kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

পবিত্র কোরআনের আলো

আপনজন বাদে অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করা যাবে না

   

৯ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আপনজন বাদে অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করা যাবে না

১১৮. হে ইমানদারগণ! তোমরা তোমাদের আপনজন ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না; তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোনো ত্রুটি করে না- তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাসুলভ বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশি জঘন্য। তোমাদের জন্য নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেওয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও।

- সুরা আলে ইমরান

তাফসির : মদিনার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী ইহুদিদের সঙ্গে আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে প্রাচীনকাল থেকেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ব্যক্তিগত ও গোত্রগত- উভয় পর্যায়েই তারা একে অন্যের প্রতিবেশী ও মিত্র ছিল। আউস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় মুসলমান হওয়ার পরও ইহুদিদের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক বহাল রাখে এবং তাদের লোকরা ইহুদি বন্ধুদের সঙ্গে ভালোবাসা ও আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার অব্যাহত রাখে। কিন্তু ইহুদিদের মনে ছিল মহানবী (সা.) ও তাঁর দ্বীনের প্রতি শত্রুতা। তাই তারা এমন কোনো ব্যক্তিকে আন্তরিকতার সঙ্গে ভালোবাসতে সম্মত ছিল না যে এ ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়। কাজেই তারা আউস ও খাজরাজ গোত্রের আনসারদের সঙ্গে বাহ্যত পূর্ব সম্পর্ক বহাল রাখলেও এ সময় মনে মনে তাদের শত্রু হয়ে গিয়েছিল। বাহ্যিক বন্ধুত্বের আড়ালে তারা মুসলমানদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিসংবাদ সৃষ্টির চেষ্টায় ব্যাপৃত থাকতে এবং তাদের দলগত গোপন তথ্য শত্রুদের কাছে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করত। আলোচ্য আয়াত নাজিল করে আল্লাহ্ তায়ালা আহলে-কিতাবের এমন দুরভিসন্ধি থেকে মুসলমানদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহপাক ঘোষণা করেন, 'হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ মিত্ররূপে গ্রহণ করো না।' এখানে আয়াতে 'বিতোনা' শব্দ প্রয়োগে এ বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। শব্দটির অর্থ অভিভাবক, বন্ধু, বিশ্বস্ত, রহস্যবিদ। প্রসিদ্ধ অভিধানগ্রন্থ 'লিসানুল-আরাব'-এ লিখিত আছে- 'কোনো ব্যক্তির অভিভাবক, বিশ্বস্ত বন্ধু এবং যার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করা হয়, এরূপ ব্যক্তিকে তার 'বিতোনা' বলা হয়।

অতএব, আলোচ্য আয়াতে মুসলমানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, স্বধর্মাবলম্বীদের ছাড়া অন্য কাউকে এমন মুরব্বি ও উপদেষ্টারূপে গ্রহণ করো না, যার কাছে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশ করা যেতে না পারে।

ইসলাম বিশ্বব্যাপী স্বীয় করুণার ছায়াতলে মুসলিমগণকে অমুসলিমদের সঙ্গে সহানুভূতি, শুভেচ্ছা, মানবতা ও উদারতার নির্দেশ দিয়েছে। এটা শুধু মৌখিক নির্দেশই নয়; বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণ একে কার্যে পরিণত করেও দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মুসলমানদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কার্যাবলি সংরক্ষণের স্বার্থে ইসলাম এ নির্দেশও দিয়েছে যে, ইসলামী আইনে অবিশ্বাসী ও বিদ্রোহীদের সঙ্গে সম্পর্ক একটি বিশেষ সীমার বাইরে এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি মুসলমানদের দেওয়া যায় না। কারণ এতে ব্যক্তি ও জাতি- উভয়েরই সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি যুক্তিপূর্ণ, সংগত ও জরুরি ব্যবস্থা। এতে ব্যক্তি ও জাতি- উভয়েরই হিফাজত হয়। যেসব অমুসলিম মুসলিম রাষ্ট্রের বাসিন্দা কিংবা মুসলমানদের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ, তাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জোরদার নির্দেশাবলি ইসলামী আইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো জিম্মি অর্থাৎ মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম বাসিন্দাকে কষ্ট দেয়, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হব। আর আমি যে মোকদ্দমায় বাদী হব, তাতে জয়লাভ অবধারিত।

অন্য এক হাদিসে প্রিয় নবী বলেন, 'সাবধান! যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের প্রতি অত্যাচার করে কিংবা তার প্রাপ্য হ্রাস করে কিংবা তার ওপর সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয় অথবা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার কাছ থেকে কোনো জিনিস গ্রহণ করে, তবে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষ থেকে উকিল হব।

কিন্তু এসব উদারতার সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের নিজস্ব জামাত ও জাতিসত্তার হিফাজতের স্বার্থে এ নির্দেশও দেওয়া হয়েছে যে 'ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুদের অন্তরঙ্গ বন্ধু কিংবা বিশ্বস্ত মুরব্বিরূপে গ্রহণ করো না।'

তাফসিরে মা'আরেফুল কোরআন অবলম্বনে

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা