kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্মশতবর্ষ

আধুনিক মননের রূপকার

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

১৫ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আধুনিক মননের রূপকার

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। ছবি : সংগৃহীত

আধুনিকতা কথাটা এই সময়ে অনেকটাই বিতর্কিত, বিশেষ করে উত্তরাধুনিকতা যখন এর নানান বিশ্বাস ও চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং উত্তর-উপনিবেশী চিন্তা এর পশ্চিমকেন্দ্রিকতা, উপনিবেশবাদ ও পুঁজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কাঠগড়ায় তুলেছে। কিন্তু শিল্প ও সাহিত্যে আধুনিকতাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কারণ এজরা পাউন্ড যেভাবে একে একটা স্লোগানের ভেতর ফেলে ব্যাখ্যা করেছেন, সেই বিবেচনায় : ‘নতুন করে দেখাও’ (মেইক ইট নিউ)। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা এসেছে বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে; কিন্তু এর নগরকেন্দ্রিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক মাত্রাটি সফলভাবে ব্যাখ্যা ও প্রকাশ করেছেন কল্লোল যুগের কবিরা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যাঁরা সাহিত্য সাধনা করেছেন, তাঁদের প্রায় সকলে। বাংলাদেশের সাহিত্যে পঞ্চাশের দশকে এর সূত্রপাত এবং এই আধুনিকতাকে যিনি সফলভাবে তাঁর সাহিত্যে ধরে রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে যে কটি নাম আসবে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁদের একজন।

বিজ্ঞাপন

বলা যায়, তিনি গল্প-উপন্যাসে একজন পথিকৃতের ভূমিকাতেই নেমেছিলেন। তিনি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্যকে নতুন করে দেখেছেন, শৈলীর নতুন বিন্যাস সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হাতে আমাদের সাহিত্যের অনেক কিছুই নতুন হয়েছে।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর আজ শততম জন্মদিন। দিনটি আমাদের সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনে তাঁকে আমরা স্মরণ করব বাংলা সাহিত্যের একটি দার্শনিক অবস্থান তৈরি করার জন্য, সফলভাবে এই সাহিত্যে অস্তিত্ববাদ ও চেতনাপ্রবাহ পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য এবং বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের একটি ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ পাঠ উপহার দেওয়ার জন্য। তবে সেসব নিয়ে কিছু বলার আগে তাঁর আধুনিক অবস্থানটি চিহ্নিত করা যাক।

আধুনিকতার সাহিত্যিক ও শিল্পগত রূপটি পশ্চিম থেকে এসেছে, এ ব্যাপারে সাধারণ ঐকমত্য আছে; কিন্তু প্রতিটি সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আধুনিকতা আছে। সেই আধুনিকতা মাটি থেকেই উৎপাদিত হয়, যদিও নগরায়ণ, শিল্পায়ন ইত্যাদি কারণে পশ্চিমের একটা প্রভাব সেখানে থেকে যায়। আবার কোনো কোনো লেখক, কবি ও নাট্যকার পশ্চিমের আধুনিকতার আলোকে নিজেদের আধুনিকতাকে সাজান। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পশ্চিম থেকেই আধুনিকতার পাঠটি গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু শিগগিরই তিনি এর প্রয়োগ আমাদের সংস্কৃতি ও জনজীবনে করেছেন। ফলে অস্তিত্ববাদ বলি অথবা চেতনাপ্রবাহ পদ্ধতি, কোনোটিই পশ্চিমের অনুকরণ হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি পশ্চিম থেকে ধারণা ও জ্ঞানটুকু নিয়েছেন, হয়তো এগুলোর প্রকাশ বিশিষ্টতাও; কিন্তু এদের প্রয়োগ তিনি করেছেন বাংলাদেশের প্রকৃতিঘনিষ্ঠ মানুষের জীবনে। ফলে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের বর্ণনাভঙ্গিতে, চরিত্রদের (বিশেষ করে মোস্তফার) অন্তর্জগৎ উন্মোচনে চেতনাপ্রবাহের যে বিস্তার তিনি ঘটিয়েছেন, তাতে মোস্তফার প্রতিটি মুহূর্ত, ঘটনাপ্রবাহের প্রতিটি বাঁক ফেরা পাঠকের অভিজ্ঞতার সমান্তরাল। পাঠক মোস্তফাকে দেখেছে, খদিজাকেও দেখেছে—তারা তাদের পরিচিত পৃথিবীর মানুষ। কিন্তু তাদের মুহূর্তগুলো, অনুভূতি-বোধ ও চৈতন্য এক দুর্লভ সমীকরণে অনেক মাত্রায় একসঙ্গে ছড়িয়ে থাকে। তেমনি অস্তিত্ববাদের মূলে যে দ্বন্দ্ব অস্তিত্ব ও স্বয়ংবোধের, অর্থাৎ মানুষের একান্তবোধের মধ্যে, তার নিষ্পত্তি যে রকম ওয়ালীউল্লাহ করেছেন, তাতেও পশ্চিমা কোনো আবহ নেই, সম্পূর্ণটাই গ্রামবাংলার আবহে লালিত। একটি ছোটগল্পে অস্তিত্ববোধের প্রকাশটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ। ‘মাঝি’ গল্পের মাঝি মনির একটা ঝড় আসন্ন হলে যাত্রীদের তার নৌকায় উঠতে মানা করে, যেহেতু তার বাবা ঝড়ের মধ্যে পড়ে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু যাত্রীদের ভয় কম। তারা নৌকায় উঠে পড়ে। কিন্তু নদী পার হতে গিয়ে মাঝনদীতেও যখন ঝড় আসে না, মনির এক অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। তার ভয় যদি মিথ্যা হয়, যাত্রীদের কাছে তার মুখ রক্ষা হয় না। তারা মনিরকে নাকচ করে দেবে। কাজেই সে তার একান্ততাকে (অর্থাৎ অব্যর্থ ভবিষ্যদ্বাণী দিতে পারা একজন মানুষ হিসেবে তার অবস্থানটি) রক্ষার জন্য খোদার কাছে একটা প্রার্থনা করে, ঝড় কি আসবে না? কেন আসবে না?

