kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১১ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২৯ সফর ১৪৪৪

এক যুগ ধরে আলোচনা সম্মত নয় বড় দুুটি দল

কাজী হাফিজ   

৩ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে




এক যুগ ধরে আলোচনা সম্মত নয় বড় দুুটি দল

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে গত ১৭ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপে অন্যতম প্রস্তাব ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশনাল (পিআর) বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু করা। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল এই প্রস্তাব রাখে। এ ধরনের প্রস্তাব কয়েকটি রাজনৈতিক দল আরো আগে থেকেই করে আসছে।    

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল গত ২৮ জুলাই বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (বাংলাদেশ ন্যাপ) এই প্রস্তাব প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি অসম্ভব সুন্দর একটি প্রস্তাব।

বিজ্ঞাপন

আপনারা এসব নিয়ে কথা বলছেন না কেন? সিস্টেম যদি আপনারা প্রয়োগ করতে পারেন, তাহলে আমাদের কাজই করা লাগবে না। ’ গত ৩১ জুলাই জাতীয় পার্টির সঙ্গে সংলাপেও তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে আপনারা গবেষণা করতে পারেন, ওয়ার্কশপ করতে পারেন। ’

স্থানীয় শাসন ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু হলে নির্বাচন নিয়ে অনেক সংকট দূর হতে পারে। এর মাধ্যমে আমরা প্রকৃত অর্থে একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ পেতে পারব। তবে এর জন্য দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একমত হতে হবে এবং নির্বাচনী আইনের সংশোধন আনতে হবে। ’

কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এ ব্যবস্থায় রাজি নয়। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এ ধরনের প্রস্তাব কোনোভাবেই সমর্থন করি না। এটা আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মধ্য দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে অনেকেই নেতৃত্বে আসার সুযোগ পায়। অনেকেই আছেন, যাঁদের জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই; কিন্তু দলের সঙ্গে আঁতাত করে তাঁরা জনপ্রতিনিধি হয়ে যাবেন। আমরা চাই, এ দেশের জনগণ প্রার্থী দেখে ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করুক। ’

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে এখন গণতন্ত্র নেই, ভোটাধিকার নেই। যেখানে গণতন্ত্রই সংকটে, সেখানে এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। আগে দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসুক। জনগণের সরকার গঠন করুক। তারপর এসব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এখন এসবের কোনো সুযোগ নেই। বিএনপি নেতাদের মধ্যে এ সব ভাবনাও নেই।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা কী : ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের ৪০.৮৬ শতাংশ পেয়ে বিএনপি আসন পেয়েছিল ১৯৩টি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ৪০.২১ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৬২টি আসন পেয়েছিল। অথচ দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনব্যবস্থায় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু থাকলে ফল হতো ভিন্ন। এ ব্যবস্থায় ওই নির্বাচনে বিএনপি ১২২টির কাছাকাছি আর আওয়ামী লীগ কমপক্ষে ১২০টি আসন পেত।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে দলগুলোর আসনপ্রাপ্তিতে সামঞ্জস্য ছিল না। ওই নির্বাচনে ৪৮.০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন লাভ করেছিল। অন্যদিকে বিএনপি ৩২.৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় মাত্র ৩০টি। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা বা ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন পদ্ধতি থাকলে বিএনপি আসন পেত কমপক্ষে ৫৭টি।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় ভোটাররা ব্যক্তিকে নয়, দলকে ভোট দেন। দলের ভোটপ্রাপ্তির হারের ওপর ওই দল কত আসন পাবে, তা নির্ভর করে। ইউরোপের প্রায় সব দেশ এবং পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে এই সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা চালু করা হলে নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির দৌরাত্ম্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম কমে আসবে। সেই সঙ্গে একটি দল প্রকৃত অর্থেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারবে বলে মনে করেন অনেক রাজনীতিক ও বিশিষ্টজন। এ ব্যবস্থায় মাত্র কয়েক শতাংশ ভোট কমবেশি হওয়ার কারণে সংসদে আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবধান সৃষ্টি হবে না।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাও কয়েক রকমের। শুধু দলকে ভোট দেওয়া ছাড়াও ‘পার্টি লিস্ট’ পদ্ধতিতেও ভোটাররা দলের প্রার্থী নির্ধারণ করার সুযোগ পান। এ পদ্ধতিতে দলগুলো তাদের প্রার্থী তালিকা দিয়ে দেয়। ভোটাররা দল পছন্দ করার পাশাপাশি দলের কোন প্রার্থীকে চান সেটাও পছন্দ করে দিতে পারেন। অনেক দেশে মিশ্র পদ্ধতিও চালু আছে। এই পদ্ধতিতে মোট আসনসংখ্যার ৫০ শতাংশ নির্বাচিত হয় সাধারণ পদ্ধতিতে, বাকি ৫০ শতাংশ নির্বাচিত হয় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ভোটিং ব্যবস্থায়।

