kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সন্তানদের জন্য প্রাণ কাঁদে তারা ফিরেও তাকায় না

মোবারক আজাদ   

১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সন্তানদের জন্য প্রাণ কাঁদে তারা ফিরেও তাকায় না

ষাটোর্ধ্ব আব্দুল মালেক ও ফাতেমা একসঙ্গে বসে বই পড়ছেন। গতকাল রাজধানীর মিরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়ার চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার থেকে তোলা। ছবি : লুৎফর রহমান

‘আমার সুখের সংসার আল্লে। ঢাহার ভাসানটেকে মুদির দোকান চালাইতাম। তিনডা মাইয়া-পোলা ও বউ লইয়া ভালোই আল্লে দিনকাল। ২০০৬ সালে আচুক্কা ক্যান্সার হইয়া বউডা মইরা গ্যাছে।

বিজ্ঞাপন

অনেক চেষ্টা ও টাহা পয়সা ভাইঙাও হ্যারে বাঁচাইতে পারি নাই।   হেইয়ার পর আস্তে আস্তে পোলা দুইডাও নষ্ট হইয়া গ্যাল। হেরা দোহানের টাহা মাইরা জুয়া আর মাদকে জড়াইয়া পড়ছে। তহন মাইয়াডারে কোনো রহমে বিয়া দেল্লাম। শেষে দোকানডা ছাইড়া দেতে হইছে। পোলারাও মোরে হালাইয়া অন্য জায়গায় চইল্লা গ্যাছে। তহন মুই অসুস্থ হইয়া যাই, ঘর ভাড়া দেতে পারছি না। একসময় রাস্তার পাশে মোর ঠাঁই মেলে। হেইহান থাইক্কা তুইলা আইনা হেরা আশ্রয় দেয়। এহানে আছি পাঁচ বছর ধইরা। ’ 

একদমে কথাগুলো বললেন আব্দুল মালেক। বুক ভরা আক্ষেপ মালেকের। কথা যেন শেষ হতে চায় না। ৬৮ বছর বয়স। শেষ বেলার নুয়ে পড়া শরীর এই তিন সন্তানের জনকের। এমন বয়সে আপনজনের মাঝে একটু আরাম-আয়েশে দিন কাটাতে চায় মানুষ। চায় একটু-আধটু সেবা।

কিন্তু সে জো নেই। একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে আশ্রিত। রাজধানীর মিরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়ার  প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব প্রবীণ দিবস উদযাপন হচ্ছে আজ। আব্দুল মালেকের মতো এমন অনেক প্রবীণ আছেন, যাদের আপনজন থেকেও নেই। অবহেলা-অনাদরে নিজ গৃহে পরবাসীর মতো কাটছে। কেউবা আবার পরিবারের বোঝা না হয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণ নিবাসে।

মালেকের গ্রামের বাড়ি বরিশাল সদরে। মালেক বলেন, ‘যুবক বয়সে ঢাহায় আইছি। দেশ স্বাধীনের আগে ফাইভ পর্যন্ত লেহাপড়া করছি। তয় বর্তমানে চোহে কম দেহি। শইল শক্তি নাই, কাঁফে। পোলা-মাইয়া মোর আর খোঁজ নেয় না। হুনছি একটা পোলা বিয়া হরছে। আগের কথা মনে অইল্লে আর ভালো লাগে না। ’

সন্তানরা নিতে এলে যাবেন কি না—জানতে চাইলে মালেক হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘পোলারা আমারে শেষ কইরা দেছে। হেইয়ার পরও তাদের জন্য পরানডা কান্দে। তারা নিতে আইলে মুই অগো লগে চইল্লা যামু। যদি খাওয়ন-পরন দেয়। তাদের কথা হারাদিন মনে পড়ে। ’ তিনি জানান, তাঁর চাচাতো এক ভাই ঢাকায় থাকেন। অবস্থা ভালো। তবে মালেকের কোনো খোঁজ নেন না।

একই প্রতিষ্ঠানে আশ্রিত নূরজাহান বেগম (৬৫)। চট্টগ্রাম নগরের রাস্তা থেকে তাঁকে তুলে আনা হয়েছে। বাড়ি নোয়াখালীর সোনাপুর।

নূরজাহান জানান, তাঁর বিয়ের পর একটা সন্তান হয়ে মারা যায়। স্বামী অন্যত্র বিয়ে করেন। পরে স্বামীর ঘর আর করা হয়নি। এক পর্যায়ে নূরজাহান চট্টগ্রাম গিয়ে বাসাবাড়ির কাজ করতে থাকেন। ক্রমে বয়স বেড়ে শরীর কাজে অক্ষম। এরপর ঠাঁই হয় রাস্তায়। সেখান থেকে তাঁকে এই আশ্রয়কেন্দ্র আনা হয়। ’

শুধু মালেক আর নূরজাহান নন, এখানে বর্তমানে ১৩৫ জন প্রবীণ আছেন, যাঁরা পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হয়ে এসেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তাঁদের তুলে এনে আশ্রয় দিয়েছেন। ভরণ-পোষণ দিচ্ছেন।

চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের ব্যবস্থাপক মো. মিরাজ বলেন, গত আট বছরে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক হাজার ২০০ অভিভাবকহীন অসুস্থ প্রবীণকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে আশ্রয় দিয়েছে। প্রত্যেকেই পরিবার ও স্বজনদের অবহেলার শিকার। অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠান চলছে প্রতিষ্ঠাতা মিলটন সমাদ্দারের ব্যক্তিগত ব্যবসা এবং সমাজের বিত্তবান মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের দানের টাকায়।

নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ছাড়াও মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত অনেক পরিবারেও প্রবীণদের চিত্র প্রায় একই।

খোঁজ নিয়ে আরো দেখা গেছে, অনেক পরিবারের সন্তানাদি উচ্চতর জীবন লাভের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বৃদ্ধ মা-বাবার খোঁজখবর রাখছেন না। একসময় বৃদ্ধ মা-বাবার খালি বাসায় মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কয়েক দিন পর মরদেহের পচা গন্ধ পেয়ে প্রতিবেশীরা থানায় জানালে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবছর ১ অক্টোবর ঘটা করে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হলেও সমাজের সর্বস্তরে লাখো প্রবীণ নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। দিনের পর দিন সমাজে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় অনেকে বৃদ্ধ মা-বাবাকে রেখে আলাদা সংসার করছেন। এর ফলে প্রবীণরা আরো বেশি একাকিত্বের যন্ত্রণা ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশের সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেসব অভিভাবকহীন প্রবীণের আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। এগুলো বাড়াতে হবে। এ ছাড়া পরিবারে মা-বাবার প্রতি সন্তানদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য, তা বেশির ভাগ সন্তানই পালন করেন না। এ থেকে উত্তরণের পথ বের করার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সচেতন সবার। তা না হলে পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা আরো বাড়বে।



সাতদিনের সেরা