kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ নভেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ঐতিহ্য

কিংবদন্তির হরিনারায়ণ দিঘি

মো. মোস্তাফিজুর রহমান   

৬ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



কিংবদন্তির হরিনারায়ণ দিঘি

কমলগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হরিনারায়ণ দিঘি। ছবি : কালের কণ্ঠ

৪০০ বছরেরও বেশি সময় আগের কথা। মৌলভীবাজার অঞ্চলে ছিলেন হরিনারায়ণ নামের এক প্রজাদরদি রাজা। ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। হরিনারায়ণের রাজ্যে একবার তীব্র খরা দেখা দিল।

বিজ্ঞাপন

তাতে রাজ্যে ব্যাহত হচ্ছিল চাষাবাদ। প্রজাদের সমস্যা সমাধানে বিশাল এক দিঘি খনন করেন রাজা হরিনারায়ণ। কিন্তু জনশ্রুতি বলে, প্রজাদের মঙ্গলের জন্য খনন করা সেই দিঘির জন্যই রাজা হারিয়ে ফেলেন নিজের স্ত্রী ভানুমতীকে!

কালের বিবর্তনে ৪০০ বছর আগের সেই রাজা ও রাজপরিবারের স্মৃতি অনেকটাই মুছে গেছে; কিন্তু মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের মঙ্গলপুর গ্রামে ৩৬০ শতাংশ জায়গাজুড়ে বিস্তৃত দিঘিটি এখনো টিকে আছে।

হরিনারায়ণ দিঘির সৌন্দর্য এবং ছায়া সুনিবিড় পরিবেশ মানুষকে মুগ্ধ করে চলেছে যুগ যুগ ধরে। ঐতিহাসিক দিঘিটি দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক ভিড় করে। দিঘির প্রায় তিন দিকে রয়েছে অনেক গাছ। দিঘিটির সৌন্দর্য রক্ষায় সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন পর্যটকদের জন্য বসার স্থান ও ঘর তৈরি করছে।

হরিনারায়ণ দিঘি কমলগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দিঘিটির সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনকে খুবই জরুরি মনে করছে স্থানীয় অধিবাসীরা।  

জনশ্রুতি অনুযায়ী, দিঘিটির আশপাশেই ছিল রাজা হরিনারায়ণের প্রাসাদ। দয়ালু এই শাসক সব সময়ই প্রজাদের মঙ্গলের চিন্তা করতেন। তীব্র খরার কারণে প্রজারা ঠিকমতো ফসল ফলাতে না পারায় রাজা একটি দিঘি খননের উদ্যোগ নেন। ইতিহাস গবেষকদের বিবরণ অনুযায়ী তা ১৫৮০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যকার কোনো এক সময়ের কথা। রাজার কথায় দিঘি খনন করা হলো। কিন্তু বেশ কিছুদিন পরেও পানি উঠল না। এতে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন হরিনারায়ণ। এরপর দিঘির ভেতরে খনন করেন একটি কুয়া, কিন্তু তাতেও পানির দেখা নেই। এরই মধ্যে রাজার ঘর আলো করে আসে এক পুত্রসন্তান। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, এরপর একদিন রাজা স্বপ্নে দেখেন দিঘিতে খনন করা কুয়ায় তাঁর স্ত্রী ভানুমতী এক কলস পানি ঢাললে সেখানে পানি উঠবে। পরের দিন বিষয়টি রানিকে জানান হরিনারায়ণ। রাজার পরামর্শে রানি কুয়ায় এক কলস পানি ঢালতেই তার নিচ থেকে গমগম করে পানি উঠতে থাকে। কুয়া থেকে ওঠা পানির তোড় এতই তীব্র হয় যে তার স্রোতে সেখানেই তলিয়ে যান রানি ভানুমতী। তাঁকে আর কখনোই খুঁজে পাওয়া  যায়নি।

স্থানীয় কিংবদন্তি বলে, দিঘিতে শেষ পর্যন্ত পানি উঠলেও স্ত্রীকে হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েন রাজা হরিনারায়ণ। আর কখনো রাজকাজে মন দিতে পারেননি তিনি।

একসময় তাঁর রাজত্বের অবসান ঘটে। সময়ের ধারায় রাজার স্মৃতিচিহ্ন মুছে গেলেও তাঁর শাসনকালের সাক্ষী হিসেবে এখনো রয়ে গেছে হরিনারায়ণ দিঘি। এখনো স্থানীয় লোকজনের স্নানসহ বিভিন্ন কাজে পানির চাহিদা পূরণ করে চলেছে এই দিঘি।

লেখক ও গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, এই দিঘির ইতিহাস বহু পুরনো। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাজা হরিনারায়ণ প্রজাদের জন্য দিঘি খনন করেই নিজ পরিবারকে হারিয়েছিলেন। শোকে একসময় রাজ্যপাট ত্যাগ করেছিলেন তিনি। এটা এ অঞ্চলের ইতিহাসের এক করুণ কাহিনি।

 



সাতদিনের সেরা