অন্যদিকে দেশে বিদ্যমান ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ ব্যবস্থায় অনেকে বিনা ভোটেই নির্বাচিত হচ্ছেন। কোথাও আবার প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকরও কম ভোট পেয়ে নির্বাচিত হচ্ছেন বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের ভোট না পেয়েও তাদের প্রতিনিধি হতে পারছেন।

আগের সব আলোচনা ও প্রস্তাব : ২০১৫ সালের এপ্রিলে বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম (প্রয়াত) এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের তখনকার উপদেষ্টা (বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য) ইনাম আহমেদ চৌধুরী ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন পদ্ধতির বিষয়ে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন। এইচ টি ইমাম ওই সংলাপে বলেন, ‘এ পদ্ধতি চালু করতে হলে পারিপার্শ্বিক অবস্থার উন্নতি ও সহনশীলতা দরকার। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দরকার, কারণ পদ্ধতিটি খারাপ নয়। ভালো বলেই অনেকে গ্রহণ করেছেন। ’ ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘পদ্ধতিটি চালু করা দরকার। কারণ এখন যারা জেতে তারাই সব নিয়ে নেয়। শুরু হয় বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন। এখানে দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য নেই। সংখ্যানুপাতে প্রতিনিধিত্ব আমাদের দেশেই বেশি প্রযোজ্য। ’

ওই সংলাপে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েনও বলেন, ‘জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে পদ্ধতিটির দিকে এগোতে হবে। ’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নিয়ে ইসি গঠন, নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচনব্যবস্থার আমূল সংস্কারের জন্য ৫৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থা প্রবর্তন। ওই সংলাপে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষেও  সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন পদ্ধতি প্রবর্তন করতে বলা হয়।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সঙ্গে সংলাপেও সিপিবির লিখিত প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, “বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্যতম করণীয় হচ্ছে ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থা প্রবর্তন। এ ব্যবস্থা অনুযায়ী নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত কাজকর্ম সম্পর্কে প্রস্তাবনা-পরিকল্পনা-কর্মসূচি-নীতি বর্ণনা করে রাজনৈতিক দলগুলো দেশবাসীর সামনে নিজ নিজ ইশতেহার উপস্থিত করবে। দেশবাসী এসব ইশতেহারের মধ্য থেকে যে দলের ইশতেহারে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে পাবে, সেই দলের মার্কায় ভোট দেবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সে দল জাতীয় সংসদে সেই সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠাবে। অর্থাৎ মোট আসন যদি ৩০০ হয়, তাহলে কোনো দল ৫০ শতাংশ ভোট পেলে ১৫০টি আসন পাবে। ঐকমত্যের প্রয়োজনে নতুন ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থাও আংশিকভাবে (অর্ধেক আসনে) অব্যাহত রাখা যেতে পারে। সবার মতামতের ভিত্তিতে এই অনুপাত কমবেশিও করা যেতে পারে। এই ব্যবস্থায় সংসদ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির কাজে দলীয় প্রধানের বা নেতৃত্বের কোটারির স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করার জন্য দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা বিধিবদ্ধভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। ’

এবারের সংলাপে সিপিবি অংশ না নিলেও গত ২৮ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিবি  সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি জানায়।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বিকল্প ধারা বাংলাদেশও সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে বলেছিল, ‘এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি, যাঁরা জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম অথচ আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নির্বাচনে অপারগ, তাঁদের রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে আনার সুযোগ পাবে। ’

এরপর ২০১১ সালে  নির্বাচন কমিশনের  সঙ্গে সংলাপে সিপিবি ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল একই প্রস্তাব রাখে। ’

সে সময় তৎকালীন সিইসি এ টি এম শামসুল হুদা এ বিষয়ে বলেছিলেন, ‘এটা হলে নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব কমবে। আবার কিছু অসুবিধাও রয়েছে। আপনারা এ দাবি অব্যাহত রাখেন। একসময় হয়তো বিষয়টি সবার ওপর আছর করতে পারে। ’

 



সাতদিনের সেরা