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কোনো উপন্যাস পড়ার আগে আমি তাঁর গল্পগুলো পড়েছি। গল্পগ্রন্থ তো মাত্র দুটি, ‘নয়নচারা’ এবং ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প’। কিন্তু প্রতিটি গল্পই তাঁর প্রকাশ বৈশিষ্ট্যে, গল্পরেখার সফল বিন্যাসে, চরিত্রায়ণের কুশলতায় এবং ভাষার বলিষ্ঠ ব্যবহারে অনুপম, ‘পাগড়ী’ গল্পটিই আমি প্রথম পড়েছি। তাতে আয়রনি ও বক্রোক্তির মাধ্যমে এবং রসবোধের পরিমিত ব্যবহারে ওয়ালীউল্লাহ দেখিয়েছেন, শ্রেণির শাসনে মানুষের দয়ামায়াতেও পক্ষপাত দেখা দেয়। অত্যন্ত মানবিক এই গল্পটির পর যখন তাঁর ‘নয়নচারা’, ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’, ‘স্তন’, ‘গ্রীষ্মের ছুটি’, ‘না কান্দে বুবু’ এবং ‘রক্ত ও আকাশ’ পড়লাম, আমার মনে হলো কথাসাহিত্যে তিনি তাঁর সময়ে ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর অধিকাংশ গল্প, ‘লালসালু’ বা ‘কাঁদো নদী কাঁদো’র মতো গ্রামীণ পরিবেশে স্থাপিত। গ্রামের জীবনে সারল্য আছে, কুটিলতা আছে, মৃত্যু আছে, আনন্দ আছে। অর্থাৎ আধুনিক সাহিত্য যে স্থানটাকে স্বস্তি নিয়ে ব্যবহার করে না, অর্থাৎ গ্রাম, ওয়ালীউল্লাহ তাকেই বেছে নিয়েছেন হয়তো এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠা দিতে যে স্থান নয়, অস্তিত্বের প্রকাশ হয় সময়ে, চেতনায় এবং মানুষে-মানুষে ও মানুষে-প্রকৃতির সংযোগে। গ্রাম বা শহর—মানুষের চেতনাপ্রবাহের চিহ্নগুলো দুই জায়গাতেই প্রকাশ্য।

চরিত্র-চিত্রণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন সত্যিকার কুশলী। এর একটি প্রধান কারণ এই যে, দ্বন্দ্বের অনেক রূপ তিনি জানতেন, একেবারে সামাজিক থেকে নিয়ে গভীর মনস্তাত্ত্বিক। শিল্পকলা, চলচ্চিত্র ও নাটক নিয়ে তাঁর আগ্রহ ও অভিনিবেশ থেকে তিনি চিন্তার, সৃষ্টিশীলতার এবং প্রকাশের বিবর্তনগুলো সম্পর্কে জানতেন। একই সঙ্গে আধুনিক সাহিত্যে দেখা ও দেখানোর নানা উপায় এবং সেগুলোর ভেতর সমন্বয় সাধনের যে বিষয়টি আছে, তিনি তা বিশেষভাবে অবগত ছিলেন। তাঁর ছোটগল্পে, ‘চাঁদের অমাবস্যা’ অথবা ‘কাঁদো নদী কাঁদো’তে সেসব চমৎকারভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর হাতে আধুনিকতা একটা দেশীয় এবং পরিচিত সাংস্কৃতিক আবহে প্রকাশ পেয়েছে।

জন্মশতবর্ষে এই জীবনঘষা শিল্পীকে অভিবাদন।

 



সাতদিনের সেরা