kalerkantho

রবিবার । ৩ জুলাই ২০২২ । ১৯ আষাঢ় ১৪২৯ । ৩ জিলহজ ১৪৪৩

চিকিৎসাবিজ্ঞান

নতুন হাতে নতুন জীবন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নতুন হাতে নতুন জীবন

সম্পূর্ণ অচল থেকে এখন ‘অন্যের’ হাত দিয়ে চায়ের কাপ ধরার মতো অনেক কাজই করতে পারেন স্টিভেন। ছবি : বিবিসি

জটিল এক রোগে ভুগে দুটি হাতই অচল হয়ে পড়েছিল নির্মাণ শ্রমিক স্টিভেন গ্যালাঘারের। আঙুলগুলো কুঁকড়ে কার্যত স্থায়ীভাবে মুঠো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। আঙুল বা হাতের মুঠো দিয়ে কিছুই ধরতে পারতেন না। সেই সঙ্গে ছিল প্রচণ্ড ব্যথা।

বিজ্ঞাপন

কাপড় পরার মতো সাধারণ কাজও হয়ে পড়েছিল প্রায় অসম্ভব। কাজেই প্রথম যখন একজন চিকিৎসক বললেন, দুটি হাতই বদলে সুস্থ একদম নতুন হাত পেতে পারেন তিনি, অবিশ্বাসে হেসেছিলেন স্টিভেন।

কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক অস্ত্রোপচারের পাঁচ মাস পর সত্যিই এখন ব্যথামুক্ত ‘নতুন জীবন’ উপভোগ করছেন যুক্তরাজ্যের নর্থ আয়ারশায়ারের বাসিন্দা স্টিভেন গ্যালাঘার।

স্টিভেনের বয়স এখন ৪৮ বছর। প্রায় ১৩ বছর আগে তাঁর গাল ও নাকে এক ধরনের অস্বাভাবিক র‌্যাশ উঠেছিল। পাশাপাশি ডান বাহুতে ব্যথা বোধ করছিলেন তিনি। চিকিৎসকরা প্রথমে ভেবেছিলেন এটি অটোইমিউন রোগ লুপাস। অটোইমিউন রোগে লোকের শরীরের ইমিউন অর্থাৎ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের শরীরের টিস্যুকেই আক্রমণ করে বসে। আরেকটু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তারদের ধারণা হয়, রোগটা কারপাল টানেল সিনড্রোম। একসময় তিন সন্তানের বাবা স্টিভেনের হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়।

কিন্তু উভয় বাহুতে ব্যথা ফিরে এলে তাঁকে পাঠানো হয় একজন বিশেষজ্ঞের কাছে। তিনি নিশ্চিত করেন, স্টিভেন সেক্লরোডার্মায় ভুগছেন। এটাও অটোইমিউন রোগ, যা ত্বক এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে দাগ সৃষ্টি করে। অসুখটি স্টিভেনের নাক, মুখ, হাতসহ বিভিন্ন স্থানে সমস্যা তৈরি করে। বছর সাতেক আগে তাঁর আঙুলগুলো কুঁচকে যেতে যেতে মুঠোর অবস্থানে চলে যায়। ভয়াবহ ব্যথায় ভুগতে থাকেন তিনি।

ছাদের টাইলস বসানোর কাজ করতেন স্টিভেন। সেই কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। এবার তাঁকে পাঠানো হলো গ্লাসগোর প্লাস্টিক ও হ্যান্ড সার্জন অধ্যাপক অ্যান্ড্রু হার্টের কাছে। তিনিই প্রথম জোড়া হাত বদলের সম্ভাবনাটি তুলেছিলেন স্টিভেনের সামনে।

‘সেই সময় কথাটা শুনে আমি হেসেছিলাম। মনে হয়েছিল, এ লোক কী বলে! এ তো মহাকাশ যুগের ব্যাপারস্যাপার!’, স্মৃতিচারণা করে বলেন স্টিভেন।

