kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বাসের নতুন ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন

সজিব ঘোষ   

৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাসের নতুন ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন

দেশে ৯ মাসের মধ্যে দুই দফা বাসের ভাড়া বেড়েছে। দুইবারই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে। তবে বাসের ভাড়া শুধু জ্বালানির ওপর নির্ভর করে না। ভাড়া নির্ধারণের সময় মূলত বাসের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এই ব্যয়ের সঙ্গে মালিকদের মুনাফা যোগ করে ভাড়া ঠিক করা হয়।

এবার আন্ত জেলা ও দূরপাল্লায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসে প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীপ্রতি সর্বোচ্চ ভাড়া ১.৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২.২০ টাকা করা হয়েছে। আর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২.১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২.৫০ টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, এই ভাড়া অযৌক্তিক। তাদের হিসাবে দূরপাল্লার ক্ষেত্রে ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে হওয়া উচিত ১.৫০ টাকা আর মহানগরে ১.৮০ টাকা।

তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বলছে, যে পরিমাণ ভাড়া সমন্বয় করার দরকার ছিল তার থেকে অনেক কম ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাসভাড়া নির্ধারণের যে কমিটি করা হয়, পদাধিকারবলে সেই কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান। সেই কমিটিতে বাস চালানোর খরচের ধারণা উপস্থাপন করেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা।  কমিটি সেই ব্যয় বিশ্লেষণ করে। সেই ব্যয়ে প্রথমে দেখা হয় বাসের মান। নতুন বাস হলে মালিকরা চাইলে ব্যাংক সুদও যুক্ত করতে পারেন। সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বছরে দুটি উৎসব ভাতা। দূরপাল্লার বাসে তিনজন ও মহানগরের বাসে চারজন করে শ্রমিক হিসাব করা হয়। এরপর যুক্ত হয় জ্বালানি খরচ। এ ছাড়া বাসের টায়ার-টিউবের খরচ, গ্যারেজভাড়াসহ মোট ১৮টি বিষয় যুক্ত করে বাসের মোট খরচ ঠিক করা হয়।  সব বিষয় যুক্ত করে ব্যয় বিশ্লেষণ করে কমিটি। তবে এই ব্যয় বিশ্লেষণ প্রকাশ করে না বিআরটিএ। ফলে ব্যয় বিশ্লেষণ কতটা সঠিক হলো তা যাচাই করার সুযোগ থাকে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভাড়া নির্ধারণের সময় এই খরচগুলো বেশি করে দেখানো হয়। আবার একটি বাস চলাচলের সময় ৩০ শতাংশ আসন খালি থাকবে—এমনটি বিবেচনা করা হয়।

এবারের বাসভাড়া নির্ধারণ কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বছরে বাসের মেরামতে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ে দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা। সংস্কারে ব্যয় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। বছরে টায়ার-টিউবের পেছনে খরচ ধরা হয়েছে তিন লাখ ১২ হাজার টাকা। শ্রমিকের বেতন ধরা হয়েছে মাসে ৬০ হাজার টাকা।  সব মিলিয়ে দূরপাল্লার বাসের বছরে ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ২৩ টাকা খরচের হিসাব দেখানো হয়। সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৭ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯২ টাকা।

আর মহানগরের একটি বাস কেনায় বিনিয়োগ, মবিল, যন্ত্রাংশ, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, বেতনসহ বছরে খরচ ২৩ লাখ ১৪ হাজার ৮৪৮ টাকা। সেই সঙ্গে জ্বালানি বাবদ আরো ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ ধরা হয়েছে।

এই হিসাবের সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এই সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাসের ভাড়া নির্ধারণের সময় পুরনো লক্কড়ঝক্কড় বাসকে শোরুম থেকে নামানো নতুন বাসের দামে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকসুদ ও অন্যান্য নতুন বাসের সুযোগ-সুবিধা ধরে ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অথচ সিটি সার্ভিসে ৯৮ শতাংশ বাস-মিনিবাস চলাচলের অযোগ্য। আন্ত জেলায় দূরপাল্লার ৪৮ শতাংশ বাস ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। এসব বাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে অভিযোগ করেন তিনি।  মোজাম্মেল হক আরো বলেন, এই মানের বাসে এত ভাড়া হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর পরিবহন শ্রমিকদের বেতন-ভাতার কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই। তাঁদের উৎসব ভাতা দেওয়া হয় না।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিবের মতে, এবার যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অযৌক্তিক। দূরপাল্লায় কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া হওয়া উচিত ১.৫০ টাকা আর মহানগরে ১.৮০ টাকা।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাড়া নির্ধারণ কমিটির অন্যতম সদস্য বিআরটিএর পরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, বাসের পরিচালন, ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি খরচ হিসাব করেই মোট খরচ ধরা হয়। প্রকৃত খরচ যাচাই-বাছাই করেই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাস মালিকদের ধরা খরচ এবং নতুন ভাড়া প্রসঙ্গে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, বাসের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে খরচ ধরা হয়েছে, এর পুরোটাই মালিকদের লাভ থেকে যাবে। এ জন্যই ঢাকায় চলা বাসে ফিটনেস নেই। তিনি বলেন, ভাড়া নির্ধারণের সময় সরকারের কিছুই করার থাকে না। সরকার বাস মালিক-শ্রমিকদের ধর্মঘটকে ভয় পায়।

যদিও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব কিছু মিলিয়ে গাড়ির সরঞ্জামের খরচ ৩০ শতাংশের মতো বেড়ে গেছে। আর এর মধ্যে ৪২.৫ শতাংশ বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। আমরা যাত্রীদের কথা বিবেচনা করে অনেকটা ছাড় দিয়ে নতুন ভাড়ার সঙ্গে একমত হয়েছি। ’ 

যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা এসব কথা বলেন। এসব তথ্যের উৎস কোথায়। কেউ যদি পত্রিকায় নিজেকে হাইলাইট করার জন্য এসব কথা বলে থাকেন তাহলে কিছু বলার নেই। ’

এদিকে রাজধানীতে চলাচল করা বাসগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যাত্রীরা। সূত্রাপুরের কাঠেরপুল থেকে গুলিস্তান বাসস্ট্যান্ডের দূরত্ব ৩.১ কিলোমিটার। এই দূরত্বে ভাড়া দাঁড়ায় ৭.৭৫ টাকা। কিন্তু সর্বনিম্ন ভাড়া যেহেতু ১০ টাকা, তাই যাত্রীকে এই পথের জন্য ভাড়া বাবদ অন্তত ১০ টাকা দিতেই হবে। কিন্তু মালঞ্চ পরিবহনে নেওয়া হচ্ছে ২৫ টাকা। আবার সূত্রাপুর থেকে শাহবাগের দূরুত্ব সাত কিলোমিটার। এই পথের জন্য ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪০ টাকা। মোহাম্মদপুর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারের জন্য ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫৫ টাকা।  

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘ঢাকা সিটিতে কিছু কিছু অনিয়ম আছে, এটি অতীতেও ছিল। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে ঢাকার সব বাস মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করছি। ’

 

 



সাতদিনের সেরা