kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

ক্যাম্পাসের সংগঠনের জাতীয় সাফল্য

জে এম রউফ, বগুড়া   

৩ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্যাম্পাসের সংগঠনের জাতীয় সাফল্য

বগুড়ার শিবগঞ্জের বিহার হাটে ১৪টি গাছে অন্তত আড়াই হাজার অতিথি পাখি শামুকখোল বাসা বেঁধেছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘তীর’ পাখিগুলোর দেখাশোনা করছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

গত ২১ মে ভোরবেলা বগুড়ার ওপর দিয়ে বয়ে যায় প্রচণ্ড ঝড়। ৮৮ কিলোমিটার বেগের মাত্র চার মিনিটের ঝড়ে ভেঙে পড়ে শত শত গাছপালা। মানুষের পাশাপাশি ভুক্তভোগী হয় বহু পাখিসহ বন্য প্রাণীরাও। খবর পেয়েই বেরিয়ে পড়েন বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের একদল শিক্ষার্থী।

বিজ্ঞাপন

তাঁরা বগুড়া শহরের দুটি পৌর পার্ক ও কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন বেশ কিছু পাখি। পাখিগুলোকে চিকিৎসা দিয়ে পরে উড়িয়ে দেওয়া হয় মুক্ত আকাশে।

এর আগে গত জানুয়ারি মাসে বগুড়া শহরের যেখানে-সেখানে কাক মরে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। বিষয়টি আজিজুল হক কলেজের ওই শিক্ষার্থীদের নজরে এলে তাঁরা মৃত কাকের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠান পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষার ফল থেকে জানা যায়, ডাস্টবিনের বিষাক্ত খাবার খেয়ে মরেছে কাকগুলো। পরে অনুসন্ধান করে শিক্ষার্থীরা বের করেন, শহরের এডওয়ার্ড পৌর পার্কের পাশের ডাস্টবিনে ফেলা হয়েছিল সেই বিষাক্ত খাবার। স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালান তাঁরা। এতে কাকের মৃত্যুর মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়নি।

ওপরের দুটি ঘটনা বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের একদল পরিবেশসচেতন তরুণের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকাজের দুটি নমুনা। ১১ বছর ধরে এই কলেজের শিক্ষার্থীরা পরিবেশ ও বন্য প্রাণী তথা জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছেন। এ জন্য তাঁরা গড়ে তুলেছেন ‘তীর’ নামের পরিবেশবাদী এক সংগঠন। তাঁদের আন্তরিক কাজের এবার মিলেছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাঁরা জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সংগঠনের জন্য পেয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন-২০২১’ স্বর্ণপদক। ৪ জুন প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে নিবেদিত সংগঠন পর্যায়ে ‘তীর’-এর সাবেক সভাপতি আরাফাত রহমানের হাতে এই পদক তুলে দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী।

পরিবেশ ও বন্য প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ২০১১ সালে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে গড়ে উঠেছিল শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘টিম ফর এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ’, আদ্যক্ষর থেকে ক্যাম্পাসে যা পরিচিত ‘তীর’ (TEER) নামে।

বগুড়ার কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের কাজ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের আটটি জেলায়। সংগঠনের সদস্য শিক্ষার্থীরা এসব জেলায় গিয়ে পরিবেশ ও বন্য প্রাণী রক্ষায় গঠন করে দেন আঞ্চলিক কমিটি। পলিথিনমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আন্দোলন দিয়ে শুরু করে এখন তীর বন্য প্রাণী, নদী ও জলাধার রক্ষা, সার্বিকভাবে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

