kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

তরুণ প্রজন্ম এখন নেতৃত্ব নিতে সক্ষম

আহমেদ নূর   

২৪ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



তরুণ প্রজন্ম এখন নেতৃত্ব নিতে সক্ষম

আশাবাদী মানুষ তিনি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সমস্যার মধ্যেও সম্ভাবনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রাণনাশের অব্যাহত হুমকিতেও তিনি অবিচল। যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করতে গিয়ে সেখানে দুটো খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন। ডলার সাম্রাজ্যের প্রাচুর্য ও সম্ভাবনার হাতছানি উপেক্ষা করেই ১৯৯৪ সালে দেশে ফিরে এসে যোগ দেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে। বর্তমানে তিনি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবাল সম্প্রতি কালের কণ্ঠের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ নূর

কালের কণ্ঠ : আপনার দেশে ফেরা ও ঢাকায় না থেকে সিলেটে চলে আসা প্রসঙ্গে যদি কিছু বলতেন।

জাফর ইকবাল : যুক্তরাষ্ট্রে আমি গিয়েছিলাম পিএইচডি করতে। তারপর দেশে ফিরে আসার আগে ভাবছিলাম হাতে কিছু টাকা জমলে ভালো। সে জন্য হয়তো কিছুদিন কাজ করেছিলাম বেল কমিউনিকেশন রিসার্চে। শেষ পর্যন্ত দেখলাম যে আমেরিকা এমন একটা দেশ, যেখানে কারো কাছে টাকা জমে না। ওরা টাকা দেয় ঠিকই, আবার খরচ করিয়েও নেয়। তা ছাড়া বাচ্চারাও বড় হয়ে যাচ্ছিল। সে জন্যই দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। আর ঢাকায় থাকার কথা যদি বলেন তাহলে আমি বলব, আমার কাছে মনে হয় না, ঢাকা থাকার জন্য খুব ভালো জায়গা। আমি কখনোই এটা মনে করিনি। ঢাকায় বড় বড় ইউনিভার্সিটি আছে। ওগুলো ওয়েল স্টাবলিস্ট। সেখানে আমি কাজ করার খুব একটা সুযোগ যে পাব, তা তো না। এই ইউনিভার্সিটি নতুন ছিল, তখন এখানে যাঁরা ছিলেন, আমি যেগুলো করার চেষ্টা করেছি তাঁরা সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেওয়া একটা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল বলে আমি মনে করি।

কালের কণ্ঠ : শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুর দিকটা কেমন ছিল?

জাফর ইকবাল : দেখুন, আমি তো আমার নিজের দেশে ফেরত এসেছি; কিন্তু আমার সন্তানদের বেলায় তো সেটি ছিল না। কারণ তাদের জন্ম হয়েছে আমেরিকায়। সেখানে তারা বড়ও হয়েছে। তাই ওদের জন্য এটা একটা পরিবর্তন ছিল, তাদের কষ্টই হয়েছে আসলে। তা ছাড়া তখন সিলেটে কোনো ভালো স্কুলও ছিল না। তাদের লেখাপড়া নিয়ে অনেক সমস্যা হয়েছে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণের আন্দোলনের সময় যখন আমার বাচ্চাদের হুমকি দেওয়া হয়, তখন আমি তাদের ঢাকায় রেখে আসি। দীর্ঘদিন তারা ঢাকায় ছিল এবং আমি ও আমার স্ত্রী সিলেটে থাকতাম। কাজেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে মোটামুটিভাবে তারা একা একাই বড় হয়েছে সিলেটের মৌলবাদী সম্প্রদায়ের অত্যাচারের কারণে। আমার সন্তানরা আমাদের জন্য অনেক সেক্রিফাইস করেছে। এখন দুজনেই পড়ালেখা শেষ করেছে। আমার ছেলে পিএইচডি শেষ করেছে, মেয়েও পিএইচডি শুরু করেছে।

