kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

সাতজনের মৃত্যু, ঘরবাড়ি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সাতজনের মৃত্যু, ঘরবাড়ি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে গতকাল ঝড়ে দেউলবাড়ী এমকেডিআর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন ভেঙে পড়ে। ভবনের একাংশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশের ১৫ জেলায় গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চার জেলায় ঝড়ে গাছচাপায় ও নৌকাডুবিতে অন্তত পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। ঝড়ে ঘরবাড়ি, গাছ, আম, ধানসহ বিভিন্ন ফসলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বগুড়া, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, নওগাঁ ও ঝিনাইদহে।

বিজ্ঞাপন

চলতি মৌসুমে এটিই প্রায় একই সময়ে এত বেশিসংখ্যক জেলায় ঝড়ের ঘটনা। কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত :

লণ্ডভণ্ড বগুড়া, দুজনের মৃত্যু

বগুড়ায় মাত্র চার মিনিটের ঘূর্ণিঝড়ে বহু কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। শহর ও শহরতলিতে অসংখ্য গাছ ভেঙে বিদ্যুতের তারের ওপর পড়েছে। ফলে ভোররাত থেকে জেলাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া অসংখ্য আধাপাকা বাড়ির টিনের চাল উড়ে গেছে। জেলার কাহালু ও শাজাহানপুর উপজেলায় গাছের চাপায় দুজন নিহত হয়েছেন। শহরের দুটি পৌর পার্কসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে ঝড়ে মারা গেছে শত শত পাখি। বোরো ধানেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোররাত ৪টায় এই ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়।

কাহালুর কালাই এলাকায় ঝড়ে একটি গাছ উপড়ে বাড়ির ওপরে পড়লে একজনের মৃত্যু হয়। নিহত শাহীন প্রামাণিক (৪৮) গাইবান্ধার সাঘাটার জুমারবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। তিনি কাহালু উপজেলায় সাত বছর ধরে দিনমজুরের কাজসূত্রে বসবাস করছিলেন। শাজাহানপুর উপজেলার বৃকুষ্টিয়া গ্রামে ঝড়ে বাড়ির ওপরে ভেঙে পড়া গাছের ডাল কাটতে গিয়ে নিচে চাপা পড়ে আব্দুল হালিম (৫০) নামের একজন মারা গেছেন। তিনি গ্রামের আনছার আলীর ছেলে।

বগুড়া আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া জানান, ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ৮৮.৬ কিলোমিটার। ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দমকা বাতাসের পাশাপাশি ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। চলতি মৌসুমে এটাই সর্বোচ্চ গতিবেগের ঝড়।

ঝড়ে বগুড়া শহরে পুলিশ লাইনস, বিয়াম মডেল স্কুল, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, শহরের শহীদ খোকন পার্ক ও এডওয়ার্ড পার্কে এবং রেললাইনের পাশে বহু গাছ উপড়ে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ির টিনের চালা উড়ে গেছে। নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী ওমর ফারুক জানান, বগুড়ায় ঝড়ে লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ভোররাত ৪টা থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তবে সকাল থেকে গাছ অপসারণসহ মেরামতকাজ চলছে।

গাছচাপায়, বজ পাতে মৃত ৩

কক্সবাজারের চকরিয়ায় উপজেলার শান্তিনগর গ্রামে গতকাল সকাল ১০টার দিকে বাড়ির উঠানে কাজ করার সময় বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো বাতাসে একটি মরা গাছ ভেঙে ওপরে পড়লে আবদু শুক্কুর (৪০) নিহত হন। তিনি গ্রামটির নূর হোসেনের ছেলে। ফরিদপুরের মধুখালীর গন্ধখালী পূর্ব পাড়া গ্রামে গতকাল ভোরে বাড়ির টিউবওয়েল থেকে পানি আনার সময় ঝড়ে রেইন্ট্রির ঢাল ভেঙে ওপরে পড়লে এক নারী প্রাণ হারান। নিহত রাবেয়া বেগম (৫৫) গন্ধখালী পূর্ব পাড়ার মুনসুর হোসেনের স্ত্রী। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আতারবাজার কাকপাড়ায় গতকাল দুপুরে বৃষ্টির মধ্যে বজ পাতে আলতাফ হোসেনের (৪৫) মৃত্যু হয়। তিনি এলাকার খলিল উদ্দীনের ছেলে।

