kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

শহরে ৫% মানুষ মে মাসে এক দিন অভুক্ত ছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শহরে ৫% মানুষ মে মাসে এক দিন অভুক্ত ছিল

চলমান মূল্যস্ফীতির কারণে আর্থিক দুরবস্থায় পড়ে গত মে মাসে অন্তত এক দিন শহরের স্বল্প আয়ের ৫ শতাংশ মানুষ সারা দিন অভুক্ত থেকেছে। গ্রামে এ অবস্থা ৩ শতাংশ। অন্তত এক বেলা কম খেয়েছে এমন পরিবার শহরে ২১ শতাংশ এবং গ্রামে ১৩ শতাংশ। এ পরিবারগুলোর অনেকে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে খাদ্যতালিকায় থাকা মূল খাবার মাছ, মাংস, দুধ ও ফল খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে, আবার অনেকে পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বেসরকারি সংগঠন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (বিআইজিডি) গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রবিবার এ গবেষণা প্রতিবেদন ভার্চুয়ালি গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান এবং বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন।

গবেষণায় বলা হয়, করোনা পরিস্থিতিতে দেশে তিন কোটির বেশি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছিল। একসময় করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ সংখ্যা কমে যায়। তবে সম্প্রতি নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে নতুন করে ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।

দেশে ২০২০ সালের মার্চে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ওই বছরের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের মে মাস পর্যন্ত নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করোনার প্রভাবসংক্রান্ত এ নিয়ে পাঁচ দফা জরিপ করে পিপিআরসি ও বিআইজিডি। প্রথমবার এপ্রিল ২০২০, দ্বিতীয়বার ওই বছরের জুন, তৃতীয়বার মার্চ ২০২১ ও চতুর্থবার ওই বছরের আগস্টে জরিপ চালানো হয়। গতকাল ‘মূল্যস্ফীতি, খাপ খাওয়ানো ও পুনরুদ্ধারের প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক পঞ্চম দফার জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এই জরিপের কাজ চলে গত ১৪ থেকে ২১ মে পর্যন্ত। জরিপে অংশ নেয় গ্রাম ও শহরের তিন হাজার ৯১০ জন। মোট ১১ সেকশনে প্রত্যেকটি মানুষের কাছে ৮০ থেকে ৯০টি প্রশ্ন করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘করোনার পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। নতুন দরিদ্র মানুষের পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে না। দরিদ্র মানুষ টিকে থাকার চেষ্টা করছে স্বশোষণ করে। খাওয়া কমিয়ে, কাজের সময় বাড়িয়ে এ প্রচেষ্টা চলছে। ’

গবেষণায় বলা হয়, দেশে দ্বিতীয় দফায় দেওয়া লকডাউনের পরে মাথাপিছু দৈনিক আয় বেশ ভালোভাবে পুনরুদ্ধার হয়েছিল। আগস্ট ২০২১ থেকে জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত আয় বৃদ্ধির এই হার ছিল ২৭ শতাংশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে জানুয়ারি এবং মে ২০২২-এর মধ্যে এই আয় আবার ৬ শতাংশ কমছে।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ঠিক কভিড-১৯-এর ধাক্কা সামলানোর সময়টিতে মূল্যস্ফীতি ঘটায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। মানুষের আয় করোনাপূর্ব সময়ের চেয়ে এখনো ১৫ শতাংশ কম। শহরে এ হার অনেক বেশি, ২৫ শতাংশ। গ্রামে তা ১ শতাংশ। বাংলাদেশ এখন একটি নতুন ঝুঁকির সম্মুখীন। তা হলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পুষ্টি ও শিক্ষার যে লক্ষ্য নির্ধারিত, সেটি পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা।

জরিপে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির এই চাপ অনেক নারীকে কাজের খোঁজে বাইরে বের হতে বাধ্য করছে। তবে করোনাকালের কাজ হারানো ৩৬ শতাংশ নারী এখনো কর্মক্ষেত্রে ঢুকতে পারেননি।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষের আয় কমেছে অনেক বেশি হারে। শহরে যেখানে আয় কমার হার ৮ শতাংশ, গ্রামে তা ৩ শতাংশ। আর্থিক দূরবস্থায় ১১ শতাংশ মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। ইমরান মতিন বলেন, করোনার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হয় কিছুটা। কিন্তু দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষের আয় আবার কমে যায়।

জরিপে দেখা গেছে, গ্রাম-শহরের কৃষি ও পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকটা খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছেন। কিন্তু রিকশাচালক, কারখানা শ্রমিক ও গৃহকর্মীর ওপর এর প্রভাব মারাত্মক।

গবেষণায় বলা হয়, ২৭ শতাংশ পরিবার চাল কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। আগের চেয়ে নিম্নমানের চাল কিনছে ৩৬ শতাংশ পরিবার। তবে পুষ্টির জন্য দরকারি মাছ, মাংস, দুধ কম কেনা বা একেবারে বাদ দিয়েছে তারা। ৪৭ শতাংশ পরিবার দুধের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। মান কমিয়ে দিয়েছে ২৫ শতাংশ। আর একেবারে বাদ দিয়েছে ২০ শতাংশের মতো পরিবার। ৭৩ শতাংশ মানুষ মাছ কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে।

এই যে জিনিসের দাম বাড়ছে, তার পেছনে নানা কারণকে তুলে ধরেছে মানুষ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬২ শতাংশ মনে করছে, দুর্বল ব্যবস্থাপনার জন্যই এমনটি ঘটছে। এর পাশাপাশি সরবরাহের ঘাটতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধিকেও কারণ বলে মনে করে অনেকে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা হিসেবে সর্বোচ্চ ৬৯ শতাংশ মনে করে, ব্যবস্থাপনা বা সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তারের কথা বলেছে ৩৬ শতাংশ।

 



সাতদিনের সেরা