kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

প্রত্নসম্পদ

জলদুর্গ এগারসিন্দুর

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

২৭ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জলদুর্গ এগারসিন্দুর

ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার এগারসিন্দুরে দুর্গ খনন করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ছবি : কালের কণ্ঠ

এগারোটি নদ-নদীর মোহনা ছিল। এ কারণে নাম এগারসিন্দুর। একটি জলদুর্গ। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুর গ্রামে এর অবস্থান।

বিজ্ঞাপন

এই প্রত্নসম্পদ সম্পর্কে জানতে গিয়ে মাটিচাপা ইতিহাস বেরিয়ে আসছে।

গত এপ্রিলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই দুর্গে খনন কার্যক্রম চালায়। এই খননে পাওয়া গেছে প্রায় আড়াই শ পিস প্রাচীন তৈজসপত্রের নিদর্শন ও স্থাপত্য কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ। উদ্ধার করা প্রত্নবস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম, প্রস্তরখণ্ড, পোড়ামাটির হাঁড়ি-পাতিল, ঘটিবাটি, থালা, পিরিচ, মাটির কলসের ভাঙা অংশ, তৈলপ্রদীপ, প্রদীপদানি, অলংকৃত ইট, ব্রেসলেট, হাতের বালা, সিরামিক, পোড়ামাটির বল, পুতুল, টয় প্রভৃতি। আরো মিলেছে ইটের তৈরি বর্গাকৃতির প্রতিরক্ষা দেয়াল, জলাধার, চুন-সুরকির মেঝে ও ব্রিক সলিংয়ের নিদর্শন। এগুলো উদ্ধারের পর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ৭ এপ্রিল দুর্গ এলাকা প্রদর্শন করে। ওই সভায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রতন চন্দ্র পণ্ডিত বলেন, ‘শাহ গরীবুল্লাহর মাজার ঢিবিটি খনন করে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ১০-১১ শতকের। ’

বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোচ উপজাতির প্রধান বেবুধ দুর্গটি নির্মাণ করে এটিকে তাঁর রাজধানী বানান। এখানে পুরনো একটি দিঘি রয়েছে, যাকে ‘বেবুধ রাজার দিঘি’ বলা হয়। ঈসা খাঁ দুর্গটি দখল করেছিলেন। দুর্গটিকে সংস্কার করে একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে উন্নীত করার কৃতিত্ব তাঁর। ৫৮৯ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহ দুর্গটি আক্রমণ করেন। কিন্তু ঈসা খাঁর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করে তিনি ফিরে যান। সতেরো শতকের শুরুর দিকে ‘অহম’রা দুর্গটি দখল করে। ইসলাম খান তাদের পরাজিত করে দুর্গটি ধ্বংস করেন। ১৮৯৭ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ধ্বংসপ্রাপ্ত এই দুর্গের অবশিষ্টাংশও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গের চারপাশে প্রাচীন মাটির ঢিবি ও চৌকোনা ইটের ভাঙা টুকরার স্তূপ। দুর্গ চত্বরে প্রাচীন ইটের কংক্রিট, মৃৎপাত্রের ভাঙা অংশসহ নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পড়ে আছে। উপরিভাগে কবরসদৃশ পাকা স্থাপনা। স্থানীয়রা জানায়, এটি শাহ গরীবুল্লাহ আউলিয়ার মাজার। দুর্গের দেয়াল ঘেঁষে পুকুর ও কিছুটা দূরে রয়েছে মরা শঙ্খ নদ।

‘ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি’র পর্যবেক্ষণে জানা যায়, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ ১১টি নদ-নদী বিধৌত কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর, পাকুন্দিয়ার এগারসিন্দুর, গাজীপুরের ভাওয়াল গড়, নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলের সামাজিকায়ন ও বাণিজ্যিকায়ন ঘটে সুলতানি আমলে। বাজিতপুরসহ এ অঞ্চলে মসলিনের বিকাশও ঘটে তখন। মধ্যযুগে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ গাজীপুরের একডালায় বাংলার রাজধানী স্থাপন করেন। মোগল সম্রাটরা এ অঞ্চলের গুরুত্ব কমিয়ে ঢাকামুখী হন। ব্রিটিশদের আগমনের পর সমৃদ্ধ অঞ্চলটি পুরোপুরি গুরুত্ব হারায়।

প্রত্নতত্ত্ব গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থে লিখেছেন, এগারসিন্দুরে ঈসা খাঁর ঘাঁটি ছিল। দুর্গটি তিনি নির্মাণ করেন বলে মনে করা হলেও এ দুর্গের অবস্থান ছিল বৌদ্ধ-হিন্দু যুগে। ঈসা খাঁ দুর্গটিকে সংস্কার ও সুরক্ষিত করেন। দুর্গ এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃৎপাত্রের ভাঙা অংশ, পাথরখণ্ড ও ইটের টুকরা পাওয়ায় তাঁর ধারণা হয়েছে, ‘এগুলো প্রাক-মুসলিম যুগের নিদর্শন। ’

এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘এগারসিন্দুর দুর্গের উত্তর-পশ্চিম কোনায় দেয়ালের অস্তিত্ব আছে। ’ তাঁর ধারণা, ১৮, ১৯ বা ২০ শতকের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে দুর্গটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি’র সদস্য প্রণয় পলিপার্ক রোজারিও কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘হাজার বছরের প্রাচীন এগারসিন্দুর দুর্গটি খননের পর সংরক্ষণ না করায় ধ্বংসের পর্যায়ে চলে গেছে। অবিলম্বে এটি সংরক্ষণ করা হোক। ’

আর্ক-এশিয়ার সভাপতি ও বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেন, ‘খনন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সংরক্ষণও ততটাই। ’

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ঢাকার আঞ্চলিক পরিচালক রাখী রায় বলেন, ‘এগারসিন্দুর দুর্গের খনন শেষ হয়েছে। আরো খনন হবে কি না, সামনের বছর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রতন চন্দ্র পণ্ডিত জানান, খননকাজের পর দুর্গের গর্ত মাটি দিয়ে ভরে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

 



সাতদিনের সেরা