অধ্যাপক অ্যান্ড্রু হার্টের সঙ্গে আরো আলাপের পর স্টিভেন লিডস টিচিং হসপিটালের এনএইচ ট্রাস্টের অধ্যাপক প্লাস্টিক সার্জন সাইমন কের সঙ্গেও কথা বলেন। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের প্রথম জোড়া হাত বদল অপারেশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাইমন কে-ই। উভয়েই তাঁকে এর ঝুঁকির বিষয়টা জানান। কী ঘটতে পারে সে সম্পর্কে খোলাখুলি কথা বলেন তাঁরা। জানান, অস্ত্রোপচার সফল না হলে স্টিভেন তাঁর দুই হাত পুরোপুরিই হারাতে পারেন। সম্ভাবনা কম হলেও একটা ঝুঁকি ছিল।

স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে স্টিভেন অস্ত্রোপচারটি করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ভেবে দেখেন, আগে-পরে হাত তো হারাতেই যাচ্ছেন। দেখাই যাক, অস্ত্রোপচার করে কী হয়। স্টিভেনকে এরপর মানসিকভাবে প্রস্তুত করার জন্য মনোবিদের সঙ্গে বসতে হয়।

চিকিৎসকদের ধারণা, এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত কারো জোড়া হাত প্রতিস্থাপনের ঘটনা গোটা বিশ্বে এটাই প্রথম। একজন উপযুক্ত দাতা খুঁজে পাওয়ার পর চিকিৎসার অনেকগুলো শাখার ৩০ জন বিশেষজ্ঞের একটি দল অস্ত্রোপচারে অংশ নেয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে লিডসে ১২ ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচারটি চালানো হয়।

দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের পর জেগে উঠে বিচিত্র অনুভূতি হচ্ছিল স্টিভেনের। ‘হাতগুলো ছিল আশ্চর্য রকম। সব কিছু এত দ্রুত ঘটেছিল! অস্ত্রোপচার থেকে জেগে ওঠার পরপরই হাতগুলো নাড়াতে পারছিলাম আমি’, বলেন স্টিভেন।

হাসপাতালে চার সপ্তাহ কাটিয়ে বাড়ি ফেরেন স্টিভেন। তবে ফিজিওথেরাপি এবং পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত হাসপাতালে যেতে হয় তাঁকে।

জামাকাপড়ের বোতাম আঁটার মতো সূক্ষ্ম কাজ এখনো স্টিভেনের সাধ্যের বাইরে। তবে অবস্থার এতটাই উন্নতি হয়েছে যে প্রিয় পোষা কুকুরের গায়ে হাত বোলানো, পানির ট্যাপ চালু করা বা এক গ্লাস পানি ভরার মতো কাজ করতে পারছেন অনায়াসে।

‘এই অপারেশন আমাকে দিয়েছে নতুন জীবন। প্রতি সপ্তাহেই আরো উন্নতি হচ্ছে। এখন আর কোনো ব্যথাও নেই’, বলেন অভিভূত স্টিভেন গ্যালাঘার।

অধ্যাপক সাইমন কে বলেন, ‘অপারেশনটি ছিল এক বিরাট দলীয় প্রচেষ্টা। হাত প্রতিস্থাপন কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ প্রতিস্থাপনের থেকে অনেক আলাদা। ’ সাইমন কের কথায়, ‘হাত এমন একটা অঙ্গ যা আমরা প্রতিনিয়ত দেখি। আর আমরা কত উপায়ে যে তাকে ব্যবহার করি তারও ইয়ত্তা নেই। এ জন্য হাত প্রতিস্থাপনের রোগীদের মনোবিদ দিয়ে মূল্যায়ন করে তৈরি করতে হয়। কারণ অন্য কারো হাত নিজের শরীরে যুক্ত হওয়ার বিষয়টা প্রতিনিয়ত মনে হবে তাদের। শরীর বাইরের হাত প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। ’ সূত্র : বিবিসি

 

 



সাতদিনের সেরা