কলেজছাত্রের মরদেহ উদ্ধার

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীতে একটি মাছ ধরা নৌকায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বজ পাতে নিখোঁজ কলেজছাত্র মো. আউয়ালের (২২) মরদেহ গতকাল সকাল ৮টায় উদ্ধার করা হয়েছে। সদরের ধুলাউড়ি ঘাটের অদূরে আউয়ালের মরদেহ মাছধরা জালে বেঁধে ভেসে ওঠে। একই ঘটনায় মৃত আউয়ালের বাবা বদিউর রহমানের (৫০) মরদেহ শুক্রবার সকালে উদ্ধার করেন ডুবুরিরা। তাঁদের বাড়ি শিবগঞ্জের মনোহরপুর গ্রামে।

বাড়ি-ফসলের ক্ষতি, বজ পাতে মৃত ১

ঝিনাইদহ সদর, কালীগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় গতকাল সকালে ১০ মিনিটের ঝড়-বৃষ্টিতে কাঁচা-আধাপাক ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিধ্বস্ত এবং আম, কলা, লিচুসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শৈলকুপা উপজেলার কুলচারা গ্রামের মাঠে কাজ করার সময় বজ পাতে রূপসী বেগম (৩২) নিহত ও তাঁর স্বামী গোলাম নবী গুরুতর আহত হন। সদর উপজেলার ডেফলবাড়িয়া গ্রামে বজ পাতে কৃষক আশরাফুল ইসলামের গোয়ালঘরে দুটি মহিষ মারা গেছে। ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়ায় চার ঘণ্টা ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। কালীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ উপমহাব্যবস্থাপক রথীন্দ্রনাথ বসাক জানান, ঝড়ে বেশ কিছু বিদ্যুতের পোল ভেঙে গেছে। ৩৩ কেভি লাইনে গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে গেছে। এসব স্থানে মেরামতকাজ চলছে।

জেলের মরদেহ উদ্ধার

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের চরএকরিয়া ও জয়নগরের মাঝে গজারিয়া নদীতে গতকাল সকালে ঝড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয়রা। নিহত শামসুল হক আকন চরএকরিয়া গ্রামের আব্দুল জলিল আকনের ছেলে।

ঘাটাইলে বিধ্বস্ত পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দেউলাবাড়ী, রসুলপুর, সংগ্রামপুর ও লখিন্দর ইউনিয়নে গতকাল ভোর ৫টার দিকে শুরু হয়ে আধাঘণ্টা স্থায়ী বৈশাখী ঝড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ পাঁচ শতাধিক কাঁচা ও আধাপাকা ঘর বিধ্বস্ত হয়। ভেঙে গেছে কয়েক হাজার গাছ। নষ্ট হয়েছে ক্ষেতের পাকা ধান। আম, লিচু, কলাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন হয় সংযোগ।

ঝড়ে দেউলাবাড়ী ইউনিয়নের এম কে ডি আর উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনটি আধাপাকা ঘর ভেঙে যায়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হায়দার আলী জানান, ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যালয়ের ৪০ লক্ষাধিক টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লখিন্দর গ্রামের কৃষক রশিদ মিয়ার গোয়ালঘরের ওপর গাছ উপড়ে পড়ায় দুটি গরু ও একটি ছাগল মারা গেছে।

নওগাঁয় আমের ব্যাপক ক্ষতি

নওগাঁ জেলায় শুক্রবার রাত ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে আম এবং বিভিন্ন ফল ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামসুল ওয়াদুদ বলেন, ঝড়ে জেলায় সাত হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমির কাঁচা আম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর, মান্দা ও ধামইরহাট। পত্নীতলায় দুই হাজার ২৫০ হেক্টর, সাপাহারে তিন হাজার ৫০০ হেক্টর, পোরশায় এক হাজার ৫০ হেক্টর, ধামইরহাটে ৪৭৫ হেক্টর ও নিয়ামতপুরে ৪৮০ হেক্টর জমির কাঁচা আম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উড়ে গেছে শত শত ঘরের টিনের চালা। উপড়ে গেছে অনেক গাছ। অনেক স্থানে তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে ঝড় হয়। বৃষ্টি হয়েছে ৪৩ মিলিমিটার।

গতকাল জেলার সাপাহার, পোরশা ও পত্নীতলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাগানে বাগানে মাটিতে পড়ে আছে আম। স্তূপ করেও রাখা হয়েছে। এসব আমের বেশির ভাগই ফেটে নষ্ট হয়েছে। আমের বেশির ভাগই অপরিপক্ব। এসব আম বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বস্তা (প্রায় ৫০ কেজি) দরে।

