kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

সিপিডির সংলাপ

প্রকল্প সংশোধন করা নিয়মে পরিণত হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রকল্প সংশোধন করা নিয়মে পরিণত হয়েছে

সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বারবার নানা অজুহাতে বাড়ানো হচ্ছে। এটি একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। এতে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে। প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতার ওপর এবং বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ কথা বলেছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে পাবলিক (সরকারি) অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন : অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা’ শীর্ষক সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এমন মন্তব্য করেন। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে দেখি বারবার প্রকল্প সংশোধন হয়, এর ফলে সময় বৃদ্ধি করা হয়। প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বারবার নানা অজুহাতে বাড়ানো একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি মানেই ব্যয় বৃদ্ধি। আমরা মেগাপ্রকল্প ও ছোটখাটো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ২০২২-২৩ সালের যে বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে। সেখানে ১৩৫৬টি প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্স এটা বাদ দিলে ১২৫০টি প্রকল্প থাকে। এগুলো সুশাসনের সঙ্গে সময়মতো সাশ্রয়ীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গল হবে। ’

সংস্থাটি বলছে, ‘উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উচিত অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) মতো একটি উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করা এবং নতুন ক্যাডার তৈরি করা। এর পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে জমির অভিযোগ একটি বড় সমস্যা। এটি সমাধানের জন্য সৎ সরকারি কর্মকর্তা প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করতে হবে, সাশ্রয়ী মূল্যে গুণমান বজায় রাখতে হবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক আয় নিশ্চিত করতে হবে। এর সঙ্গে সরকারের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে (আইএমইডি) শক্তিশালী করতে হবে এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিভাগীয় অফিস স্থাপন করতে হবে বলেও পরামর্শ দেন বক্তারা।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উন্নত বিশ্বে ১০টি পিলার বা ভিতকে কেন্দ্র করে প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে অভীষ্ট লক্ষ্য ঠিক করা, এখানে কী কী ঝুঁকি রয়েছে, অবকাঠামোটি বাস্তবায়নের ফল, যথাযথ ডিজাইন, পরামর্শ প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তব জীবনে কতটুকু লাভজনক ইত্যাদি। আর প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হওয়ার পর যেন ঠিকাদার দায়বদ্ধ থাকেন এমন বিষয়টি প্রজেক্টে থাকা উচিত। প্রজেক্ট পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না এ বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশেরও সেদিকে যাওয়া উচিত।

তিনি আরো বলেন, প্রকল্প মনিটরিং করা, সরকারি সংস্থা আইএমইডির সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতি জোর দেওয়া দরকার। সংস্থাটির ৩৩৮টি পদের মধ্যে ১২৩টি পদই খালি রয়েছে। তাই বর্তমান সময়ের সঙ্গে প্রকল্পের আকার যেভাবে বেড়েছে, সেভাবে মনিটরিং কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা দরকার।

আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন প্রকল্প পরিচালক। কিন্তু দেখা যায়, পঞ্চগড়ের কোনো প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ঢাকায় থাকছেন, এটা জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের এলাকায় কেউ থাকতে চাচ্ছেন না। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে পাওয়া যায় না; তাঁদের নাটাই ঢাকায়, কিন্তু সুতা কাটা যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, প্রশাসনের অনেক বিধি অপ্রয়োজনীয়। ব্রিটিশ, পাকিস্তানি ও সামরিক শাসকরা এসব করেছেন, যার এখন বাস্তবতা নেই। কিন্তু অনেক দুষ্ট আমলা এসব বিধান চাতুরীর সঙ্গে কাজে লাগাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ আছে এসব বদলানোর, তা সত্ত্বেও এসব পরিবর্তন করা যাচ্ছে না, নানা প্রতিবন্ধকতা এসে হাজির হয়। তবে আইনকে আইন দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। আমরা সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। ’

অবকাঠামোকে দেশের প্রাণ বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অবকাঠামো আমাদের মূল লক্ষ্য। ’

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ‘পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এস্টিমেটেস’-এর চেয়ারম্যান উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদ বলেন, ‘সরকারি গাড়ি থাকার পরও প্রকল্পের শুরুতেই প্রকল্প পরিচালক একটি জিপ গাড়ি কেনেন। সঙ্গে মোটরসাইকেলও কেনেন। এগুলোকে চুরি বলব না, তবে আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকেই দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন। ’ প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই বা কস্ট-বেনিফিট অ্যানালিসিস হচ্ছে না বলে আক্ষেপ করেন সংসদ সদস্য এনামুল হক। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় মানুষের যাপিত জীবনের পরিবর্তনের বিষয়টি আমলে নেওয়া হচ্ছে না।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকারের পিপিপি প্রজেক্টে প্রাইভেট সেক্টরের প্রতিনিধিত্ব নেই। জাতীয় অবকাঠামো রোডম্যাপ প্রস্তুত করার আহ্বান জানান তিনি। যারা সময়মতো কাজ করে না তারাই পরে আবার ভালো প্রকল্প পায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের সামরুর রিয়াজ বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে ৬০৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিবছর ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। তবে আমাদের দেশে খুব দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। তা ছাড়া সঠিক তথ্য ছাড়া প্রকল্পের হিসাব-নিকাশ করা হয়। ফলে কর্মপরিকল্পনা ও কেনাকাটায় দুর্বলতা থেকে যায়। ’

সিপিডি বলেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১টি প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো সংশোধনের ফলে টাকার পরিমাণ বেড়েছে ২৯ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। পদ্মা ব্রিজে যে টাকা লেগেছে প্রায় তার সমান। কারণ পদ্মা সেতুর মোট ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। বারবার সংশোধন ও সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার ফলেই এই টাকা বেড়েছে।



সাতদিনের সেরা