kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

টিকল না বাঁধ, ফসলি জমি প্লাবিত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টিকল না বাঁধ, ফসলি জমি প্লাবিত

খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী এলাকায় রবিবার কপোতাক্ষ নদের জোয়ারে ভেঙে যাওয়া বাঁধ রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে গতকাল সকাল থেকে কাজ করছে এলাকার সাধারণ মানুষ। ছবি : ইমতিয়াজ উদ্দিন

অস্বাভাবিক উচ্চতার জোয়ারের মুখে খুলনার কয়রার দক্ষিণ বেদকাশীতে বাঁধ রক্ষায় স্বেচ্ছায় শ্রম দিয়েও ভাঙন ঠেকানো যায়নি। আগের দিন রবিবার স্বেচ্ছাশ্রম শুরু হয়। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার স্থানীয় বাসিন্দা বাঁশ পুঁতে ও মাটির বস্তা ফেলে বাঁধ মজবুত করে। কাজ শেষে তাঁরা বাড়ি ফিরে যায়।

বিজ্ঞাপন

এর পরই জোয়ারে সেই বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।  

এদিকে বরগুনার বেতাগীতে বাঁধ ভেঙে তিনটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ঝালকাঠিতে ৫০ গ্রাম তলিয়ে গেছে।

কয়রায় স্বেচ্ছায় শ্রম দেওয়া লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোর থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজারের মতো মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে চরামুখা গ্রামের কপোতাক্ষ নদের প্রায় ২০০ মিটার বাঁধ নির্মাণ শেষ করে তারা। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ শেষে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই প্রবল জোয়ারে সেটি ভেঙে আবারও লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। ডুবে যায় ১০টির বেশি গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ। তলিয়ে গেছে ধানের বীজতলাসহ এক হাজার একরের মতো মৎস্য ঘের।

ইউনিয়নের পদ্মপুকুর গ্রামের তৈয়েব আলী বলেন, ‘এলাকার মধ্যে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ গিয়ে ছয় ঘণ্টা কাজ করে বাঁধ দিয়ে বাড়ি ফিরতে না ফিরতে আবারও ভেঙে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। কতবার ভাঙবে আর আমরা কতবার ঠিক করব তা বুঝতে পারছি না। প্রতিবার ভাঙনের পরে অনেক বড় বড় ব্যক্তিরা পরিদর্শনে এসে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে চলে যান। পরে আর তাঁদের খোঁজ থাকে না। কিছু হলে মরা লাগে আমাদের। ’

বীণাপাণি গ্রামের গোপাল মিস্ত্রি চলতি মৌসুমে ছয় বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করেছিলেন। হেমন্তে পাকা ধানে উঠোন ভরার স্বপ্ন ভর করেছিল চোখে।   সেই স্বপ্ন এখন ফিকে হয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘ধানের আশা-ভরসা শেষ। ভাটার সময় পানি কমছে আবার জোয়ারে পানি বাড়ছে। নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে মিলেমিশে চলছে আমাদের জীবন। সরকারিভাবে এখনো বাঁধ রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে গ্রামবাসীর উদ্যোগে বাঁধ রক্ষায় কাজ করেও বাঁধ টিকিয়ে রাখতে পারিনি। ’

এলাকাবাসী জানায়, এর আগে গত ১৭ জুলাই ভোরে চরামুখার এই বাঁধের প্রায় দেড় শ মিটারের মতো ধসে নদীতে বিলীন হয়। দুই দিন পর হাজার হাজার মানুষের সম্মিলিত চেষ্টায় ভাঙা স্থানে রিংবাঁধ দিয়ে পানি আটকানো সম্ভব হয়। এরপর গত (১৩ আগস্ট) শনিবার দুপুরে উচ্চ জোয়ারে ওই রিংবাঁধের ৫০ ফুটের মতো ভেঙে গিয়েছিল। তাত্ক্ষণিকভাবে স্থানীয় কয়েক শ মানুষের চেষ্টায় তা মেরামত করা হয়। তবে নদীর পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল শতাধিক মাছের ঘের। সেই বাঁধটি আবারও রবিবার ২০০ মিটারের মতো ভেঙে যায়।

