kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ অক্টোবর ২০২২ । ২১ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সারের জন্য কৃষকের হাহাকার

পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি   

১১ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সারের জন্য কৃষকের হাহাকার

পঞ্চগড়ে সার পেতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন আমন চাষিরা। পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না সার। ডিলারদের মাধ্যমে সার পেতে রীতিমতো কাড়াকাড়ি করতে হচ্ছে। আবার কৃষকের ভিড় সামাল দিতে কখনো মোতায়েন করা হচ্ছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকরা। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে অনেক কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পঞ্চগড়ে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সার ডিলারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা যায় এক হাজার ১০০ টাকায়, খোলাবাজারে যা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩০০ টাকা। একইভাবে এমওপি সারের বস্তা সরকার নির্ধারিত মূল্য ৭৫০ টাকা হলেও খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ টাকা। টিএসপি সার ডিলার বিক্রি করছে এক হাজার ১০০ টাকা, খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮০০ টাকা। ডিএপি সার ডিলারের কাছে পাওয়া যায় ৮০০ টাকায়, খোলাবাজারে যা এক হাজার ১০০ টাকা।

খোলাবাজারে সার কিনতে চড়া দাম দিতে হয় বলে কৃষকরা ভিড় জমিয়েছেন ডিলারের কাছে। কিন্তু ডিলারের কাছে পর্যাপ্ত সার না থাকায় এই কাড়াকাড়ি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। নিরুপায় কৃষকের খোলাবাজার থেকে সার সংগ্রহ করতে বস্তাপ্রতি বাড়তি গুনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমন মৌসুমের শুরু থেকে পঞ্চগড়ে সারের এই সংকট। কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, জেলায় আগস্ট মাসে আট হাজার ৬৯০ মেট্রিক টনের বিপরীতে চার হাজার ৯৯৭ মেট্রিক টন ইউরিয়া, এমওপি চার হাজার ৩১৩ মেট্রিক টনের বিপরীতে ৮৯৩ মেট্রিক টন, টিএসপি দুই হাজার ৫৬২ মেট্রিক টনের বিপরীতে ৭৩৫ মেট্রিক টন এবং ডিএপি দুই হাজার ২৩০ মেট্রিক টনের বিপরীতে ৬৭৯ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পঞ্চগড়ে প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে রয়েছে চা বাগান। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়ায় চায়ের জন্য আলাদা করে সারের বরাদ্দ নেই। এ পরিস্থিতিতে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হলেও সেখান থেকে সারের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে চা চাষিদের কাছে। ফলে সংকট আরো বেড়েছে।

ডিলারদের মাধ্যমে সার পেতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন চাষিরা। পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকের ভাগ্যে মিলছে না সার। সার সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটছে। গত কয়েক দিনে পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট, টুনিরহাটসহ বেশ কিছু স্থানে সার নিতে চাষিদের উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে করতে হচ্ছে পুলিশ মোতায়েন।

টুনিরহাট এলাকার চাষি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সার পাইনি। সার কিনতে গিয়ে কাড়াকাড়ি অবস্থা। মারামারিও হচ্ছে। এভাবে আমাদের পক্ষে আমন আবাদ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ’

একই এলাকার চাষি মহিম উদ্দিন বলেন, ‘লাইনে দাঁড়িয়ে খুব কষ্ট করে সার নিতে হচ্ছে। তা-ও আবার এক বস্তার বেশি দেয় না। আমন ধান রোপণের পরে এখনো সার দিইনি। সারের এমন সংকট হবে কল্পনা করিনি। আমন চাষের যে এবার কী হবে বলতে পারছি না। ’

পঞ্চগড় বিএডিসির সার ডিলার এ কে এম রেজাউল করিম বলেন, ‘চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। যে পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি চাহিদা রয়েছে। ফলে সার বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছি। ’

পঞ্চগড় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামাল হোসেন সরকার বলেন, ‘আমরা এক বস্তা করে সার দিচ্ছি। পাশাপাশি কৃষকদের অতিরিক্ত সার ব্যবহার করতে নিরুৎসাহ করছি। ডিলাররা একসঙ্গে সার আনলে এমন ভিড় হতো না। ’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক শাহ মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে এমওপি সারের কিছুটা সংকট রয়েছে। এরই মধ্যে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছি। আশা করছি দ্রুতই সার সংকট কেটে যাবে। ’

সারের দাম বাড়ায় ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকরা বিপাকে

সারের দাম বাড়ায় ফসল (খাদ্যশস্য ও সবজি) উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে বলে দুশ্চিন্তায় ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকরা। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে অনেক কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা সালান্দর এলাকার কৃষক মোত্তালেব হোসেন বলেন, ‘কীটনাশকের পর সারের দাম বৃদ্ধিতে খাদ্যশস্য ও সবজি উৎপাদনে চাপের মুখে পড়েছি। চলতি আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। কারণ কিছুদিন আগে এক বিঘা জমি হালচাষ করতে খরচ হতো ৮০০ টাকা। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই জমি হাল দিতে এখন খরচ হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা। তার ওপর বৃষ্টি না হওয়ায় বাড়তি সেচ দিতে প্রতিঘণ্টায় খরচ হচ্ছে ৩০০ টাকা। এ ছাড়া রয়েছে চারা রোপণের কামলা খরচ, সার, কীটনাশক, নিড়ানি, কাটা ও মাড়াই খরচ। সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ। এরপর জমিতে কী পরিমাণ ফসল হবে, তা বলাও সম্ভব নয়। লাভ তো দূরের কথা, এ বছর উৎপাদন খরচ ওঠানো সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ’

জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক যামিনী বর্মণ বলেন, ‘বলা নেই কওয়া নেই, সরকার হুটহাট সার, কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। ’ 

 



সাতদিনের সেরা