kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

চোরাচালান রোধের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানাল বিএসএফ

চোরাকারবারিরা কোন দেশের তা দেখি না : এস এস গুলেরিয়া

মেহেদী হাসান, টাকি (পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা) থেকে   

২৯ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




চোরাচালান রোধের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানাল বিএসএফ

‘আমাদের চোখে একজন চোরাকারবারির পরিচয় চোরাকারবারিই। সে কোন দেশের, ভারতীয় না বাংলাদেশি তা আমরা দেখি না’—এমনটিই বলেছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের দক্ষিণ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এস গুলেরিয়া।

তিনি বলেন, ‘সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ যাতায়াত ও অপরাধ ঠেকানো। আমি সত্ভাবে দায়িত্ব পালন করলে যখন চোরাচালান, অবৈধ যাতায়াত ও অপরাধ হবে তখন আমি তাতে বাধা দেব।

বিজ্ঞাপন

চোরাকারবারি বা অপরাধীচক্রের সদস্যদের সঙ্গে তখন আমার সংঘাত হবে। কারণ তারা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে চাইবে। আমার জীবন বিপন্ন হলে অবশ্যই আমি অস্ত্র ব্যবহার করব। ’

গুলেরিয়া দাবি করেন, সীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে চোরাকারবারিদের সংঘাতের খবর হওয়ার অর্থ বিএসএফ তার দায়িত্ব পালন করছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে একটি বাড়ির সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষীর সঙ্গে নিজেদের তুলনা করেন। তিনি বলেন, অবৈধভাবে কেউ ঢুকলে অবশ্যই তা ঠেকানো তাদের দায়িত্ব।

গুলেরিয়া বলেন, ‘‘ট্রিগার হ্যাপি’ বলে বাস্তবে কিছু নেই। অপরাধীদের মোকাবেলা করতে গিয়ে বিএসএফকে আক্রান্ত হতে হয়। আবার মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও চাপে থাকতে হয়। ’

ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের মোকাবেলা করতে গিয়ে সীমান্তে বিএসএফ সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত সীমান্তে অপরাধ কম। কারণ সেখানে চোরাকারবারিরা জানে, সীমান্তে দায়িত্বরত জওয়ানদের কাছে মারণাস্ত্র আছে। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র নিয়ে বিএসএফ জওয়ানরা দায়িত্ব পালন করছে। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, চোরাকারবারিরা যখন জানে যে সীমান্তরক্ষীরা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে না তখন তারা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। চোরাকারবারে বাধা দেওয়ার সময় তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিএসএফ জওয়ানদের ওপর হামলা চালায়। বিএসএফ জওয়ানরাও মানুষ।

রাতের আঁধারে আত্মরক্ষার্থে তাদেরও অনেক সময় গুলি চালাতে হয়। সেই গুলিতে বাংলাদেশিরা যেমন হতাহত হচ্ছে, ভারতীয়রাও হতাহত হচ্ছে।

ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এস গুলেরিয়া গত দুই দিনে বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলকে বনগাঁ, কল্যাণী, কালঞ্চি, টাকি, ইছামতী নদী, পানিতার ও ঘোজাডাঙ্গা সীমান্তে বিএসএফের কর্মকাণ্ড ও চ্যালেঞ্জগুলো সরেজমিন দেখিয়েছেন। বিএসএফকে সীমান্তের ভারতীয় অংশ থেকে বাংলাদেশে অবৈধ পণ্য আসা ঠেকাতে সতর্ক থাকতে হয়। পাশাপাশি তাদের দৃষ্টি রাখতে হয়, বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতে কী ঢুকছে। অনেক এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নেই।

বেনাপোল-পেট্রাপোল সমন্বিত চেকপোস্ট (আইসিপি) দিয়ে প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ যাত্রী যাতায়াত করে। এ ছাড়া দুই দেশের বাণিজ্যের বড় অংশই হয় এখান দিয়ে। বিএসএফ কর্মকর্তারা জানান, বৈধ যাত্রী হিসেবে আসা যাত্রীদের মধ্যে মানবপাচারের শিকার নারী ও শিশু আছে কি না সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি আছে তাঁদের। বেশ কিছু কৌশল নিয়ে তাঁরা এ ক্ষেত্রে কাজ করছেন। অনেকটা সফলও হয়েছেন।

ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এস গুলেরিয়া বলেন, মানবপাচারের শিকার নারী ও শিশুদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে অ্যাডভোকেট সালমা আলীর বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি বেশ সহযোগিতা করছে।

সীমান্ত এলাকার বেশ কিছু অংশে দুই দেশের জনবসতি এত কাছাকাছি যে বিএসএফের জন্য চোরাকারবার ঠেকানো বেশ চ্যালেঞ্জিং। গুলেরিয়া সীমান্তের একটি এলাকা দেখিয়ে বলেন, সীমান্তের কাছাকাছি ভারতীয় জনবসতিতে একজন ভারতীয় চোরাকারবারি আছে, যে এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। ওই চোরাকারবারি কখনো সীমান্তের কাছাকাছি আসে না। কিন্তু সে তার পুরো গ্রামের লোকজনকে চোরাকারবারে যুক্ত করে ফেলেছে। তাদের সে টাকা দিচ্ছে। ওই সীমান্তের বিপরীতে বাংলাদেশি জনবসতিতে আছে এমন একজন বাংলাদেশি চোরাকারবারির নাম বলেন গুলেরিয়া। তিনি বলেন, চোরাকারবারিরা অনেক সময় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া কাটার চেষ্টা করে। আবার অনেক সময় রশি, মই বা তক্তা ব্যবহার করে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। এগুলো ঠেকাতে সীমান্তের স্পর্শকাতর অংশগুলোতে সিসি টিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

গুলেরিয়া বলেন, কাঁটাতারের বেড়ার মাঝে মাঝে গেট আছে। সেখান দিয়ে ভারতীয় কৃষকরা তাঁদের জমিতে চাষাবাদ করতে যান। এপাশে থাকেন বাংলাদেশি কৃষকরা। আকারে ছোট কিন্তু দামি পণ্য চোরাচালানের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে চোরাকারবারিরা সীমান্তও পাড়ি দেয় না। সীমান্তের ওপার থেকে এপারে বা এপার থেকে ওপারে ছুড়ে মারে।

বিএসএফের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গুলেরিয়া বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা বেশ কিছু ফোনসেট উদ্ধার করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো চোরাকারবারিদের। নজরদারি এড়াতে একটি ফোন একবারই ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক সময় গবাদি পশুর মাথায় মোবাইল ফোন বেঁধে দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয় ভারতীয় চোরাকারবারিরা। বাংলাদেশ অংশে অপেক্ষায় থাকা ওই চক্রের অপর সদস্যরা কল দিয়ে বুঝতে পারে সেগুলো তাদের জন্য পাঠানো হয়েছে।

নদী বা নালা দিয়ে বিভক্ত সীমান্ত এলাকাগুলোতে কাজ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে জানিয়েছেন বিএসএফ কর্মকর্তারা। ছোট নালা বা নদী এলাকাগুলো সাঁতরে বা অনেক সময় ডুব দিয়ে চলে যায় চোরাকারবারিরা। এই নালা বা নদীগুলোর দুই ধারেই দুই দেশের লোকজন গোসল করতে বা কাপড় ধুতে নামে। সে সময় তাদের মধ্যে দূরত্ব থাকে খুব কম। অনেক সময় মাছ ধরার নৌকায় করেও লোকজন সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। দুই পারের দূরত্ব এত কাছে যে রশি দিয়ে টেনে এপার থেকে ওপারে বা ওপার থেকে এপারে পণ্য চোরাচালানের চেষ্টা চলে।

গুলেরিয়া বলেন, সীমান্তের ভারতীয় অংশে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। তার ঠিক পাশে নালা নির্মাণ ও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, চোরাকারবারিরা যাতে বিনা বাধায় সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে।

 



সাতদিনের সেরা