kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

রাস্তার পাশে খাবারের দোকান

মান, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই

শিহাবুল ইসলাম   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মান, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি ফুচকা খাচ্ছে কয়েকজন। এসব খাবারে অনেক সময় নানা রোগ বাসা বাঁধে শরীরে। গতকাল রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

পার্ক, বিনোদনকেন্দ্রসহ সারা দেশে লোকসমাগমের স্থান ও এর আশপাশে খাবারের দোকান বসে প্রচুর। ভাসমান এসব দোকান ফুটপাত বা রাস্তার পাশে পসরা সাজায়। ভাত-তরকারির পাশাপাশি চপ, ফুচকা, বেলপুরি, ঝালমুড়ি, চা-পুরি—এসব বিক্রি করে তারা। তবে খাবারগুলো স্বাস্থ্যসম্মত বা মানসম্পন্ন কি না, তা দেখার বা যাচাইয়ের কেউ নেই।

বিজ্ঞাপন

এতে নগরবাসীর বড় একটা অংশ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর গুলশান-১ গুদারাঘাট থেকে কিছুদূর এগোলে লেকের পূর্ব দিকে সড়কের দুই পাশে বেশ কিছু খাবারের দোকান। বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সোহেল এসব দোকানের একটির বেঞ্চে বসে চা পান করছিলেন। তিনি ডিপ্লোমা করছেন খাদ্য ও পানীয় উন্নয়নের ওপর।   সোহেল বলেন, ‘মাঝেমধ্যে এসব দোকানের খাবার খাই। দাম কম হলেও মান ভালো না।   স্বাদও খুব আহামরি  নয়। পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ’

ঢাকাসহ সারা দেশে ফুটপাত ও রাস্তার পাশে কতসংখ্যক এমন খাবারের দোকান রয়েছে এর কোনো হিসাব সরকারের বা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই। একই সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখার বিষয়গুলোও দেখার জন্য নেই কার্যকর ব্যবস্থা। কিছু সংস্থা থেকে হোটেল-রেস্তোরাঁয় অভিযান পরিচালনা করা হয় ঠিকই, কিন্তু সেটিও পর্যাপ্ত নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২০ সালে সারা দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁর ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী অবকাঠামোসম্পন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁ ছিল এক লাখ ১৭ হাজার ৯৮১টি। বছর বছর তা বেড়ে ২০২০ সালে হয়েছে চার লাখ ৩৬ হাজার ২৭৪টি। তবে রাস্তার ওপর নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কতসংখ্যক দোকানে খাবার বিক্রি করা হয় এর কোনো হিসাব নেই কারো কাছে। এসব খাবারের দোকান বাড়ছে। সামান্য ফাঁকা জায়গা ও ভোক্তার চাহিদা থাকলেই খোলা পরিবেশে খাবার বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর ভাটারার একটি খাবার হোটেলের মালিক মো. উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে লোকজন এসে ঘুরে গেছে। বলল বাংলা হোটেল, ভালোই। এ পর্যন্ত কখনো জরিমানা দেওয়া লাগেনি। তবে করোনার মধ্যে দোকান খোলা রাখায় একবার ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়েছি। ’

হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবার নিরাপদ রাখতে কাজ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপদ স্ট্রিট ফুড জোন বাস্তবায়নে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা ঢাকা শহরের পাঁচটি জনবহুল এলাকার ফুটপাতে বিক্রি করা খাদ্য স্থাপনা, খাবারের মান, ঝুঁকি ও অন্যান্য সমস্যা শনাক্ত করবে। ওই দুই কমিটিকে ৭ অক্টোবরের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ী ও কর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে খাবারের মান উন্নয়নে কাজ করে। স্থায়ী হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি তারা ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করে।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে রাস্তার পাশের হোটেলের খাবার খাওয়া যায়, কিন্তু বাংলাদেশের রাস্তার পাশের হোটেলের খাবার খাওয়া যায় না। এসব খাবার খেলে পেটের পীড়াসহ হেপাটাইটিস, জন্ডিসসহ যেকোনো রোগ-ব্যাধি হতে পারে। এ জন্য স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতার দিকে মালিকদের নজর দিতে হবে। ’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে অভিযান চালানো হয়। নিয়মিত মামলাও হচ্ছে। রাস্তার ওপর যাঁরা খাবার বিক্রি করছেন, তাঁরা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণির। তাঁদের ধরার আগে আমাদের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোর দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি। কারণ স্ট্রিট ফুডের ক্ষেত্রে হকার উঠিয়ে দেওয়া ও উচ্ছেদ করার মধ্যে মানবিক বিষয় জড়িত। ’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবারকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। একটি সকালে স্কুল-কলেজের সামনে বিক্রি হওয়া খাবার। এগুলো শিঙাড়া, চপ, পেঁয়াজুজাতীয় খাবার। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বিক্রি হয় ঝালমুড়ি, চপ, বেলপুরি, চটপটি-ফুচকাজাতীয় খাবার। আবার অনেকে রাস্তার ধারের দোকানে ভাত, মাছ, তরকারি, ডিম, ডাল, সবজি, ভর্তা—এসব খাবারও বিক্রি করেন। দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই বিক্রি।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এনফোর্স বিভাগের পরিচালক সহদেব চন্দ্র সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে, মানুষ খাচ্ছে। যেহেতু সরকার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে, এ জন্য সেই খাদ্যটা নিরাপদ না অনিরাপদ, সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তায়। স্ট্রিট ফুড পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট দেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। তবে আমরা মনিটরিং কার্যক্রম শুরু করেছি। ’

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘স্ট্রিট ফুড বিক্রি করা দোকানের পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। সেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে না। তারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে বসে, খাবার বিক্রি করে। ’

 



সাতদিনের সেরা