কালের কণ্ঠ : আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা জানতে চাই।

জাফর ইকবাল : গত সরকারের আমলে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির (২০১০ সাল) একজন সদস্য হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সে সময় পাঠ্যবইগুলোর যে ঘাটতি ছিল, তা সংশোধন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস এখন পাঠ্যবইয়ের ভেতরে আছে। আমাদের দেশে প্রায় তিন কোটি ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে। কাজেই এই ছেলেমেয়েগুলো অন্তত গত পাঁচ বছরে সঠিক ইতিহাস পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এটা তাদের মাথায় গেঁথে গেছে। তারা যখন বড় হবে, যখন কাজ করতে যাবে, তাঁদের আর 'কনফিউজ' করা যাবে না। কারণ তারা জানে। কাজেই আমার মনে হয়, বাংলাদেশের ভিত্তিটা যে মুক্তিযুদ্ধ, সে ধারণা মোটামুটিভাবে তৈরি হয়ে গেছে। এ ছাড়া এখন পড়াশোনার পদ্ধতিও পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে মুখস্থ করে পড়তে হতো। এখন সৃজনশীল পড়ালেখা হচ্ছে, ছেলেমেয়েদের আর মুখস্থ করতে হয় না। যেহেতু তারা সৃজনশীল চিন্তা করে, সেহেতু তাদের ব্রেনের গ্রহণ ক্ষমতাও অনেক ভালো। আমরা তাদের ব্রেন অক্ষত রাখতে পারছি। ওরা যে সময় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ঢুকবে, তখন আমরা নতুন এক ধরনের স্টুডেন্ট পাব, যারা নাকি মুখস্থ না করে বড় হয়েছে, লেখাপড়া করেছে সৃজনশীলভাবে। কাজেই আমরা খুব সৌভাগ্যবান যে গত পাঁচ বছরে আমাদের শিক্ষা খাতে খুব বড় কাজ হয়েছে।

আর শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যার কথা যদি বলেন, তাহলে যেটা বলতেই হয় সেটা হচ্ছে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে জিডিপির মাত্র ২.২ শতাংশ বরাদ্দ শিক্ষা খাতে দেওয়া হয়। এই টাকাটা যদি বাড়িয়ে ভারতের মতো ৪ শতাংশ করা হতো (যদিও ৬ শতাংশ করার কথা বলা হচ্ছে) তাহলে আমার ধারণা, একদম দেখতে দেখতে দেশের চেহারা পাল্টে যেত। আমি এটা বুঝি না, সরকারের প্রাইওরিটিস বা অগ্রাধিকার কোথায়? তারা একটা পদ্মা সেতু করার জন্য জানটা দিয়ে দেয়। আর হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি করে নিয়ে যায় লোকজন। রাস্তাঘাটে প্রচুর টাকা-পয়সা খরচ করা হয়। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত খরচ করা হয় না। শিক্ষা বিলাসিতা (লাক্সারি) নয়, প্রয়োজন (অ্যাসেনসিয়াল)- এটা আমাদের বুঝতে হবে। শিক্ষায় যদি আরো টাকা খরচ করত তাহলে আমার আর কোনো চিন্তা ছিল না।

কালের কণ্ঠ : দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

জাফর ইকবাল : বাংলাদেশের অর্থনীতিটা এখন চালাচ্ছে গরিব মানুষরা। গার্মেন্টের মেয়েরা চালাচ্ছে, আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা চালাচ্ছে আর চাষিরা চালাচ্ছে। এখনো আমাদের দেশে যে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা আছে, তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য নয়। কাজেই এটা হচ্ছে আমাদের পরবর্তী ধাপ। যখন শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করবে, তখন আমি মনে করব যে আমাদের বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে দাঁড়িয়ে গেছে। এখনো করছে, তবে ওই তিনটার তুলনায় তাদের অবদান কম। কাজেই আমরা অর্থনীতিতে সেই শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহণের অপেক্ষা করছি।

কালের কণ্ঠ : আপনার স্বপ্নের কথা যদি বলেন...

