kalerkantho

রবিবার । ৩ জুলাই ২০২২ । ১৯ আষাঢ় ১৪২৯ । ৩ জিলহজ ১৪৪৩

‘কে জানে কারা কোন দিক দিয়ে হিসাব করে’

তামজিদ হাসান তুরাগ   

২১ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘কে জানে কারা কোন দিক দিয়ে হিসাব করে’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। তবে সেই দাম বৃদ্ধির গতি বাস্তবে থাকলেও নেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে। তারা বলছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির গতি মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে কিছুটা কমেছে।

বিবিএস বলছে, গত মার্চের তুলনায় এপ্রিল মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি কমেছে ০.১০ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ মার্চ মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬.৩৪ শতাংশ, এপ্রিল মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬.২৪ শতাংশে। তবে কারো কারো মতে, এই হিসাবে কিছুটা হলেও গরমিল আছে। বাস্তবতার সঙ্গে এই হিসাব মেলে না।

এ বিষয়ে বিবিএসের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের পরিচালক মো. জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘এপ্রিল মাসে ভোজ্য তেলের দাম কিছুটা বাড়লেও চাল, পেঁয়াজ, রসুন, সবজি এবং কিছু খাদ্যদ্রব্যের দাম কিছুটা কম ছিল। তাই খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘সারা দেশের বাজার থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা প্রতি মাসে পণ্যের মূল্য সংগ্রহ করেন। সেই মূল্য গড় করে আমরা মাসিক মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করে থাকি। ’

তবে জিয়াউদ্দীনের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন খুচরা বিক্রেতারা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী মো. কাওছার বলেন, এপ্রিল মাসের শুরু থেকে ব্রয়লার মুরগি ও গরুর মাংসের দাম ছিল বাড়তির দিকে। সর্বশেষ তিনি গরুর মাস ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। কিন্তু মার্চ মাসে তিনি এই গরুর মাংস বিক্রি করেছেন ৬৫০ থেকে ৬৮০ টাকায়। আরেক ব্যবসায়ী সিদ্দিক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মার্চ মাসের শেষের দিক থেকে শুরু করে গোটা এপ্রিল মাস পর্যন্ত ছিল সয়াবিন তেলের সংকট। এই সংকটে দাম বেড়েছে একটু একটু করে। মার্চে যে দামে মালামাল বিক্রি করেছি, তার থেকে বেশি দামে বিক্রি করেছি এপ্রিলে। ’

ব্যবসায়ী সিদ্দিক হোসেনকে বিবিএসের হিসাব জানানো হলে তিনি বলেন, ‘কে জানে কারা কোন দিক দিয়ে হিসাব করে। ’ আর মো. কাওসার বলেন, ‘কারা এগুলো হিসাব করে, এদিকে তো কাউকে আসতে দেখি না। ’

২৯ এপ্রিলের বাজারের তথ্য-উপাত্ত ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর আগের সপ্তাহে যে সয়াবিনের (খোলা) লিটার ছিল ১৫৫ টাকা, ওই সপ্তাহে সেই সয়াবিন বিক্রি হয় ১৮৪ টাকা লিটার। টিসিবির হিসাবে খোলা পাম তেলের দাম বেড়েছে ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১৪৫ টাকা লিটার খোলা পাম তেলের দাম ওই দিন ছিল ১৬৫ টাকা। ২২ এপ্রিল ৬০ টাকা কেজি দেশি রসুন ২৯ মে বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। টিসিবির হিসাবে দাম বৃদ্ধির হার ৩০ শতাংশ। দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছিল ৫ শতাংশের বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের সপ্তাহে দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ২৮ টাকায় পাওয়া যেত, কিন্তু এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে দাম বেড়ে যায়। ২৯ এপ্রিল পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে খোলা ময়দার দাম বাড়ে কেজিতে পাঁচ টাকা। আগের সপ্তাহে যে ময়দার কেজি ছিল ৫০ টাকা, ওই সপ্তাহে সেই ময়দা বিক্রি হয় ৫৫ টাকায়। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহে এই পণ্যটির দাম বাড়ে ৭ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া এপ্রিল মাসে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ব্যবসায়ীরা গরুর মাংসের কেজি বিক্রি করেছেন ৭০০ টাকা থেকে ৭১০ টাকা। অনেকে গরুর মাংস বিক্রি করেছেন ৭২০ থেকে ৭৩০ টাকা, যা মার্চ মাসেও বিক্রি হয়েছে ৬৫০ থেকে ৬৮০ টাকায়।

তবে বিবিএসের তথ্য-উপাত্ত যে একবারেই ভুল, জরিপ না করে তা বলা যাবে না বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, তারা যেহেতু সারা দেশ থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গড় করে, তাই তাদের হিসাব ভুল সেটা বলা যাবে না। বাজারভেদে তথ্য-উপাত্ত এক নয়। তবে তারা কিন্তু বলেনি যে বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম কমেছে। তারা বলেছে, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার গতি কমেছে।

তবে বিবিএসের প্রতিবেদন বলছে, টানা তিন মাসের মতো সার্বিকভাবে এ মাসেও বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬.২২ শতাংশ। এপ্রিলে এসে তা দাঁড়ায় ৬.২৯ শতাংশে, যা দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২১ সালের একই মাসে এই হার ছিল ৫.৫৭ শতাংশ। বিবিএসের সর্বশেষ হিসাব বলছে, খাদ্যে মূল্যস্ফীতি কমেছে। আর গত মাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে দেশের গ্রামাঞ্চলে, শতকরা হিসাবে এ হার ৬.৫৯ শতাংশ।

তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের দেওয়া মূল্যস্ফীতির হিসাব বিজ্ঞানসম্মত নয় ও অবাস্তব। সরকারের দেওয়া  মূল্যস্ফীতির হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার আদৌ মিল নেই। সম্প্রতি তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। এই মূল্যস্ফীতি সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশও করেন তিনি।

 



সাতদিনের সেরা