kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৩০ জুন ২০২২ । ১৬ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৯ জিলকদ ১৪৪৩

ক্ষতচিহ্ন মুছতে নতুন সংগ্রাম

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট ও শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২৬ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্ষতচিহ্ন মুছতে নতুন সংগ্রাম

বাড়ি থেকে নেমেছে বন্যার পানি। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি মেরামতের পাশাপাশি গবাদি পশুর বাসস্থান সংস্কার করছেন একজন। গতকাল সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রাম থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বন্যার পানি নেমেছে, কিন্তু ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে প্রতিটি কোণজুড়ে। আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে অনেকে বাড়ি ফিরেছে। তাদের দিনরাত কাটছে ঘর মেরামতে।

পরিশ্রমে বোনা ফসলে এখন তীব্র দুর্গন্ধ।

বিজ্ঞাপন

বাড়ির উঠান, রাস্তার দুই পাশে, আর যাদের সে রকম জায়গা নেই তারা ঘরেই ফ্যান ছেড়ে শুকানোর চেষ্টা করছে।

স্কুলগুলোতে এখনো ফেরেনি স্বাভাবিক পরিবেশ। শ্রমজীবী মানুষ কাজ আর খাবারের সন্ধানে ছুটছে এখান থেকে ওখানে। বন্যাকবলিত সিলেট ও সুনামগঞ্জের চিত্র কমবেশি এ রকমই।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়ি গ্রামে কোম্পানীগঞ্জ থানা সদর উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যার সময় শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। পানি নেমে যাওয়ায় বেশির ভাগ পরিবার বাড়ি ফিরে গেলেও এখনো সেখানে ১০ থেকে ১২টি পরিবার রয়ে গেছে।

গতকাল বুধবার ওই আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে সখিনা বেগম নামের এক নারী জানান, তিন দিন হলো বন্যার পানি তাঁদের ঘর থেকে নেমে গেছে, কিন্তু তাঁরা ঘরে ফিরতে পারছেন না। পানির তোড়ে ভিটার মাটি সরে গেছে। খুঁটি ভেঙে টিনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেরামত না করে ওঠার অবস্থা নেই।

তবে উপজেলার গুচ্ছগ্রামের আব্দুল মতিন জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন ১০ দিন। বাড়ি ফিরে দেখেন, ঘরের টিনসহ আসবাব নষ্ট হয়ে গেছে।

আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া কোম্পানীগঞ্জ থানা সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণির ৩৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত মাত্র চারজন।

প্রধান শিক্ষক ফাতেমা আক্তার বলেন, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেশির ভাগ মানুষ বাড়ি ফিরে গেছে। বন্যার সময় তারা গবাদি পশুও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। তারা চলে যাওয়ার পর স্কুল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হলেও গবাদি পশুর দুর্গন্ধ যেতে সময় লাগছে। তা ছাড়া অনেক অভিভাবক ভয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না।

এদিকে বন্যার পানিতে পচন ধরেছে ঘরে তোলা ফসলে। এর মধ্য থেকে ভালোগুলো শুকাতে দিচ্ছেন কিষান-কিষানিরা। আর যেগুলো আগে কাটতে পারেননি সেগুলো এখন তুলতে ব্যস্ত।

গতকাল বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ডালারপার গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় আধাকিলোমিটারজুড়ে রাস্তার দুই পাশে ধান শুকাচ্ছেন চাষিরা। গ্রামের বাদাম চাষি নবী হোসেন বলেন, ‘বন্যার পানি সরে যাওয়ায় দুই দিন ধরে বাদাম তুলেছি। আজ শুকাতে দিয়েছি। ’ সাড়ে তিন হেক্টর জমিতে তিনি বাদাম বুনেছিলেন। সেগুলোর প্রায় অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে বলে তিনি জানান।

সুনামগঞ্জেও আবার সংগ্রাম শুরু : সুনামগঞ্জ পৌর শহরের কালিপুর গ্রামের একমাত্র সড়কটি ডুবে গিয়েছিল। পানির নিচে ছিল দুই শতাধিক ঘরবাড়ি। তিন দিন আগ থেকে পানি নেমে যাওয়ায় উঁচু স্থানের স্বজনদের বাড়ি ও আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আবার বাড়ি ফিরছে কন্যাকবলিত মানুষ।

কালিপুরের প্রবেশমুখের টিনশেডের একটি বস্তিতে ১২টি পরিবার থাকে। বন্যায় ১০টি পরিবার অন্যত্র চলে গিয়েছিল, কিন্তু দুটি পরিবার খাটের নিচে ইট বিছিয়ে বস্তিতেই থেকে গিয়েছিল।

গতকাল দুপুরে ওই বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘর পরিষ্কার করছেন নাজমা বেগম নামের এক নারী। তিনি জানান, বন্যার সময় পাশে নির্মাণাধীন একটি বাসার ছাদে ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে কোনোমতে রান্না করে সন্তানদের খাইয়েছেন।

কালিপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যেভাবে পানি বেড়েছিল, তা দেখে গত শুক্রবার পরিবার ও চার ছেলেমেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। দুই দিন পর থেকেই পানি নামতে শুরু করেছে। গতকাল স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এসেছি। তবে ঘর-দরজা নষ্ট করে দিয়ে গেছে বন্যার পানি। মেঝেতে কাদা জমেছে। ’

সুনামগঞ্জ পৌর মেয়র নাদের বখত জানান, পৌর শহরের বর্ধিত এলাকার বেশির ভাগ ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গিয়েছিল। তবে পানি নেমে যাওয়ায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। পৌরসভা ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাল, নগদ টাকা ও শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। তিন-চার দিন আগে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকেও লোকজন বাড়িতে ফিরে গেছে।

 



সাতদিনের সেরা