জাফর ইকবাল : স্বপ্ন বলতে কি, আমি যেটা আবিষ্কার করেছি সেটা হচ্ছে, আমাদের দেশে ছোট বাচ্চারা বা ইয়াং জেনারেশন যারা, তাদের বেশি কিছু দিতে হয় না। শুধু একটু আগ্রহ, একটু উৎসাহ দিলে তারা খুবই খুশি হয়ে যায়। তারা তখন অনেক কিছু করে সেখান থেকে। আমাদের দেশের কিশোর-তরুণরা অত্যন্ত সৃজনশীল। আমি গণিত অলিম্পিয়াডের ব্যাপারটা বলতে পারি। এটা খুবই সফল একটা প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামটা আমরা শুরু করেছিলাম, আমি ও প্রফেসর কায়কোবাদ মিলে। কিন্তু তারপর যখন 'ইয়াং জেনারেশন' যোগ দিয়েছে, বিশেষ করে মুনীর হাসানের কথা বলতে হয় আমাকে, তখন এটা অন্য 'ডাইমেনশন' পেয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের গণিত অলিম্পিয়াড শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু হয়েছিল। আমাদের সব কিছুই আসলে আমরা শাহজালাল থেকেই শুরু করি। এখন বাচ্চাদের জন্য তো ফিজিক্স অলিম্পিয়াড হয়, সায়েন্স অলিম্পিয়াড হয়। আমরা চেজ অলিম্পিয়াড করেছি, যদিও টাকার জন্য প্রতিবছর করতে পারছি না। এ ছাড়া অ্যাস্ট্রোনমি অলিম্পিয়াড ও চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে। কাজেই অনেক ধরনের কাজ হচ্ছে এবং অনেক ধরনের কাজের সঙ্গে আমি যুক্ত। তরুণ প্রজন্মের এই এগিয়ে যাওয়াই আমার স্বপ্ন বলতে পারেন।

কালের কণ্ঠ : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দেশের প্রথম ওয়াই-ফাই ক্যাম্পাস গড়ে তোলা, মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু, এমনকি দেশের আকাশে প্রথমবারের মতো ড্রোন উড্ডয়ন- এত সাফল্য কিভাবে দেখছেন?

জাফর ইকবাল : দেখুন, আমাদের এখানে অনেক কাজ হয়েছে, এ জন্য সব সময় আমাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। সেটা আসলে পুরোপুরি সঠিক নয়। অনেক কাজ করতে পেরেছি। কারণ আমার সঙ্গে আমার সহকর্মীরা ছিলেন, তরুণ শিক্ষকরা ছিলেন। তাঁরা আমাকে সব সময় সাহায্য করেছেন। টেকনোলজির বিভিন্ন বিষয়ে আমি হয়তো সাহস করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কিন্তু কাজ করেছেন তাঁরা। তা ছাড়া অধ্যাপক হাবিবুর রহমান যখন উপাচার্য ছিলেন, তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত বাজেটের মধ্যেও আমি তাঁর কাছে যখন যা চেয়েছি, তিনি আমাকে তা দিয়েছেন। তিনি আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন। এ ছাড়া সবার কাছ থেকেই সব সময় সাহায্য পেয়ে এসেছি। ফলে অনেক কিছু করতে পেরেছি। এখন যিনি উপাচার্য, তিনি সেভাবে সাহায্য করেন না। আমাদের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাটা তিনি বন্ধ করে দিলেন। হেরে গেলাম।

কালের কণ্ঠ : আর ড্রোন বানানোর কথা...

