kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ আগস্ট ২০২২ । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১২ মহররম ১৪৪৪

প্রকৃতি

তারাভরা আকাশের টানে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তারাভরা আকাশের টানে

কর্নওয়ালের পোর্থগাওয়ারা বিচে এক তারাভরা রাতে। ছবি : বিবিসি

চাঁদ লুকিয়ে থাকা কোনো কোনো আঁধার রাতে মেঘেরাও দূরে সরে থাকে। চরাচরে তখন থাকে রাতেরই রাজত্ব। ঘনঘোর অন্ধকার আর তারাভরা আকাশই কেবল সঙ্গী হয়ে থাকে। ইংল্যান্ডের কর্নওয়ালের বাসিন্দা কেভিন হিউজেস মাঝে মাঝে এমন রাতে তাঁর বাগানে বসে মখমলের চাদরের মতো কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

বিজ্ঞাপন

লন্ডনে বেড়ে ওঠার সময় কেভিনের শৈশবের রাতগুলো ছিল কমলা সোডিয়াম আলোর ঝলকানিতে ম্রিয়মাণ। এখন কর্নওয়ালের পশ্চিম পেনউইথের গ্রামীণ আবহে তিনি ফিরে পেয়েছেন স্বস্তির তারাভরা আকাশের রাত। আর তা সম্ভব হয়েছে অতি আলোর অত্যাচার থেকে রেহাই পাওয়ার ফলেই।

কর্নওয়াল ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের একটি উপদ্বীপ, যা আটলান্টিক মহাসাগরের কিছুটা ভেতরে ঢুকে আছে। কেভিনের বাড়ি কর্নওয়ালের ওয়েস্ট পেনউইথ এলাকাটি এর রুক্ষ ঘেসো জমি, গ্রানাইট পাথরের কাঠামো আর রহস্যময় পাথরের বৃত্তের জন্য সুপরিচিত। অন্ধকার আকাশ এই ঐতিহ্যেরই এক বৈশিষ্ট্য। ‘এই একই নক্ষত্র সেই নব্যপ্রস্তর যুগের লোমশ ম্যামথ আর গুহামানুষরা দেখত,’ বলেন কেভিন হিউজেস।

কেভিনের চারপাশের দৃশ্যও অবশ্য বদলাচ্ছে। নতুন বাড়িঘর আর হোটেল হচ্ছে। এর পরও ওয়েস্ট পেনউইথের বাসিন্দারা নিশ্চিত যে তাদের রাতের আকাশ সম্ভবত আগামী প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত থাকবে। এর কারণ হচ্ছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তাদের এলাকাটি ‘ডার্ক স্কাই পার্ক’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে খুব কম আলোদূষণের শিকার জায়গাগুলোই এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।

সাবেক পৌর কাউন্সিলর কেভিন সেই ২০১৩ সালে ‘ডার্ক স্কাই’ বা অন্ধকার আকাশ মর্যাদার জন্য আবেদন করার চিন্তা করেছিলেন। একদিন হঠাৎ করে প্রিয় পপশিল্পীর গান থেকে ভাবনাটা মাথায় আসে তাঁর। কেভিনের সেই প্রিয় শিল্পীটি হলেন এনিয়া। ‘ডার্ক স্কাই আইল্যান্ড’ নামে একটি অ্যালবাম বের হয়েছিল তাঁর। গানটি চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জের সার্ক দ্বীপ নিয়ে। সেখানে একেবারে কোনো ধরনের সড়ক বাতি বা গাড়ি নেই। ওই অ্যালবামের সবগুলো গানে ছিল তারার আলোয় পথ চলার কথা।

কেভিন তখন হিউজ ইন্টারন্যাশনাল ডার্ক-স্কাই অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেন। বিশ্বব্যাপী অন্ধকার আকাশের এলাকাগুলোকে স্বীকৃতি দেয় এ প্রতিষ্ঠান। দুজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনায় প্রতিষ্ঠা করেন এটি। রাতের পরিবেশকে ‘স্কাইগ্লো’ থেকে রক্ষা করাই ছিল আইডিএ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। ভূপৃষ্ঠ থেকে আকাশে ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়া অত্যধিক মাত্রার কৃত্রিম আলোই ‘স্কাইগ্লো’।

গবেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী ২৫ বছরে আলোকদূষণ কমপক্ষে ৪৯ শতাংশ বেড়েছে। অতিরিক্ত আলো নিয়ে ১৯৮০-এর দশকে পরিবেশবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ক্রমবর্ধমানভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইডিএ-ই ছিল অন্ধকার আকাশের পক্ষের আন্দোলনের প্রথম স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফ্ল্যাগস্টাফকে ২০০১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ‘ডার্ক স্কাই প্লেস’-এর মর্যাদাপূর্ণ খেতাব দেয় আইডিএ। তখন থেকে তারা জাপান থেকে হাঙ্গেরি পর্যন্ত বিশ্বের ৪৯টি দেশের আবেদন অনুমোদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ‘অন্ধকার আকাশ’ কর্মসূচিতে এখন আছে ১৯০টিরও বেশি জায়গা। সংরক্ষিত অন্ধকার আকাশ এলাকা, জনপদ, দ্বীপ ও অভয়ারণ্য মিলে বিশ্বের এক লাখ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার অন্ধকার স্থানকে রক্ষা করছে আইডিএ।

আইডিএর স্বীকৃতিকে এক ধরনের অনুমোদনের সিলমোহর হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী অধিকতর সংরক্ষণ, পর্যটন, শিক্ষা বা বিপণনের জন্য কাজে লাগাতে পারবে। এর মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্য, বন্য প্রাণী, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্ধকার আকাশের সুবিধাগুলো আরো ভালোভাবে চিহ্নিত হচ্ছে। এতে অনেক গ্রামীণ এলাকা এখন এই স্বীকৃতি চাইছে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অন্ধকার আকাশের অঞ্চল যুক্তরাজ্যে। দেশটির বিভিন্ন জনপদ অন্ধকার আকাশ সংরক্ষণের জন্য পাল্লা দিচ্ছে এখন।

তবে রাতের আকাশকে নির্মল, আলোর দূষণমুক্ত প্রমাণ করা সহজ কাজ নয়। কর্নওয়ালের ওয়েস্ট পেনউইথের জন্য অন্ধকার আকাশের মর্যাদা অর্জন করতে কেভিন হিউজেস, স্থানীয় কাউন্সিলরদের স্টিয়ারিং গ্রুপ, শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর নিবেদিতপ্রাণ বাসিন্দাদের সাত বছর লেগেছিল। প্রমাণ হিসেবে তাদের ‘আকাশের গুণমান মূল্যায়ন’ করতে হয়। ১৩৫ বর্গকিলোমিটার আকারের অঞ্চলটির সবচেয়ে অন্ধকার জায়গার আলোর মাত্রার পরিমাপ জমা দিতে হয়েছিল এ জন্য।

কেভিন হিউজেস ও তাঁর সহকর্মীরা এলাকাবাসীর মধ্যে প্রচারণা কর্মসূচি শুরু করেছেন। বাসিন্দাদের তাঁরা তাদের ব্যবহৃত আলোকে অন্ধকার আকাশের জন্য অনুকূল আলোতে রূপান্তরিত করতে রাজি করাচ্ছেন। যেমন—আলোকে ঊর্ধ্বমুখী করার বদলে ওপর থেকে ঢেকে রাখা বা কৌণিকভাবে লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। স্থানীয় কম্পানি ও কাউন্সিলগুলোকেও তাদের আলোকসজ্জার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে উৎসাহিত করা হয়। যেমন—নির্দিষ্ট সময়ের পরে ফ্লাডলাইট এবং রাস্তার আলো বন্ধ করার কথা বলছেন তাঁরা। সূত্র : বিবিসি



সাতদিনের সেরা