kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ অক্টোবর ২০২২ । ২১ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বাড়ি ইজারা নিয়ে সম্প্রসারণ করে কলকারখানা

এস এম আজাদ   

১৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাড়ি ইজারা নিয়ে সম্প্রসারণ করে কলকারখানা

পুরান ঢাকার চকবাজারের যে এলাকায় সোমবার আগুন লাগে, সেখানে বেশির ভাগ বাড়িতেই প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানা ও গুদাম দেখা গেছে। কামালবাগে দেবীদাস ঘাট লেনের এসব বাড়ির নিচতলায় আছে দোকানপাট। বিভিন্ন তলায় জনবসতিও আছে। বাড়িগুলোর দুই-এক তলার ওপরে প্লেন শিট বা টিন লাগিয়ে বাড়ানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা ও গুদাম তৈরির জন্য ইজারা নিয়ে ইচ্ছামতো বাড়ি রূপান্তর করা হয়। এসব ভবনের নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন। তাদের ব্যবসারও অনুমোদন নেই। তবে প্রতিটি বাড়িতেই আছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ।

সরেজমিনে ঘুরে এসব তথ্য মিলেছে। গত বুধবার এখানে এসে আগুন লাগা বাড়িটিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসও।

তবে অবৈধ প্লাস্টিক কারবারিরা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের বিষয়টি গোপন রাখার অপচেষ্টা করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ভবনে থাকা কারখানা ও পাশের তিন ভবনে পুড়ে যাওয়া তিনটি প্লাস্টিক কারখানার মালিকের হদিস মেলেনি। মামলায় নাম না থাকায় পুলিশও তাঁদের খুঁজছে না। হদিস নেই তিন ভবনের মালিকেরও। ভবনে ঝুলছে তালা।

গত দুই দিন দেবীদাস ঘাট লেনে যায় ফায়ার সার্ভিসের তদন্তদল। দলের প্রধান ও উপপরিচালক বজলুর রশিদ বলেন, দুর্ঘটনার দিনই প্রাথমিক তথ্য নিয়ে কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করে ফায়ার সার্ভিস। এখন ঘটনাস্থল থেকে সঠিক কারণ অনুসন্ধান ও নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে ঘটনার তিন-চার দিন হলেও মালিকপক্ষের কারো সঙ্গে কথা বলা যায়নি। স্থানীয় লোকজনও তদন্তদলের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না। তিনি বলেন, এই এলাকায় কিছুদিন আগে আরো একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেখানেও চার থেকে পাঁচজন মারা গেছে। স্থানীয় লোকজন এভাবেই ব্যবসা করতে চায়, কিন্তু তাদের নিজেদের নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আশপাশের কয়েকটি বাড়িতে কথা বলেও ক্ষতিগ্রস্ত তিন বাড়ি ও কারখানার মালিকের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়নি। পাশের আরেকটি ভবনের ভেতরে ঢুকতে চাইলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে একজন বাধা দেন। মনির নামের ওই যুবক বলেন, ভেতরে গোডাউন ও ডাইস আছে। মালিক না থাকলে ঢোকা যাবে না।

ঢাকা প্লাস্টিক ভবনের পাশের ৩০ নম্বর দেবীদাস লেন ভবনটি বাইরের অংশ অনেকটাই অক্ষত। তবে ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, কারখানা

ও গুদাম পুড়ে ছাই। ভবনটিরও দোতলা অংশে টিনের ছাদ। পেছনের অংশে বাড়ানো হয়েছে।

স্থানীয়ভাবে সুন্দর প্লাস্টিক কারখানা নামে পরিচিত হলেও এর মালিকের নাম বলতে চাইল না কেউ।

তবে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক যুবক বলেন, এসব বাড়ির বেশির ভাগই ইজারা নেওয়া। মালিকের কাছ থেকে চুক্তিতে নিয়ে নিজেদের সুবিধামতো বাড়ায়। সে অনুযায়ী টাকা দেয়। তাঁর ভাষ্য মতে, ঢাকা প্লাস্টিক ভবনের আসল মালিকের বাড়ি কামরাঙ্গীর চরে। আলম সাহেব নামের রহমতগঞ্জের এক ব্যক্তি বাড়িটি নিয়ে স মিল দেন। দুই বছর আগে ভবন তোলা হয়। এরপর নজরুল নামে একজন বেশির ভাগ অংশ ভাড়া নিয়ে প্লাস্টিকের খেলনা ও জুতার সোল তৈরির কারখানা করেন। ভবনটি দেখাশোনা করেন আলম সাহেবের ছেলে রানা। আলাউদ্দিন নামের একজন ব্যবস্থাপকও আছেন। যুবকের দাবি, স্থানীয় নেতারা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইন ম্যানেজ করে দেন। টাকা দিলে এসব লাইন দেওয়া হয়। পুরো এলাকার কারখানায় অবৈধ লাইন আছে।

মেয়র ফজলে নূর তাপস এলাকায় গিয়ে বলেন, ‘আমরা তো বাণিজ্যিক অনুমোদন বন্ধ রেখেছি, তাহলে অন্য সংস্থাগুলো কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে কিভাবে এই ভবনে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দিল? যে ভবনের কোনো বৈধতা নেই, কোনো বাণিজ্যিক অনুমোদন নেই, যে প্রতিষ্ঠানের  ব্যাবসায়িক অনুমোদন আমরা দিইনি, সেই প্রতিষ্ঠান কিভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পেল?’

মামলার বাদী ও নিহত রেস্টুরেন্টকর্মী রুবেলের ভাই মো. আলী বলেন, ‘আমি মামলায় হোটেলের মালিকের নাম দিছি, কারণ সে আমার ভাইরে ওইখানে রাখছে। আর আগুন লাগায় সে মারা গেছে। আমার কাছে মালিকরাই আসল আসামি। তবে এর পেছনে অন্য কেউ থাকলে তাদেরও বিচার করতে হবে। ’

পুলিশের চকবাজার জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার কুদরত-ই খুদা বলেন, ‘একজনকে গ্রেপ্তার করার পর জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে আমরা কাজ করছি। যাদের কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে তারাই মামলায় অভিযুক্ত হবে। ’

এদিকে মঙ্গলবার রাত দেড়টার দিকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মর্গ থেকে নিহত ছয়জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গত বুধবার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে ছয় রেস্টুরেন্টকর্মীর লাশ দাফন করা হয়।

চকবাজার থানার ওসি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, মুখ দেখে ছয়টি পরিবার ছয়জনের লাশ দাবি করে। আলাদা দাবিদার হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় পরিবারগুলোর সম্মতি নিয়ে লাশ দেওয়া হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষায় ভিন্নতা থাকলে তখন জানানো হবে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক দিনের রিমান্ড শেষে রেস্টুরেন্টের মালিক ফখর উদ্দিনকে আজ (গতকাল) আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ’

প্রসঙ্গত, গত সোমবার দেবীদাস ঘাট লেনের ঢাকা প্লাস্টিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে নিচতলায় ‘বরিশাল হোটেলে’ ছয় কর্মীর মৃত্যু হয়। লাগোয়া দুটি ভবনও পুড়েছে। ভবন মালিক রানা ও রেস্টুরেন্ট মালিক ফখর উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে মামলার পর পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে।



সাতদিনের সেরা