জাফর ইকবাল : ড্রোন করেছে তো এই বাচ্চা ছেলেপেলেরা। ওরাই তো। আসলেই তাই। ইউনিভার্সিটিতে কাজ করার আমার আনন্দ তো একটাই। সেটা হচ্ছে আমি ইয়াং মাইন্ডদের সঙ্গে কাজ করতে পারছি। তরুণদের তো আমরা কিছু দিতে পারি না। পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে কোনো বাজেট নেই। আমাদের রিসার্চের কোনো টাকা-পয়সা নেই। তাদের আমি কেবল একটু উৎসাহ দিতে পারি। বাস্তবে আমি শুধু তাদের উৎসাহ দিই আর তারা কাজ করে। এই যে ড্রোন যেটা তৈরি করেছে, প্রথমে আমি যখন তাদের বললাম, চলো আমরা ড্রোন বানাই। তারা কেউ ড্রোন জানে না। ওরা পড়াশোনা করে শুরু করল সেখান থেকে। কিন্তু হঠাৎ করে দেখি পত্রিকায় চলে আসছে। কিভাবে আসছে আমি জানি না। আমি কোনো পত্রিকাকে কিছু বলিনি। কিন্তু যখন পত্রিকায় চলে আসছে, আর কিছু বানাইনি, সেটা তো ভালো দেখায় না। যাই হোক ইন্টারেস্টিং হচ্ছে, ড্রোনটা যখন আকাশে উড়েছে তখন অনেক লোক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বলেছে, আমরা আপনাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে চাই। আমি তাদের বলেছি, ঠিক আছে, যখন লাগবে আমি নেব। এর ভেতর একজন 'আমার যখন লাগবে'র প্রতি অপেক্ষা না করে চেক পাঠিয়ে দিয়েছেন আমাকে, কাজ করার জন্য। সুতরাং আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মোটামুটিভাবে এটাকে আমরা একটা জায়গায় নিয়ে যাব প্ল্যান করেছি। শুধু তাই নয়, সেনাবাহিনী থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমি খুব খুশি হয়েছি, তারা আমাদের ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। উৎসাহ দিয়েছে, আগ্রহ দেখিয়েছে। ড্রোনের ওপর আরো অনেক কাজ হবে আমাদের এখানে। তা ছাড়া গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক কাজ হচ্ছে। শুধু আমার ডিপার্টমেন্ট নয়, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টও খুব সুন্দর ল্যাব তৈরি করেছে, অসাধারণ। সেখানে তারা খুব ভালো একটা গ্রুপ তৈরি করেছে। নন লিনিয়ান অপটিকের ওপর কাজ করছে। আমাদের তো আছেই। আমাদের ছেলেপিলে আছে, তারা রোবট বানাচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : তরুণ প্রজন্ম সম্পর্কে আপনার ভাবনার কথা যদি বলেন। কিংবা কোনো পরামর্শ...

জাফর ইকবাল : ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর, একটা কালো অধ্যায় গেছে আমাদের দেশে। সেই সময়টাতে সেনাবাহিনী দেশটাকে শাসন করেছে এবং তারা দেশটাকে ঘুরিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে আদর্শ নিয়ে হয়েছিল, যে স্বপ্ন নিয়ে হয়েছিল, সেখান থেকে তারা সম্পূর্ণভাবে ঘুরিয়ে 'অ্যাবসোলেটলি' ১৮০ ডিগ্রিতে টার্ন করিয়ে নিয়েছিল। পরবর্তীকালে অনেক আন্দোলন, ত্যাগ-তিতিক্ষার পর যখন নাকি আবার গণতন্ত্র চলে আসছে তখন থেকে আবার বাংলাদেশকে ঠিক 'ডিরেকশনে' নেওয়ার একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কাজেই এখানে এসে আমি দেখেছিলাম, বাংলাদেশে একটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ঠিক ভালোভাবে জানে না। অনেক কিছুতে তারা বিভ্রান্ত। তারপর 'কনসাসলি' আমরা অনেক কিছু করেছি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুরু করেছি। মানুষকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানানোর জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর ছোট্ট একটা বই করেছিলাম। আমার মনে হয়, বাংলাদেশে সেটা লাখ লাখ কপি প্রচারিত হয়েছে। পড়ছে মানুষজন। কাজেই সচেতনভাবে আমরা চেষ্টা করেছি। আমি একা না, আমার সঙ্গে অনেক মানুষ ছিলেন, অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কাজেই যখন নাকি গণজাগরণ মঞ্চ হলো তখন আমরা প্রথম টের পেলাম, আসলে আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম আছে, যারা মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসে ও ধারণ করে। সেই ঘটনা ঘটার পর থেকে আমি এখন অনেক 'রিলাক্সড'। কারণ আমি জানি, যেটা আমার সন্দেহ ছিল হয়তো নতুন জেনারেশন আমাদের মতো এত তীব্রভাবে মুক্তিযুদ্ধটাকে অনুভব করতে পারে না। কিন্তু আমি দেখেছি যে তারা আমাদের থেকেও তীব্রভাবে অনেক জায়গায় অনুভব করতে পারে। তারা যেহেতু ইয়াং, তারা লিডারশিপ নিতে পারে, তারা দায়িত্ব নিতে পারে। কাজেই এখন আর বাংলাদেশ নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কারণ আমি জানি যে আমাদের নতুন জেনারেশন মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেছে।