বারবার একই স্থানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাফিলতিকেই দুষছে স্থানীয় লোকজন। তাদের দাবি, এক মাস আগে রিংবাঁধ দেওয়া হলেও সেটি রক্ষণাবেক্ষণ বা মজবুত করার কোনো ব্যবস্থা করেনি পাউবো কর্তৃপক্ষ। এ কারণে দুর্বল বাঁধ আবারও ভেঙে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মিলন হোসেন বললেন, ‘নিজেদের বাঁচার তাগিদে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতে অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা। তবে কিছু মানুষ আর বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে চাইছেন না। তাঁদের ভাবনা, শ্রম তাঁরা দিলেও পয়সা তো ঠিকই চলে যাবে পাউবোর ঠিকাদারের পকেটে। পাউবোর পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত সরঞ্জাম পাচ্ছেন না তাঁরা। বাঁধ মেরামতের জন্য যে বস্তা, বাঁশ, পেরেক ও দড়ি দরকার হয় সেগুলোও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ইউনিয়নে মানুষের বাড়ি-ঘরে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ  আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে বসবাস করছে উঁচু বাঁধের ওপরে খোলা আকাশের নিচে।

বাঁধ ভেঙে চরামুখা গ্রামের বিপুল মণ্ডলের বসতঘরে হাঁটুপানি উঠেছে। তিনি বললেন, আশপাশের সবার বাড়িতেই পানি উঠেছে। তারা সবাই মিলে গরু-ছাগল উঁচু বাঁধের ওপর রেখে এসেছে।

দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ওসমান গনি কালের কণ্ঠকে বলেন, গত রবিবার দুপুরের জোয়ারে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর সবার চেষ্টায় আজ আবার তা মেরামত করা হয়। কিন্তু দুপুরের জোয়ারের পানির উচ্চতা এতটাই বেশি ছিল যে ওই বাঁধ আর টেকেনি। তিনি আরো বলেন, বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে দক্ষিণ বেদকাশী, চরামুখা, হলুদবুনিয়া, বীণাপাণি, পদ্মপুকুরসহ ১০টির বেশি গ্রামে। প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে আবারও সবাইকে নিয়ে বাঁধ মেরামতের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ‘স্বাভাবিক জোয়ারের তুলনায় নদীর পানি অনেক বৃদ্ধি হচ্ছে। এ কারণে দক্ষিণ বেদকাশীর যে বাঁধটি মেরামত করা হচ্ছিল, তা আবার ভেঙে যায়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে বিভিন্ন টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছি। স্বেচ্ছাশ্রমে রিংবাঁধ মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। দরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যবস্থা গ্রহণ। ’

পাউবোর সাতক্ষীরা বিভাগ-২-এর আওতায় থাকা বিভাগের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহনেওয়াজ তালুকদারের কাছে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রথম বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর রিংবাঁধ দেওয়া হয়। কিন্তু সেটি মজবুত করা যায়নি। সেখানে মাটির মান খুব বেশি ভালো নয়। তা ছাড়া জোয়ার-ভাটার কারণে বেশি সময় কাজ করা যায় না। এ কারণেই মূলত বাঁধটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আপাতত পানি প্রবেশ বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর রিংবাঁধ মজবুতের চেষ্টা করা হবে।

বরগুনার বেতাগী উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে তিনটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়েছে শতাধিক পরিবার। গত রবিবার রাতে পাউবোর এই বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এরপর একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়। গতকাল দুপুর পর্যন্ত উপজেলার কেওড়াবুনিয়া, গাবুয়া ও ছোট মোকামিয়া গ্রাম প্লাবিত হয়।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)

 



সাতদিনের সেরা