kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ আগস্ট ২০২২ । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১২ মহররম ১৪৪৪

পানি সরছে, বেরোচ্ছে রাস্তার ক্ষত

ইয়াহইয়া ফজল ও শামস শামীম   

২৭ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পানি সরছে, বেরোচ্ছে রাস্তার ক্ষত

বন্যার পানির তোড়ে পিচঢালা রাস্তা ভেঙে বেহাল। সুনামগঞ্জ থেকে গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট থেকে পানি নেমে যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়ি যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতি।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে রাস্তাঘাটের ক্ষতি ব্যাপক। কোনো এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি সচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে দুর্গত এলাকায় অব্যাহত আছে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রম। বাড়ি ফিরলেও ভাঙা ঘরবাড়ি নিয়ে মানুষ বিপাকে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট চলছে। পানিবাহিত রোগ দেখা দিচ্ছে। ফসলের ক্ষতিতে দুশ্চিন্তায় কৃষক। ভাঙনের ঝুঁকিতে অনেক পরিবার।  

সুনামগঞ্জে সড়ক বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সড়ক, সেতু ও কালভার্টের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ রাস্তাঘাটও বিলীন হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় সড়ক বিভাগের ১৮৪ কিলোমিটার সড়ক এবং ২৫টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতির হয়েছে।

সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্যায় তাদের দুই হাজার কিলোমিটার পাকা সড়ক ও ১২০টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তা ছাড়া উপজেলা পরিষদ, প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্মিত পাকা ও মাটির রাস্তা প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।

সিলেট জেলার রাস্তাঘাট বেহাল। এখনো অনেক রাস্তাঘাট নিমজ্জিত। তবে যেসব রাস্তাঘাট থেকে পানি নেমে গেছে সেগুলোর অবস্থা খারাপ। কোম্পানীগঞ্জ, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এসব উপজেলার প্রধান সড়কগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন। কোম্পানীগঞ্জের তেলিখাল এলাকায় সেতু ও সড়কের সংযোগস্থলের মাটি সরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে সেনাবাহিনীর চেষ্টায় সেটি সচল হয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলেছে, এখন ঈদের আগে এসব রাস্তাঘাট চলাচলের উপযোগী করা তাদের মূল চ্যালেঞ্জ।

সিলেট সদর থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জে এখনো বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক এখনো জায়গায় জায়গায় ডুবে আছে। ট্রাক ও বাসের মতো যানবাহন ছাড়া ছোট যানবাহনের চলাচল খুব কম। সড়কের জকিগঞ্জ অংশের কাটালিপুল গ্রামের কাছে পিচ উঠে গেছে, মাটি সরে বড় বড় গর্ত হয়ে গেছে। একটু বেখেয়াল হলেই দুর্ঘটনা ঘটছে।

কোম্পানীগঞ্জে পানি সরে যাওয়ার পর দেখা গেছে, টুকেরবাজার, পাড়ুয়া, ভোলাগঞ্জ, নয়া গাঙের পার, টুকেরগাঁও, দয়ার বাজারের রাস্তার অবস্থা তুলনামূলক ভালো। বাকি সড়কগুলো জায়গায় জায়গায় ভেঙে গেছে।

সিলেটের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়ক দরবস্ত-কানাইঘাট সড়কও বেহাল। কানাইঘাটে ঢোকার মুখে পৌর এলাকায় সড়কে গভীর গর্ত হয়ে গেছে। শুক্রবার বিকেল থেকে রাস্তাটি মেরামত করে  সেনাবাহিনী। পরদিন থেকে ফের যান চলাচল শুরু হয়। বন্যায় কানাইঘাট পৌর এলাকা, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সড়ক ও জনপথ সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাথমিকভাবে যে ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো স্বল্প পর্যায়ে মেরামতে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে। তিনি বলেন, ‘এখন বিশেষ করে ঈদের আগে যাতে মানুষ যাতায়াত করতে পারে, বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে না হয় সে জন্য ইট দিয়ে রাস্তার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা হবে। তবে এসব সড়ক পরে পুরো ঠিক করতে লাগবে ১৮০ কোটি টাকার মতো। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এখনো সাতটি উপজেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি।

সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পাকা সড়ক বিভিন্ন স্থানে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ঝকঝকে তকতকে রাস্তাগুলোর এই ভগ্নদশা দেখে মনটা বিষণ্ন হয়ে ওঠে। কেউ চোখে না দেখলে এই সর্বনাশা বন্যার ভয়াবহতা বুঝতে পারবে না। ’

সুনামগঞ্জ সড়ক ও সেতু বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম প্রাং বলেন, ‘এখনো আমরা ক্ষয়ক্ষতির আরো তথ্য সংগ্রহ করছি। ’

কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। তবে নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি। পানি নেমে গেলেও ঘরবাড়ি বসবাসের উপযোগী হয়নি। বিশুদ্ধ পানির সংকট চলছে। চর ও নদীসংলগ্ন গ্রামগুলোতে রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় চলাচলের ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। পাট, সবজি, বীজতলা, আউসসহ ফসলের ক্ষতিতে হতাশ কৃষকরা। বন্যার পানিতে খড় ভেসে যাওয়ায় গবাদি পশুর খাদ্যসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সন্ন্যাসী গ্রামে আব্দুল্লাহ নামের পাঁচ বছরের একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। টাঙ্গাইলে শতাধিক গ্রামে এখনো পানি। টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘লোকালয় থেকে পানি সরে যাওয়ার সময় ভাঙন আরো তীব্র হবে। ভাঙন রোধে আমরা প্রস্তুত আছি। ’

যমুনাসহ প্রধান নদীগুলোর পানি কমলেও চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে পানিবন্দি অসংখ্য মানুষ। বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবের পাশাপাশি বাড়ছে পানিবাহিত নানা রোগ। চরাঞ্চলে রয়েছে গোখাদ্যের সংকট।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা]



সাতদিনের সেরা