kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

১২৩তম নজরুল জন্মজয়ন্তী আজ

কুমিল্লায় কবিতার যুবরাজ

আবদুর রহমান, কুমিল্লা   

২৫ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কুমিল্লায় কবিতার যুবরাজ

কাজী নজরুল ইসলাম

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্মের বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে কুমিল্লা। গবেষকদের ভাষ্য মতে, কুমিল্লায় বিচরণের মধ্য দিয়ে নজরুল হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী কবি। কবির প্রেম, বিয়ে, সুরকার-গায়ক, অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠার অনেক কিছুর প্রথম এই কুমিল্লা। দ্রোহ ও প্রেমের কবি নজরুল ১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দফায় ১১ মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এই সময়ে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তারও হন।

কবি কুমিল্লার বিভিন্ন বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আড্ডা দিতেন, সংগীতচর্চা ও কবিতা আবৃত্তি করতেন। লিখতেন গান ও কবিতা। কুমিল্লায় কাটানো ওই পর্ব ছিল কবির জীবনের সোনালি সময়। তাঁর জীবনে যে দুজন নারী এসেছিলেন, সে দুজনও কুমিল্লার।

আজ বুধবার জাতীয় কবির ১২৩তম জন্মজয়ন্তী। গত বছর ৫ এপ্রিল ছিল কুমিল্লায় কবির আগমনের শতবর্ষ। শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় কুমিল্লায় চির-অম্লান নজরুল।

কুমিল্লায় এখনো জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত অনেক নিদর্শন রয়েছে। তবে সংরক্ষণের অভাবে সেগুলো বিলীন হতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ বছর কুমিল্লায় কবির স্মৃতিবিজড়িত ১২টি স্মৃতিফলক সংস্কার করা হয়েছে। নজরুলের প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছেদ, গ্রেপ্তার ও কাব্যচর্চার বহু ঘটনার সাক্ষী হিসেবে ১৯৮৩ সালে স্থাপন করা হয়েছিল স্মৃতিফলকগুলো।

কুমিল্লার গোমতী নদীর এপারে প্রমীলা আর ওপারে নার্গিস ছিলেন কবির হৃদয়ের সারথি। এ দুজনকে ঘিরে নজরুলের প্রেম ও বিরহের অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত কেটেছে কুমিল্লা নগরী ও মুরাদনগরের দৌলতপুরে। লেখা হয়েছিল বিখ্যাত সেই বিরহের গান—‘শাওন আসিল ফিরে, সে ফিরে এল না’। কবির দুই প্রেমিকার প্রথমজন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের খাঁবাড়ির আলী আকবর খানের ভাগ্নি নার্গিস আসার খানম, অন্যজন কুমিল্লা নগরীর বসন্ত কুমার সেনগুপ্তের মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তা দুলী। কবি তাঁর নাম দিয়েছিলেন প্রমীলা।

১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর রাজগঞ্জ বাজারে কবি ব্রিটিশবিরোধী মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর শহরের ঝাউতলা সড়কের শেষ প্রান্তে রাস্তার দক্ষিণ পাশ থেকে ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতার জন্য কবি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজসংলগ্ন রানির দীঘিরপারের পশ্চিম-দক্ষিণ কর্নারে বসে কবি গান ও কবিতাচর্চা করতেন। এ ছাড়া কবির আরো অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে কুমিল্লা নগরী ও মুরাদনগরের দৌলতপুরে। সংরক্ষণের অভাবে সেগুলো বিলীন হতে বসেছে।

নজরুলকে নিয়ে চর্চা ও গবেষণার জন্য কুমিল্লার মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল উদ্বোধন করা নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র নিয়েও ক্ষোভের শেষ নেই। কবিপ্রেমীরা বলছেন, যে অর্থে কুমিল্লায় নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল, সে অর্থে তা কাজে লাগানো হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। হচ্ছে না নজরুলকে নিয়ে গবেষণা।  

শিক্ষাবিদ ও নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘অনেকে বলছেন পাঁচ দফায় কবি ১১ মাস কুমিল্লায় ছিলেন। তবে আমার গবেষণায় দেখা গেছে, কবি এক বছরের বেশি সময় কুমিল্লায় অবস্থান করেছিলেন। কুমিল্লায় তিনি ৫৩টি রচনা, কবিতা ও গান লিখেছেন। নজরুলের জীবনে কুমিল্লা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কবির জীবনের প্রথম অনেক কিছুই ঘটেছে কুমিল্লায়। কবি প্রথম প্রেম ও বিয়ে করেছেন কুমিল্লায়, দ্বিতীয় বিয়েও কুমিল্লায়। গান লিখে ও সুর করে প্রথম প্রকাশ্য গায়ক ও সুরকার হিসেবে আবির্ভূত হন এই কুমিল্লায়। কবির প্রথম প্রকাশ্য মঞ্চনাটক কুমিল্লা টাউন হলে। তিনি গানের প্রথম প্রশিক্ষণ নিয়েছেন কুমিল্লায়। কুমিল্লায় বিচরণের পর কলকাতায় গিয়ে নজরুল হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী কবি। ’

শিক্ষাবিদ ও নজরুল গবেষক অধ্যাপক শান্তি রঞ্জন ভৌমিক বলেন, ‘কুমিল্লায় নজরুলকে নিয়ে এ পর্যন্ত যেটুকু কাজ হয়েছে, তার প্রায় সবটুকুই হয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে। বৃহত্তর কুমিল্লার সন্তানরাই নজরুলকে নিয়ে বেশি গবেষণা করেছেন। নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র স্থাপনের পর আমরা আশা করেছিলাম গবেষণার মাধ্যমে কুমিল্লায় নজরুলকে অকৃত্রিমভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। তবে তেমনটা হয়নি। নজরুল ইনস্টিটিউট শুধু সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে দায়িত্ব শেষ করছে। ’  

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এ বছর জাতীয় কবির ১২৩তম জন্মজয়ন্তী জাতীয়ভাবে কুমিল্লায় পালিত হচ্ছে। আমরা কুমিল্লায় যত স্থানে কবির স্মৃতিফলক রয়েছে, তার সব সংস্কার করেছি। ’

জাতীয় পর্যায়ে কুমিল্লায় নজরুল জন্মজয়ন্তী

বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জন্মজয়ন্তী কুমিল্লায় উদযাপিত হচ্ছে। ২৫ থেকে ২৭ মে এই তিন দিন জাতীয় পর্যায়ের এ অনুষ্ঠান হবে কুমিল্লা নগরীর বীরচন্দ  গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন প্রাঙ্গণে (টাউন হল)।

আজ বুধবার সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন। ১২৩তম জন্মজয়ন্তী উৎসবের প্রতিপাদ্য ‘বিদ্রোহীর শতবর্ষ’। ২৭ মে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম।

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ও  নজরুল মঞ্চের আয়োজন

জাতীয় কবির ১২৩তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন করতে প্রস্তুত কবির বাল্যস্মৃতিবিজড়িত বিদ্যাপীঠ নজরুল একাডেমির নজরুল মঞ্চ ও কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। এই দুটি ভেন্যুতে পৃথক তিন দিনের ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার নজরুল মঞ্চে নজরুলের জীবন নিয়ে আলোচনা, গান, নৃত্য ও নাট্যানুষ্ঠান হবে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গাহি সাম্যের গান মঞ্চে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে নজরুলের জন্মজয়ন্তী পালিত হবে।

 



সাতদিনের সেরা