১১ বছর ধরে বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে তীর বগুড়া জেলার বিভিন্ন এলাকাসহ গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলে কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটি বিভিন্ন গণসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা, সেমিনার, বন্য প্রাণী উদ্ধার অভিযান পরিচালনা, শিকারে ব্যবহৃত সরঞ্জাম (জাল, ফাঁদ, ধনুক, গুলতি, এয়ারগান) উদ্ধারসহ নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে তীর এ পর্যন্ত অন্তত ২০ প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ, স্তন্যপায়ী ও উভচর বন্য প্রাণী উদ্ধার করেছে। সংখ্যায় তা প্রায় দুই হাজার। আহত ২০০টি বন্য প্রাণীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করেছে সংগঠনটি। তাদের উদ্ধারকৃত উল্লেখযোগ্য বন্য প্রাণীর মধ্যে রয়েছে অজগর সাপ, গন্ধগোকুল, হনুমান, লজ্জাবতী বানর, কচ্ছপ, ভুবন চিল, কালিম পাখি, কুড়া ঈগল, প্যাঁচা, ময়না, শকুন, শামুকখোল পাখি ইত্যাদি। বগুড়া জেলার বিভিন্ন পাখির আবাস ও জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকা, বিশেষ করে যমুনা নদী সংলগ্ন সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার চরাঞ্চল, শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার পাখি কলোনি, শেরপুর উপজেলার রামনগর পাখি কলোনি, শাজাহানপুর পাখি কলোনি, কাহালু পাখি কলোনি এবং ধুনট উপজেলার বিলচাপড়ি পাখি কলোনিতে শিকার রোধে প্রচার-প্রচারণা ও বিলবোর্ড স্থাপনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালায় তীর।

সরকারি আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাসকেও প্রশাসনের সহযোগিতায় তীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার ফলে এখন দিনরাত কলেজ ক্যাম্পাস মুখরিত পাখির কলতানে। সেখানে বিচরণ করে পাখি ছাড়াও কয়েক প্রজাতির বন্য প্রাণী। তীরের সদস্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, তাঁরা প্রতিনিয়ত ক্যাম্পাসে অন্তত ৭৫ প্রজাতির পাখির বিচরণ দেখেন। এর মধ্যে রয়েছে শামুকখোল, কয়েক ধরনের চিল, বসন্তবৌরি, মৌটুসী, ফিঙে, শালিক, বক, মুনিয়া, ঘুঘু ও কাঠঠোকরা। বন্য প্রাণীর মধ্যে কাঠবিড়ালি, বেজি, শিয়াল, গুইসাপ, ঢোঁড়াসাপ নিয়মিতই দেখা মেলে এই ক্যাম্পাসে।

প্রকৃতিকে বাঁচাতে তীর সবুজায়নের দিকেও দিয়েছে নজর। এ পর্যন্ত সংগঠনটি প্রায় পাঁচ হাজার গাছ লাগিয়েছে কলেজ ক্যাম্পাসে। এর মধ্যে দুই হাজার গাছ টিকে আছে এখনো। ক্যাম্পাসে লাগানো গাছের মধ্যে টিকে আছে কাঁঠালিচাঁপা, তাল, চাপালিশ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জলপাই, আমলকী, পাকুড়, বট, জামরুল, পলাশ ও শিমুল।

তীরের সভাপতি রাকিবুল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক রিফাত হাসান জানান, নিজেদের অর্থে ও উদ্যোগে তাঁরা কাজ করছেন। সংগঠনের ২১ সদস্যের নির্বাহী কমিটি ছাড়াও দেড় শ নিয়মিত সদস্য এবং তিন শর বেশি সহযোগী সদস্য আছে।

এর আগে কাজের জন্য রাজশাহী বিভাগীয় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সনদ পেয়েছে তীর। এবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি জয়ে সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বসিত। তাঁদের প্রত্যাশা, এই স্বীকৃতি শিক্ষার্থীসহ তরুণদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উৎসাহ জোগাবে।

কলেজের অধ্যক্ষ শাজাহান আলী বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করতে ক্যাম্পাসভিত্তিক তীর খুবই নিবেদিত। এ কারণে তারা কলেজ ক্যাম্পাসকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করতে বললে সেই দাবিতে কলেজ প্রশাসন একাত্মতা প্রকাশ করে তা বাস্তবায়ন করেছে। একটি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে এমন একটি সংগঠন গড়ে উঠে তার কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া গর্বের বিষয়।



সাতদিনের সেরা