কালের কণ্ঠ : আমাদের অনেক মেধাবী তো বিদেশেই থেকে যাচ্ছেন। এ নিয়ে আপনি অনেক লেখালেখি করেছেন, যেন তাঁদের দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে কাজটি কি আসলে হচ্ছে?

জাফর ইকবাল : আসলে এ ব্যাপারে কাজ হচ্ছে কি না আমি জানি না। তবে জিনিসটা খুবই সোজা। আমি যেমন বিদেশে যাওয়ার পরও আমার মনটা পড়েছিল দেশে, এটা সবার ক্ষেত্রেই সত্যি। একদম ওখানে যদি জন্ম হয় কিংবা খুব ছোটবেলা যদি যায়, তাহলে ওই দেশের কালচারের সঙ্গে খুব সুন্দরভাবে 'অ্যাডজাস্ট' করে নেয়। কিন্তু নরমালি একটু বড় হয়ে, ইউনিভার্সিটি পাসটাস করে যদি কেউ পিএইচডি করতে যায়, ওই বয়সে তখন মনটা দেশেই পড়ে থাকে। আমি যতজনের সঙ্গে কথা বলেছি, সবাই বলেছে, স্যার, আমি দেশে ফেরত আসব। আলটিমেটলি হয়তো তারা দেশে আসতে পারে না। কারণ তারপর ওরা বিয়ে করে, ছেলেমেয়ে হয়। ছেলেমেয়েদের স্কুলে দেয়, ব্যস। যখনই ছেলেমেয়েদের স্কুলে দেয়, তখন চিন্তা করে আমি যে ওদের দেশে নিয়ে যাব, কোথায় ওদের পড়াব? ভালো স্কুল কি আছে? এদের ভবিষ্যৎ কী হবে? কাজেই আমরা যদি আমাদের দেশে ভালো স্কুল তৈরি করতে পারতাম। এখনো কিন্তু সেভাবে ভালো স্কুল নেই। একজন ছেলে বা মেয়ে যার বয়স এখন ৩০-৩৫ হয়েছে, যার নাকি ছেলেমেয়েরা একটু বড় হয়েছে ও খুব একটা দায়িত্বশীল জায়গায় আছে, খুব ভালো অবদান রাখতে পারে, টেকনোলজিতে সে খুবই দক্ষ, সে যদি জানে তাঁর ছেলেমেয়ের লেখাপড়ায় সমস্যা হবে না তবে অবশ্যই দেশে ফিরে আসবে। তারা কিন্তু দেশে আসতে খুবই আগ্রহী, কিন্তু যখনই দেখে যে এখানে এসে ভালো স্কুলে লেখাপড়া করাতে পারবে না, তখন পিছিয়ে যায়। পৃথিবীর অনেক বড় বড় দেশে প্রযুক্তি ক্ষেত্রের মানুষজনকে সরকার বড় বড় লোভনীয় অফার দিয়ে দেশে নিয়ে আসছে। অনেক দেশেই সেটা হচ্ছে। কাজেই এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। মেধাবীদের অনেক সুবিধা ও ফ্রিডম দিতে হবে। বলতে হবে, তোমরা এখানে এসো, এসে শুরু কর উদ্যোক্তা হিসেবে। আর এটা করতে পারলে, আমার মনে হয়, আমরা আমাদের মেধাবীদের মেধাকে দেশের কাজে লাগাতে পারব।

কালের কণ্ঠ : সিলেটে একটি আইটি পার্ক করার কথা অনেক সময় বলা হয়। এর সম্ভাবনা সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

