kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

সবাই মিলে কাজ করলে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব

কালের কণ্ঠ ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের গোলটেবিলে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




সবাই মিলে কাজ করলে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব

গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভিআইপি সভাকক্ষে গতকাল কালের কণ্ঠ ও ওয়ার্ল্ড ভিশন আয়োজিত ‘আর নয় শিশুশ্রম এবং পথশিশু, চলো স্কুলে যাই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে শিশুশ্রমিক ও পথশিশুদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা নেই। শিশুশ্রম বন্ধে পরিবারে, সমাজে আছে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব। তাদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও অপ্রতুল। কিন্তু একা কোনো সংস্থার পক্ষে এই কাজগুলো করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

সরকারি, বেসরকারিসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে কাজ করলেই শুধু তা সম্ভব।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ‘আর নয় শিশুশ্রম এবং পথশিশু, চলো স্কুলে যাই’ প্রতিপাদ্য নিয়ে কালের কণ্ঠ ও ওয়ার্ল্ড ভিশন আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এর সার্বিক আয়োজনে ছিল কালের কণ্ঠ, টঙ্গী আরবান প্রগ্রাম-ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও আর্টিস্টিক কমিউনিকেশন।

বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। ছিলেন জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, সামাজিক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিশু সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, ‘শিশুশ্রম কেন হচ্ছে—সেটা যেন আমরা সবাই মিলে চিহ্নিত করতে পারি। অনেক কলকারখানা শিশুশ্রমকে উৎসাহিত করে, লাভ বেশি করার জন্য স্বল্প বেতনে শিশুদের কাজ করানো হয়। যদি আমরা জনসচেতনতা তৈরি করতে পারি, সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে পারি, তবে শিশুশ্রম নিরসন করা সম্ভব। ’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কিছু ক্ষেত্রে মা-বাবা শিক্ষিত না হওয়ায় তাঁরা ভাবেন, লেখাপড়া করে কী হবে? তাঁদের এই মানসিকতা থেকে বের করে আনতে হবে। তিনি বলেন, ‘পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার লোকের সংখ্যাও খুব কম। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় পথশিশুদের কিছু লেখাপড়া করানো হচ্ছে। দরকার আরো বড় উদ্যোগ, সমন্বিত প্রচেষ্টা। ’

ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ডেপুটি ডিরেক্টর মঞ্জু মারিয়া পালমা মূল প্রবন্ধে বলেন, শিশুশ্রম বড় ধরনের অভিশাপ। কয়েক বছর আগে করা বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকের (বিবিএস) জরিপ মতে, দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে। এদের মধ্যে ১২ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। দারিদ্র্য, মা-বাবার অসচেতনতা ও পড়ালেখায় আগ্রহের অভাবসহ নানা পারিপার্শ্বিক সমস্যার কারণে শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না। বিবিএসের জরিপ মতে, শহরাঞ্চলের দরিদ্র এলাকায় প্রতি আটজনে একজন শিশুশ্রমে নিয়োজিত।

পথশিশুর সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো জরিপ না থাকলেও ‘কারিতাস বাংলাদেশ’ বলছে, দেশে আনুমানিক সাড়ে ১১ লাখ পথশিশু রয়েছে। এর প্রায় ৩৩ শতাংশের অবস্থান ঢাকা ও এর পাশের জেলাগুলোতে।

কালের কণ্ঠের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলীর সঞ্চালনায় ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ-টঙ্গী এরিয়ার প্রগ্রাম অফিসার লরেন্স ফলিয়ার সমন্বয়ে গোলটেবিল আলোচনায় আরো বক্তব্য দেন গাজীপুর জেলা শিক্ষা অফিসার রেবেকা সুলতানা, সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু ইউসুফ, গাজীপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক আহমেদ বেলাল, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের আরবান প্রগ্রামের টেকনিক্যাল ম্যানেজার জোয়ান্না’ডি রোজারিও, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোমেন মিয়া ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাবেদ আলী, জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক জোটের কোনাবাড়ী থানা কমিটির সভাপতি আশরাফুজ্জামান, বাংলাদেশ শিল্প গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আসাদুল ইসলাম, ভাষাশহীদ কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক, সিরাজ উদ্দিন সরকার বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ওয়াদুদুর রহমান, টঙ্গী আরবান প্রগ্রামের টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর জনি রোজারিও, টঙ্গী যুব ফোরামের সভাপতি জনি আহমেদ, টঙ্গী শিশু ফোরামের সহসভাপতি মাহমুদুর রহমান নাঈম, জয়দেবপুর কাজীপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব আলমগীর হোসেন, ব্লাইন্ড এডুকেশন রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের গবেষক কামরুন নাহার মিরা প্রমুখ।

বক্তারা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, গাজীপুর থেকে শিশুশ্রম দূর করা, শিশুদের জন্য বার্ষিক বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা, দরিদ্র পরিবারকে সরকারের বিভিন্ন সহায়তার আওতায় আনা, সরকারি-বেসরকারি ও প্রাইভেট সেক্টরকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সরকারের শিশুশ্রম নিরসনসংক্রান্ত ন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন (এনপিএ) ২০২১-২৫ বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করেন। বিভিন্ন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মনিটরিং করারও দাবি জানান তাঁরা।

গাজীপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক আহমেদ বেলাল বলেন, ‘২০১২ ও ২০১৩ সালের পরে শিশুশ্রমিক সংখ্যার জরিপ নেই। আমরা গত বছরও শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা সংক্রান্ত ১২টি মামলা করেছি। আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি করা হয়। আমরা বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নিই। সবার সহযোগিতায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের চেয়ে গাজীপুরে শিশুশ্রমের হার কম। ’

গাজীপুর জেলা শিক্ষা অফিসার রেবেকা সুলতানা বলেন, ‘যেসব শিশু স্কুলে যায় না বা ঝরে পড়ে, তাদের স্কুলে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তান অনেক সময় খেয়ে না খেয়ে স্কুলে যায়। তাদের জন্য মিড ডে মিলের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সমাজের বিত্তবানদের প্রতিও আহ্বান জানাই। ’

জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক জোট কোনাবাড়ী থানা কমিটির সভাপতি মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, শিশুশ্রমের অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। দারিদ্র্যবিমোচন না হলে এটা বন্ধ করা কঠিন। শহরে পাড়ায় পাড়ায় ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠেছে। সেখানে শ্রম আইন মানা হচ্ছে না। এসব কারখানায় নজরদারি না থাকায় কম বেতনে শিশুশ্রম চলছে।

 

 



সাতদিনের সেরা