kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ঐতিহ্য

মাটির ঘরে শিক্ষা জাদুঘর

আবদুর রহমান, কুমিল্লা   

৪ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাটির ঘরে শিক্ষা জাদুঘর

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা ইউনিয়নের রামধনপুর শিক্ষা জাদুঘর। ছবি : কালের কণ্ঠ

গল্পের শুরুটা সেই ১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধের বছরে। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার রামধনপুর গ্রামের সচেতন কিছু মানুষ উদ্যোগ নেন এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার। সে বছরই প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর যাত্রা শুরু হয় বাঁশের বেড়া ও ছনের ছাউনির ঘর দিয়ে।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৩ সালে ওঠে মাটির ঘর। কালের পরিক্রমায় রামধনপুরের সেই বিদ্যালয় একসময় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ১৯৯৪ সালে বিদ্যালয়টিতে প্রথমবারের মতো নির্মিত হয়েছে পাকা ভবন। এর আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে মাটির ঘরেই চলেছে হাজারো শিক্ষার্থীর পাঠদান।

ভারত সীমান্তবর্তী রামধনপুরের সেদিনের মাটির স্কুল ঘরে যাঁরা বিদ্যার্জন করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পাকা ভবন দুটি। পরিত্যক্ত সেই মাটির স্কুল ঘরটিও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুভাশিস ঘোষ কয়েক মাস আগে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গেলে মাটির ঘরটি তাঁর নজর কাড়ে। ইউএনও সেটি রক্ষা করার কথা ভাবেন। একসময় কত কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হতো, নতুন প্রজন্মকে তা জানাতেই এ পরিকল্পনা করেন তিনি।

ইউএনওর উদ্যোগে নতুন সাজে সেজেছে প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো সেই মাটির স্কুল ঘর। সেখানে স্থাপিত হয়েছে শিক্ষা জাদুঘর। জাদুঘরটির জন্য উপজেলার বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরনো দিনের নানা শিক্ষা উপকরণ দিয়েছে। এর মাধ্যমে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সেই পুরনো মাটির ঘরটি।

সম্প্রতি রামধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষা জাদুঘরটির উদ্বোধন করেছেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘রামধনপুর শিক্ষা জাদুঘর’। উদ্বোধনের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেন, এ ধরনের শিক্ষা জাদুঘর দেশে এটাই প্রথম বলে তাঁদের ধারণা।

রামধনপুর বিদ্যালয়টির সামনেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক বটগাছ। এককালের জরাজীর্ণ মাটির ঘরটির গায়ে লেগেছে নতুন কাদার প্রলেপ। দেয়ালে আঁকা হয়েছে নানা রঙের আলপনা। আর ঘরটির ভেতরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কয়েক দশক আগে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ। এসবের মধ্যে আছে পুরনো বই, কলম,

লেখার কালির দোয়াত, ট্রাংক, কুপি বাতি, হারিকেন, হারিকেনের চিমনি, ঘড়ি, আলমারি, মগ, হাতপাখা, চেরাগদানি (প্রদীপ, বাতি রাখার জন্য) হ্যাজাক লাইটসহ বিভিন্ন উপকরণ।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘মাটির ঘর আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক। বর্তমানে মাটির ঘর দেখা যায় না বললেই চলে। কুমিল্লার নিভৃত গ্রামে মাটির ঘর সংরক্ষণ করে শিক্ষা জাদুঘর স্থাপন করা নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এই জাদুঘর নতুন প্রজন্মকে আগের শিক্ষা উপকরণ সম্পর্কে জানাবে। সঙ্গে বড়রা তাঁদের ফেলে আসা স্মৃতিতে ফিরে যেতে পারবেন। ’

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘জাদুঘরটি দেখতে অনেক মানুষ ভিড় করছে। এমন উদ্যোগ না নিলে হয়তো মাটির ঘরটির অস্তিত্ব হারিয়ে যেত। ’

রামধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবদুল হান্নান বলেন, ‘মাটির এই স্কুল ঘরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমি নিজেও একজন। এখানে অনেক আবেগ ও ভালোবাসার স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। ’

এ উদ্যোগের পেছনে অনুপ্রেরণার কারণ জানতে চাইলে ইউএনও শুভাশিস ঘোষ বলেন, ‘পুরনো ঘরটি দেখে আমার মনে হয়েছিল, একটু উদ্যোগ নিলেই এখানে ভালো কিছু হতে পারে। মূলত সেই চিন্তা থেকেই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, শিক্ষক ও স্থানীয় ইউপি সদস্যের সমন্বয়ে সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। তাদের সবার সহযোগিতায় অর্ধশত বছরের পুরনো স্কুল ঘরটি সংস্কার করা হয়। আশা করছি, এলাকাবাসী জাদুঘরটি রক্ষায় সামনেও ভূমিকা রাখবে। ’



সাতদিনের সেরা