জাফর ইকবাল : সিলেটে একটি আইটি পার্ক স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন ফোরামে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। আমি মনে করি, অবশ্যই সেটি করা যায়। কিন্তু বিষয়টি ঠিক আমার হাতে নেই। এটা করতে হবে সরকারকে। সরকারই বড় স্কেলে টাকা বিনিয়োগ করে, জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে তৈরি করতে পারে। আমার মনে হয় যে সব কিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়াটা ঠিক নয়। প্রথমত, ঢাকাকেন্দ্রিক হলে এটা কাজও করবে না। বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আর ঢাকার বাইরে 'ডিসেন্ট্রালাইজ' যদি করতে চায়, সিলেট এদিক থেকে ভালো। কারণ সিলেটে শুধু আমাদের ইউনিভার্সিটি আছে, তা নয়, এখানে আরো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে, অনেক মেডিক্যাল কলেজ আছে। কাজেই শিক্ষার দিক দিয়ে সিলেটে কিন্তু অনেক ধরনের সুযোগ আছে। এখান থেকে যে গ্রাজুয়েটরা বেরোচ্ছে, তারা কিন্তু অবদান রাখতে পারবে। আর সিলেট জায়গাটাও সুন্দর, আবহাওয়াও খুব ভালো। আমি মনে করি, সরকার যদি একটু পরিকল্পনা করে, তাহলে সিলেটকে ঘিরে এ রকম কিছু করতে পারে। আমার অনেক স্টুডেন্ট আছে, যারা কাজ করে যাচ্ছে। তারা কিন্তু ঢাকায় যায়নি, কোনো কম্পানিতে চাকরি নেয়নি। তারা কম্পানি তৈরি করে সিলেটে কাজ করে যাচ্ছে। এ রকম একাধিক গ্রুপ আছে, যারা বেশ ভালো করছে। সিলেটে যেহেতু ইউনিভার্সিটি আছে, ক্রমাগতভাবে আমরা কিন্তু 'ম্যানপাওয়ার সাপ্লাই' দিয়ে যাচ্ছি। এটা হয়তো অন্যরা দিতে পারবে না। অন্য জায়গায় হলে হয়তো সেখানে কারা কাজ করবে, মানুষগুলো আসবে কোথা থেকে- এসব প্রশ্ন থেকে যায়। কিন্তু সিলেটে হলে তাদের সে রকম সমস্যায় পড়তে হবে না।

কালের কণ্ঠ : শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন সম্পর্কে কিছু বলুন।

জাফর ইকবাল : দেখুন, আমরা কিন্তু প্রতিবছর ছেলেপিলেদের বের করে যাচ্ছি। আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমি আগে কম্পিউটার সায়েন্সে ছিলাম, এখন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান। কম্পিউটার সায়েন্সের ছেলেমেয়েরা অনেক ভালো করেছে। তারা এসিএম কনটেস্টে বাংলাদেশে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। যেটা এর আগে সব সময় বুয়েট হয়েছে। তিন বছর ধরে আমরা প্রতিযোগিতায় যাচ্ছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা অত্যন্ত সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে অনেক ভালো কাজ করছে। আমাদের যদি বুয়েটের সঙ্গে তুলনা করেন বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে, দেখবেন আমরা কিছুই না। শিক্ষকের সংখ্যার দিক দিয়ে বলুন, রিসোর্সের দিক দিয়ে বলুন, সুযোগ দিয়ে বলুন, সব কিছুতে আমরা অনেক কম। কিন্তু যদি বলেন হ্যাঁ ঠিক আছে দেশের জন্য অবদান কে বেশি রেখেছে? আমি মনে করি যে আমাদের ইউনিভার্সিটি অন্য ইউনিভার্সিটি থেকে কম করেছে সেটা বলা যাবে না, তাদের প্রায় সমান সমান কাজ আমরাও করে যাচ্ছি। অবদান রেখে যাচ্ছি।

কালের কণ্ঠ : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

জাফর ইকবাল : আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

মন্তব্য