kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

প্রতি দুই মিনিটে একজন ‘চোখ ওঠা’ রোগী আসছে

শিমুল মাহমুদ   

১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রতি দুই মিনিটে একজন ‘চোখ ওঠা’ রোগী আসছে

গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশে ক্রমাগত বাড়ছে চোখ ওঠা (কনজাংকটিভাইটিস) রোগের প্রকোপ। ছোঁয়াছে রোগ হওয়ায় কেউ আক্রান্ত হচ্ছে কর্মস্থলে তো কেউ আক্রান্ত হচ্ছে চলতি বাহনে। পরিবারের একজন সদস্য আক্রান্ত হলে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অন্য সদস্যদের মধ্যে। ফলে দ্রুত বাড়ছে চোখ ওঠা রোগীর সংখ্যা।

বিজ্ঞাপন

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগ, ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এবং জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, এসব হাসপাতালে চিকিৎস নিতে আসা চোখ ওঠা রোগীর বেশির ভাগ শিশু ও বৃদ্ধ। আর গতকাল গড়ে প্রতি দুই মিনিটে একজন চোখ ওঠা রোগী চিকিৎস নিতে এসেছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে চোখের চিকিৎস নিতে আসা রোগীদের টিকিট দেওয়া হয় সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার এই সময়ের মধ্যে ওই কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়েছে ২৭৬ জন। এদের মধ্যে ১২৭ জন ছিল চোখ ওঠা রোগে আক্রান্ত।

একই চিত্র দেখা গেছে ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার এই হাসপাতালে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা গেছে, এই সময়ের মধ্যে প্রায় দুই শ রোগী চোখের চিকিৎস নিতে কাউন্টার থেকে টিকিট কিনেছে। এদের মধ্যে ১৫ জন ছিল চোখ ওঠা রোগে আক্রান্ত।

তবে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিত্র ভিন্ন। সেখানে চিকিৎস নিতে যায় তুলনামূলক কমসংখ্যক রোগী। গড়ে প্রতিদিন ১২০ জন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার এসেছিল ২৫ জন চোখ ওঠা রোগী।  

রাজধানীর নবাবগঞ্জ বাজার এলাকার বাসিন্দা শিশু আয়েশা দাদার হাত ধরে এসেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সে জানায়, তার এক বন্ধু চোখ ওঠা রোগ নিয়ে স্কুলে এসেছিল। সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আয়েশা আর  চোখ মেলতে পারছিল না। একই সঙ্গে অনুভূত হচ্ছিল তীব্র ব্যথা।

সেগুনবাগিচা এলাকার চাকরিজীবী হামিদুল ইসলাম জানান, প্রথমে তাঁর বাসার একজনের চোখ ওঠে। এরপর একে একে বাসার পাঁচ সদস্যের সবাই আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে চার দিন পার হলেও চোখ জ্বলা, পানি পড়া না কমায় হাসপাতালে এসেছেন।

চিকিৎসকেরা জানান, চোখের রেটিনার একেবারে বাইরের স্বচ্ছ অংশটিকে ডাক্তারি ভাষায় বলে ‘কনজাংকটিভা’। ভাইরাস সংক্রমণ হলে সেখানে তৈরি হয় প্রদাহ, আর ফুলে যায় চোখের রক্তনালি। এ কারণেই চোখের রং লালচে হয়ে যায়। যেটিকে বলা হয় চোখ ওঠা (কনজাংকটিভাইটিস)।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কর্নিয়া বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক মো. আব্দুল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শরৎ শেষেই শুরু হয় শীতের আগমন। এই সময়টায় আবহাওয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়। যার বিরূপ প্রভাব পড়ে মানুষের শরীরে। ফলে দেশে প্রতিবছর এ সময়টায় চোখ ওঠা রোগের প্রকোপ বাড়ে। কারণ ভাইরাস ছড়ানোর জন্য আবহাওয়ার এই পরিবর্তন বেশ উপযোগী। ’

তিনি বলেন, ‘চোখ ওঠা ভাইরাসজনিত রোগ। চোখ জ্বলা, চুলকানি, খচখচে ভাব, চোখ থেকে পানি পড়া, চোখে বারবার সাদা ময়লা জড়ানো, কিছু ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা এ রোগের প্রধান লক্ষণ। ’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. আল মাহমুদ লেমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশব্যাপী চোখ ওঠা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক চিকিৎসকও আক্রান্ত হচ্ছেন। এই ভাইরাসের ইনফেকশন সাত দিনে ভালো হয়ে যাবে—এমন চিন্তা থেকে অনেকে হাসপাতালে আসতে চায় না।  আমি বলব, দেরি না করে দ্রুত কাছের চক্ষু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। কারণ চোখ ওঠা থেকে পরে স্ট্রোমাল কেরাটাইটিস  (STROMAL KERATITIS), ইউভাইটিস  (UVEITIS), কর্নিয়াল আলসারের  (CORNEAL ULCER) মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা দৃষ্টিহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ’

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ফরহাত জাহান চোখ ওঠা রোগ থেকে রক্ষায় কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এই রোগ মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে ছড়ায়। এ জন্য পরিবারের কারো হলে তিনি যেন কিছুদিন আইসোলেটেড বা আলাদা থাকেন। আর স্কুলের কোনো শিক্ষার্থীর চোখ লাল হলে বা লক্ষণ দেখা দিলে স্কুলে পাঠানো উচিত নয়। একইভাবে কর্মস্থলে থাকা ব্যক্তিদের কেউ যদি চোখ ওঠা রোগে আক্রান্ত হন, তবে অন্য সহকর্মীদের রক্ষায় তাঁর কয়েক দিন ছুটিতে থাকা ভালো। পাশাপাশি রোগীর ব্যবহার করা রুমাল, তোয়ালে, বালিশ, পোশাক অন্যরা যেন ব্যবহার না করেন। তাহলে কমে আসবে চোখের এই রোগ। ’



সাতদিনের সেরা