য সচিবের কথায় চলার অভিযোগ আর নেই। ৪. আপস্ট্রিম থেকে ডাউনস্ট্রিম অবধি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব কার্যক্রম বিইআরসির রেগুলেটরি ক্ষমতার আওতাধীন রয়েছে। ৫. পাবলিক-প্রাইভেট উভয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য নিরসন করে বিইআরসি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান করেছে। ৬. তেল-বিদ্যুৎ উত্পাদনে দরপতন, শুল্ক-ভ্যাটমুক্ত ও সার্ভিস চার্জ সুবিধা ব্যক্তি খাতের মতো সরকারি খাতেও বিইআরসি নিশ্চিত করেছে। ৭. বিশ্ববাজারে জ্বালানির দর কমার কারণে বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম বিইআরসি না বাড়িয়ে কমিয়েছে। ৮. বিদ্যুৎ সংকট না থাকায় রেন্টাল-কুইক রেন্টাল প্লান্ট আইপিপি না হয়ে ফেজ-আউট হয়েছে। ৯. উত্পাদন ব্যয় কম হওয়ায় ২০১৫ সাল থেকে বিদ্যুতের দাম কমিয়ে বিইআরসি সরকারের বিদ্যুতের দাম কমানোর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছে। এ সব কিছুই আজ জনগণের কাছে দিবালোকের মতো দৃশ্যমান হতো এবং কৃষি খাত উন্নয়নে সরকার যেমন সফল হয়েছে, তেমন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নেও সরকার সফল হতো, যদি ব্যক্তিবিশেষ সরকারকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ না পেত। 

 

লেখক : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা