kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

অবশেষে ডালিমের বাবার নামে করা বিদ্যালয়ের নাম বদলের আবেদন

জাহিদ হাসান সাকিল, সাভার   

১৫ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অবশেষে ডালিমের বাবার নামে করা বিদ্যালয়ের নাম বদলের আবেদন

কুমিল্লায় বেড়ে উঠলেও বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি শরিফুল হক ডালিমের গ্রামের বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলায়। আবার কেরানীগঞ্জের সীমানাঘেঁষে ঢাকার সাভার উপজেলায় আছে তাঁর বাবার নামে একটি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক স্কুল। সম্প্রতি এই স্কুলটির নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি। কেরানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের এক ইউনিয়ন কমিটির সহসভাপতি হয়েছেন ডালিমের ফুফাতো ভাই।

বিজ্ঞাপন

ডালিমের বাবার নাম শামসুল হক। সাভারের ভাকুর্তা ইউনিয়নে মুশুরীখোলা চৌরাস্তা মোড় থেকে সামনে যেতেই হাতের ডানে ‘মুশুরীখোলা শামসুল হক উচ্চ বিদ্যালয়’। এর পাশে আছে মুশুরীখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

১৯৬৮ সালে গ্রামের বাসিন্দা তৎকালীন সিআইডি কর্মকর্তা ইমান আলী পতিতা পল্লীর জমি স্কুল করার জন্য ব্যবস্থা করে দেন। প্রাইমারি স্কুলের জন্য ৩২ শতাংশ ও উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য প্রায় ২০০ শতাংশ জমি দেন তিনি। এই ইমান আলীর ছোট বোনের স্বামী শামসুল হক। স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন ইমান আলী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তারপর ছিলেন তাঁর ছেলে লুত্ফুল কবির। এর মধ্যে একবার শামসুল হকের মেয়ে মহুয়ার নাম কমিটির সভাপতি পদের জন্য প্রস্তাব করলে স্থানীয়দের বাধার মুখে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২১ সাল থেকে কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি সাভার ভাকুর্তা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগেরও সভাপতি।

উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, ১৯৮৫ সালে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এমপিওভুক্ত হন। শুরুতে এটি টিনের ঘর ছিল।

স্কুলে এসেছিলেন ডালিম : শামসুল হক মারা যাওয়ার দুই বছর পর ১৯৮৪ সালে ডালিম এই স্কুল মাঠে বাবার কুলখানির আয়োজন করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই কামরুল হক স্বপন। দুই-আড়াই ঘণ্টা থেকে তাঁরা খাবার বিতরণ করে চলে যান। সে সময়ে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র এস এম নজরুল ইসলাম এখন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে প্যাকেট করা খাবার বিতরণ করেছিল তাঁরা। এরপর আর কখনো এই এলাকায় দেখা যায়নি ডালিমকে। ’

নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ : কাগজপত্রে দেখা যায়, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি উচ্চ বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব পাস হয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায়। ১৯ ফেব্রুয়ারি আরেক সভায় কমিটি এর নাম ‘মুশুরীখোলা উচ্চ বিদ্যালয়’ করার প্রস্তাব পাস করে। প্রধান শিক্ষক এস এম নজরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার।

জানা গেছে, ২০২০ সালেও একবার নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন বিদ্যালয়টির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিল্লাল হোসেন। তখন কমিটির ১১ সদস্যের মধ্যে মাত্র তিনজন নাম পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেন। ফলে থেমে যায় নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান কমিটির সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন ও প্রধান শিক্ষক এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, সে সময় কমিটিতে বিএনপির মতাদর্শের লোকজন সদস্য ছিলেন। ফলে প্রস্তাব পাস হয়নি।

বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র সারুফ হোসেন বলেন, ‘আমরা তেমন কিছু জানি না। শুধু জানি, মেজর ডালিম খুন করছে। তাই স্কুলের নাম বদলালে ভালো হয়। ’ প্রধান শিক্ষক এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই নাম নিয়ে বিব্রত। খারাপ প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের মনের ওপর।

স্থানীয় বাসিন্দা নবীন হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের আত্মস্বীকৃত খুনির বাবা নামে বিদ্যালয় আছে। এটা মনে হলে লজ্জা লাগে। ’ জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এরই মধ্যে নাম পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। ঢাকা জেলা প্রশাসক নিজেও বিষয়টি তদারকি করছেন। আশা করছি, দ্রুত নতুন নাম পাবে বিদ্যালয়টি। ’

ডালিমের গ্রামের বাড়ি কানার চর : বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি শরিফুল হক ডালিমের বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার হজরতপুর ইউনিয়ের ১ নম্বর ওয়ার্ডে কানার চর গ্রামে। বাবার চাকরির সূত্রে তিনি বড় হয়েছেন কুমিল্লায়। লেখাপড়াও করেছেন সেখানকার স্কুল-কলেজে। গত বুধবার (১০ আগস্ট) বিকেলে ওই গ্রামে গিয়ে জানা যায়, ডালিমের পরিবার এলাকায় মাতবর বংশ নামে পরিচিত। বর্তমানে সেখানে তাদের বংশের ১৫ থেকে ২০টি পরিবারের বসবাস। ঢাকা থেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ মডেল থানার হজরতপুর ইউনিয়নের আলীপুর ব্রিজ পার হলেই কানার চর। সড়কের দুই পাশে ঘর-বাড়ি দোকানপাট। অপরিচিত মুখ দেখে কৌতূহলী হন অনেকে। একজনের সঙ্গে কথা বলার সময় এগিয়ে আসেন কয়েকজন। কিন্তু ডালিম পরিবারের বিষয়ে জানতে চাইলে আচরণ বদলে যায় তাঁদের। কথা বলতে চান না।

গ্রামের বয়স্ক ব্যক্তি সাবেক মেম্বার আবদুল ওয়াদুদ। তিনি বংশের সম্পর্কে মেজর ডালিমের চাচা। ডালিমের পরিবারের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাঁর পাশে থাকা মধ্য বয়সী একজন রুক্ষ গলায় বললেন, ‘তাদের কেউ এখানে নেই। ডালিম ভাইয়ের ভাই-বোন ঢাকায় থাকে। তাগো জিজ্ঞেস করেন। ’ নিজের পরিচয় দিতে চাননি তিনি। শুধু বলেন, ‘আমিও মাতবর বংশের লোক। ’

পরদিন মুঠোফোনে আব্দুল ওয়াদুদ মেম্বারের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মেজর ডালিমের বাবা শামসুল হক দুই বিয়ে করেছেন। প্রথম পক্ষের সন্তান ডালিম, তাঁর ছোট ভাই কামরুল হক স্বপন ও বোন মহুয়া হক। শামসুল হক দ্বিতীয় বিয়ে করেন ময়মনসিংহে। সেই ঘরে আছে দুই মেয়ে। এই গ্রামে তাঁদের তেমন যাতায়াত ছিল না। ডালিম থাকতেন ঢাকায়।

আব্দুল ওয়াদুদ জানান, শামসুল হক ছিলেন মৎস্য কর্মকর্তা। তবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। পরে ১৯৭৯ সালে তখনকার ঢাকা-১১ আসন (কেরানীগঞ্জ এলাকা) থেকে বিএনপির হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে শামসুল হক মারা যান। আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায় আমাদের বংশের সবাই মেজর ডালিমকে ঘৃণা করে। ’

কেরানীগঞ্জের হজরতপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মিজানুর রহমান বলেন, ‘তাদের বংশের লোকেরা এখানে থাকলেও মেজর ডালিমের পরিবার এখানে কখনো আসছে বলে শুনিনি। তার ছোট ভাই কামরুল হক স্বপন সম্পত্তি বিক্রি করেছে বলে শুনেছি। মেজর ডালিমের কোনো সম্পত্তি আছে কি না বা বিক্রি করেছে কি না তা জানা নেই। তবে বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা তাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে আসে। ’

ডালিমের ফুফাতো ভাই আওয়ামী লীগের কমিটিতে : মাস তিনেক আগে কেরানীগঞ্জের হজরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটিতে সহসভাপতির পদ পেয়েছেন ডালিমের ফুফাতো ভাই আরিফুল ইসলাম সেলিম। হজরতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সাবেক আওয়ামী লীগের নেতা আনোয়ার হোসেন আয়নাল বলেন, ‘সেলিমের বাবা আব্দুল রশিদ ছিলেন এই ইউনিয়নের বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আমি ১৮ বছর এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলাম। যাদের হাতে নিযাতিত হয়েছি, সেই সেলিম এখন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। এর চেয়ে কষ্ট আর কিছু নেই। ’

মেজর ডালিম কোথায় : বঙ্গবন্ধু হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ খুনির ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। একজনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে পলাতক অবস্থায় বিদেশের মাটিতে। দুজন অবস্থান করছেন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু মেজর ডালিমসহ বাকি তিনজন ঠিক কোন দেশে রয়েছে, তা অজানা। সর্বশেষ তথ্য মতে, বঙ্গবন্ধুর পলাতক পাঁচ খুনির একজন কানাডা ও একজন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। মিথ্যা তথ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন রাশেদ চৌধুরী। কানাডায় আশ্রয়ে আছেন এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী ওরফে নূর চৌধুরী। অন্য তিন খুনি সাবেক সেনা কর্মকর্তা খন্দকার আবদুর রশীদ, শরিফুল হক ডালিম ও মোসলেমউদ্দিন সম্পর্কে কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।



সাতদিনের সেরা