ঘরবাড়ি, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলাজুড়ে শুক্রবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে আধাঘণ্টার ঘূর্ণিঝড় ও ভারি বৃষ্টিতে বাড়িঘর, দোকান, ধান, আম, শাক-সবজিসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. তৌফিক আল জুবায়ের বলেন, ৪৭৫ হেক্টর জমির আম ও লিচুবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সহস্রাধিক গাছ বিনষ্ট

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় গতকাল সকালে ৫-৬ মিনিটের ঘূর্ণিঝড়ে সহস্রাধিক গাছ উপড়ে পড়াসহ অর্ধশত কাঁচা ঘর ভেঙে গেছে। চালার টিন উড়ে গেছে। কলা, পেঁপে, আম, লিচুসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়াসহ লাইন বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

সাড়ে ৩০০ মণ ধান নিয়ে ট্রলারডুবি, নিখোঁজ ২

মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা সেতুর অদূরে মাঝ পদ্মায় গতকাল ভোরে ঝড়ের কবলে পড়ে সাড়ে ৩০০ মণ ধানসহ একটি ট্রলার ডুবে গেছে। এ সময় ট্রলারটিতে ১৩ জন কিষান ও দুজন মাঝিমাল্লা ছিলেন। ১৩ জন সাঁতার কেটে তীরে উঠতে পারলেও দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন হেলাল খলিফা (৩৮) ও দাদন মাতবর (২৮)। দাদন মাদারীপুরের শিবচরের রাজাচর মোল্লাকান্দির শফি মাতবরের ছেলে এবং হেলাল মান্নান খলিফার ছেলে।

দাদনের বড় ভাই বাবুল ফকির জানান, তাঁরা ১৩ কিষান ২৯ দিন ধরে শ্রীনগরের আড়িয়ল বিলে ভাগীদার হিসেবে পানিতে ধান কাটেন। ভাগ হিসাবে সাড়ে ৩০০ মণ ধান পেয়েছেন। সেই ধান নিয়ে গতকাল লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাট থেকে একটি ট্রলারে তাঁরা শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ঘাটের উদ্দেশে রওনা দেন। তিনি কেঁদে বলেন, ‘আগামো সব শেষ হইয়া গেলো। কত স্বপ্ন নিয়া বাড়ি যাইতেছিলাম। ’

মাওয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির আইসি মো. আবু তাহের জানান, নিখোঁজদের সন্ধানে শ্রীনগর ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও স্বজনরা কাজ করছে।

কুষ্টিয়ায় বিধ্বস্ত বহু গ্রাম

কুষ্টিয়ায় গতকাল ভোরে ঝড়-বৃষ্টিতে লণ্ডভণ্ড হয় বহু গ্রাম। শত শত হেক্টর জমির আম, কাঁঠাল, লিচুসহ ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপড়ে পড়েছে হাজার হাজার গাছ। ভেঙে পড়েছে বিদ্যুত্ব্যবস্থা।

বাল্কহেড ও ট্রলারডুবি

ভোলার ধনিয়া তুলাতলী মাছ ঘাট এলাকার মেঘনা নদীতে গতকাল সকালে বৈশাখী ঝড়ে মেঘনা নদীর ভাঙন রোধে ব্যবহৃত বালুবোঝাই বাল্কহেড ডুবে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় বাল্কহেডে থাকা সুকানিসহ ছয় শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়। ঝড়ে নদীর পারের তিনটি দোকানও বিধ্বস্ত হয়। জেলার মনপুরা উপজেলার লতারচরসংলগ্ন মেঘনা নদীতে সকালে মাছ ধরার সময় বৈশাখী ঝড়ে আট জেলেসহ একটি ট্রলার ডুবে যায়। পরে আট জেলেকেই উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড।

উড়ে গেছে ঘরের চাল, ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত

চুয়াডাঙ্গায় গতকাল ভোরে বৈশাখী ঝড়ে উড়ে গেছে অনেক কাঁচা ঘরের টিনের চাল। আলমডাঙ্গা, পোড়াদহ স্টেশনের মাঝামাঝি স্থানে গাছের ডাল ভেঙে রেললাইনের ওপর পড়ায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ ছিল খুলনা-পোড়াদহ ট্রেন চলাচল।



সাতদিনের সেরা