kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

পানিতে ভেসে ১৫ দিন

রোকনুজ্জামান মানু, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)   

২৬ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পানিতে ভেসে ১৫ দিন

রোকেয়া বেগমের বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। স্বামী শামসুল ফকির ও আট বছরের নাতি নূরে এলাহীকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন একটি ভাঙা নৌকায়। ১৫ দিন ধরে সেই নৌকায়ই নাওয়া-খাওয়াসহ সব কাজ চলছে। একরকম খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে পরিবারটি।

বিজ্ঞাপন

বাড়ি থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও এখনো ফিরতে পারেননি তাঁরা।

রোকেয়া বেগমের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব মশালের চরে। রোকেয়ার মতো আরো অনেকের পরিবারই এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে। জীবন-জীবিকা—কোনো কিছুরই ঠিক নেই তাদের।

গতকাল শনিবার রোকেয়া বলেন, ‘অভাবের সংসার, পোলার বাপে কামকাজ কইরবার পারে না। আইজ পনেরো দিন থাইকা পানিতে ভাসতাছি। বাড়ি থাইকা পানি নামছে। কিন্তু হেই বাড়ি ঠিকঠাক করতে অনেক সময় লাগবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমগো কষ্ট দেইখানোর মানুষ নাই। ত্রাণ চাই না, সরকার আমগো বাড়ি উইচা করে দেউক। ’ 

প্রায় দুই সপ্তাহের বন্যায় বাড়িঘর, আসবাব নষ্ট হওয়ার উপক্রম। ক্ষতি হয়েছে ফসলি জমির। বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। রাস্তাঘাট নষ্ট হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই অবস্থায় দুর্ভোগ বেড়েই চলছে বন্যাকবলিতদের। স্থানীয় লোকজন জানায়, বন্যা আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু দুঃখের সীমা থাকে না চরাঞ্চলের মানুষের। নামকাওয়াস্তে ত্রাণ দিলেও তা সুষম বণ্টন হয় না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতির কারণে বঞ্চিত হয় প্রকৃত হতদরিদ্ররা। প্রতিবছর বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম যেন শেষ হয় না। নদী খননসহ ঘরবাড়ি উঁচু করার দাবি ভুক্তভোগীদের। ত্রাণ নয়, পরিত্রাণ চায় এসব বানভাসি।

হামিদুল ইসলাম ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত মশালের চরের আব্দুল মজিদের ছেলে। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানসহ সাত সদস্যের সংসার তাঁর। পুরনো কাগজের ব্যবসা করে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন। কয়েক দিন আগে নদের ভাঙনের কবলে পড়ে সুদের টাকায় কেনা ব্যবসার একমাত্র বাহন নৌকাটি নদীতে ডুবে যায়। আয়-রোজগার বন্ধ হয় হামিদুলের। পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন তিনি। এর পরই শুরু হয় বন্যা। এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘সুদে ৪০ হাজার টাকা নিয়েছি। কিন্তু বন্যা এসে সব শেষ করে দিল। আমি গরিব মানুষ। আবাদ কিস্তি কিছুই নেই। ’ তিনি জানান, প্রায় দুই সপ্তাহের বন্যায় খেয়ে না খেয়ে ছিলেন তাঁরা। কোনো বেলা খেলেও তা পেট ভরে খাওয়া হয়নি তাঁদের। প্রায় ১৫ দিন পানিবন্দি হয়ে থাকলেও ত্রাণ হিসেবে দুই কেজি চাল ও এক কেজি আলু পেয়েছেন তাঁরা।

দুর্গম মুছার চরের হতদরিদ্র জামাল মিয়া বন্যা থেকে বাঁচতে বসতভিটার এক কোণে মাচা তৈরি করেছেন। স্ত্রী বুলবু?লি বেগম, মেয়ে জাহানারা বেগম ও তিন বছরের নাতি জুনাইদসহ সেখানে গবাদি পশুও তুলেছেন। জামাল মিয়া জানান, সাত বছর ধরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ওই চরে বাস করেন তিনি। অভাবের সংসার। দিনমজুরি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই টেনেটুনে সংসার চালান তিনি। বাড়ি উঁচু করার সামর্থ্য নেই। প্রতিবছর বন্যায় অবর্ণনীয় কষ্টে জীবন যাপন করেন তিনি।



সাতদিনের সেরা