kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের পড়া বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল   

১৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের পড়া বন্ধ

রাব্বি খান, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের অনুসারী অমিত হাসান রক্তিম গ্রুপের সক্রিয় কর্মী তিনি। ছাত্রলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছিলেন রাব্বি।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যেই প্রতিপক্ষরা তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করেছে।

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সার্জারি বিভাগে রাব্বি খান চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, প্রতিপক্ষ মহিউদ্দীন আহমেদ সিফাতের নেতৃত্বে তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। সিফাত বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারী।

যেভাবে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময়ে মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রলীগের কোনো কমিটি না থাকলেও সিফাত দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। ক্যাম্পাসে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন।

হঠাৎ করেই গত এক বছর ক্যাম্পাসে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের অনুসারী রক্তিম-জিহাদ গ্রুপ নতুন করে সক্রিয় হয়। সেই থেকে ক্যাম্পাসে প্রতিমন্ত্রী ও মেয়রের অনুসারীদের দ্বন্দ্ব ভেতরে ভেতরে চলে আসছে। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উদযাপন করে দুটি পক্ষ। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর পর থেকেই দুটি পক্ষই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নামে সক্রিয় আছে। তার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে তারা এক পক্ষ অন্য পক্ষকে এড়িয়ে চলছিল।

দুই পক্ষের মধ্যে চলতি বছরের গত ৫ জুলাই রাতে সংঘর্ষ ঘটে। রাত ১টার দিকে ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় উভয় পক্ষের অন্তত সাতজন আহত হন। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বৈঠকেও বসে।

প্রতিমন্ত্রীর অনুসারীরা আত্মগোপনে

পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির কারণে ক্যাম্পাসে দুই পক্ষই অনুপস্থিত ছিল। গত ২০ জুলাই ক্যাম্পাস খোলার পর থেকে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে আসছেন না। মেয়রের অনুসারীদের হামলার আশঙ্কায় তাঁরা ক্যাম্পাসে আসা বন্ধ করে দেন। তাঁদের অভিযোগ, বেশ কয়েকজন ছাত্র ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ক্যাম্পাসে খুঁজছেন। এ জন্য নিরাপত্তাহীনতায় তাঁদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। এমনকি ক্যাম্পাসে প্রবেশ, ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেওয়াও তাঁদের জন্য ভীতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন

মন্ত্রীর অনুসারী চার শিক্ষার্থী নিরাপত্তা চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর আবেদন করেন। আবেদনকারী শিক্ষার্থীরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ইরাজ রব্বানী, রসায়ন বিভাগের সাইমুন ইসলাম, বাংলা বিভাগের সাব্বির হোসেন ও লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী রাব্বি খান। গত ৭ আগস্ট করা ওই আবেদনে তাঁরা সিফাতের হুমকির কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে উল্লেখ করেন। আবেদনের পর ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রমে নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশ্বাস দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এমনকি আবেদনগুলো বন্দর থানার ওসির কাছেও পাঠায়।

শেষরক্ষা হয়নি

বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্বাসে রাব্বি গত রবিবার দুপুর ১২টায় ক্যাম্পাসে পরীক্ষা দিতে যান। পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর তাঁকে সিফাতের লোকজন তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে।  

রাব্বি অভিযোগ করেন, উপাচার্যের বাসভবনের ফটকের সামনে থেকে চার সন্ত্রাসী তাঁকে তুলে ক্যাম্পাসের বাইরে নাজেমস নামের একটি হোটেলের সামনে নিয়ে যায়। সেখানে সিফাত ৩০ থেকে ৩৫ জন সন্ত্রাসী নিয়ে অপেক্ষা করছিল। এরপর সিফাত নিজেই বগি-দা দিয়ে তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুতে ও ডান পায়ের হাঁটুর নিচে পেটান। একই সঙ্গে সিফাতের সহযোগীরা তাঁর মাথায় ও পিঠে কিল-ঘুষি মারেন। পৌনে দুই ঘণ্টা আটকে রেখে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। বিকেল ৩টার দিকে প্রক্টর খোরশেদ আলম ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

প্রতিপক্ষ দুই ছাত্রনেতার বক্তব্য

প্রতিমন্ত্রীর অনুসারী অমিত হাসান বলেন, নিরাপত্তা চেয়ে রাব্বিসহ কয়েকজন আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যেই রাব্বি খানকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে সিফাত নির্যাতন করেছেন।

সিফাত বলেন, ‘আমার জানা মতে ক্যাম্পাসে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আর আমি এ সম্পর্কে কোনো কিছু জানিও না। যদি কেউ এ ধরনের অভিযোগ করে থাকেন, তবে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. খোরশেদ আলম বলেন, ঘটনার সময় তিনি একটি সভায় ছিলেন। পরে খবর জেনে ক্যাম্পাসের বাইরে ওই এলাকায় গিয়ে রাব্বিকে উদ্ধার করেন। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি অবশ্যই দুঃখজনক। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখছে।



সাতদিনের সেরা