kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

প্রদর্শনী

শতবর্ষী সারিন্দা দেখার সুযোগ

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১৯ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শতবর্ষী সারিন্দা দেখার সুযোগ

ময়মনসিংহ নগরীর কাচিঝুলি এলাকায় ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ভবনের নিচতলায় চলছে সারিন্দা প্রদর্শনী। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ময়মনসিংহ ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চল ভাংনামারীর চর থেকে প্রায় ১০ বছর আগে একটি পুরনো সারিন্দা সংগ্রহ করেছিলেন পুরনো বাদ্যযন্ত্রের সংগ্রাহক রেজাউল করিম আসলাম। এরপর তিনি অনেক স্থানে বেশ কিছু পুরনো সারিন্দার খোঁজ পান। গ্রামে কারো রান্নাঘরে, কারো গোয়ালঘরে সেসব সারিন্দা অনাদরে পড়ে থাকলেও তাঁরা তা হাতছাড়া করতে চান না।

চার বছর আগে আসলামের সঙ্গী ময়মনসিংহের গৌরীপুরের আব্দুল মজিদ (৬০) সারিন্দা সংগ্রহের কাজে যুক্ত হন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বড় হন লালমনিরহাটে। তাই ওই অঞ্চলে বেশ কিছু পুরনো সারিন্দার খোঁজ জানা ছিল তাঁর। নিজের চেষ্টা আর মজিদের সহায়তায় আসলামের সংগ্রহে এখন বেশ পুরনো সারিন্দার সংখ্যা ১২।

এই ১২ সারিন্দা দিয়ে আসলাম গতকাল বুধবার ময়মনসিংহ শহরে আয়োজন করেছেন তিন দিনব্যাপী (১৮ থেকে ২০ মে) এক প্রদশর্নীর। উদ্দেশ্য, পুরনো এ বাদ্যযন্ত্রটি নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলা। কারণ কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে সারিন্দা।

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে নগরের কাচিঝুলি এলাকার ব্যাপটিস্ট চার্চ ভবনের নিচতলায় প্রদর্শনীটির আয়োজক এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম। আয়োজনে সহযোগিতায় রয়েছে নোভিস ফাউন্ডেশন ও ময়মনসিংহ বাউল সমিতি। প্রদর্শনী প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত। আয়োজনটির সঙ্গে রয়েছে পুথিপাঠ, বাউল বৈঠক, শিশুদের সংগীত ও যন্ত্রসংগীত।

রেজাউল করিম আসলাম জানান, তাঁর সংগ্রহে রয়েছে বিলুপ্ত, বিলুপ্তপ্রায় ও চলমান প্রায় ৬০০ বাদ্যযন্ত্র। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ১৭ থেকে ১৯ শতকের সংগৃহীত ১২টি সারিন্দা। এর মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রামের রহমান ফকিরের (৭৫) কাছ থেকে পাওয়া ৩৬৫ বছরের পুরনো, লালমনিরহাটের কালীরহাটের গুণধর বাবুর কাছ থেকে পাওয়া ৩০০ বছরের পুরনো ও লালমনিরহাটের দুর্গাপুরের দেবীরপাটের মনা সাধুর কাছ থেকে পাওয়া ২৫০ বছরের পুরনো সারিন্দা। এ ছাড়া রয়েছে গৌরীপুরের নাও ভাঙ্গার চরের মোক্তার হোসেন ফকির (৫১) থেকে পাওয়া চার প্রজন্মের ব্যবহৃত ২০০ বছরের পুরনো সারিন্দা। এটি ব্যবহার করতেন মোক্তার ফকিরের বাবা রমজানী আলী ফকির, দাদা ইয়াছিন ফকির, তাঁর বাবা জমির ফকির। হালুয়াঘাট থেকে পাওয়া কীর্তিনিয়া মনীন্দ্র ওস্তাদজির ব্যবহৃত ১৫০ বছরের পুরনো সারিন্দাও রয়েছে।

প্রদর্শনী নিয়ে আসলাম বলেন, ‘সারিন্দার তৈরিকারক, বাদক, উপকরণ—সবই হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় সারিন্দা ছিল খুবই মূল্যবান। যাঁরা বাজাতেন, তাঁরাও ছিলেন মরমি লোক। এগুলো হারানোর বা নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই উদ্যোগ। এই সারিন্দা কারো রান্নাঘর, কারো গোয়ালঘর, কারো উগার বা সিলিং থেকে পাওয়া গেছে। যাঁদের কাছে পাওয়া গেছে, তাঁরা জানেন না এর ঐতিহাসিক বা ঐতিহ্যগত মূল্য কত। অনেক সারিন্দা লাকড়ি বা মাটিতে ফসিল হয়ে গেছে। এই প্রদর্শনী থেকে যদি কেউ জানতে পারে, তাহলে আমাদের পুরনো সারিন্দাগুলো বিলুপ্ত হবে না। আর নতুন প্রজন্মের কাছে এই দেশীয় যন্ত্র নিয়ে আগ্রহ তৈরি হবে। ’

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার উপকিপার মুকুল দত্ত বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজন আরো বেশি হওয়া উচিত। তাহলে বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছলে আমাদের লোকজ সম্পদ ও ঐতিহ্য রক্ষা পাবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব সারিন্দা পাওয়া যায়, তা সাধারণত ছুতার বা কাঠমিস্ত্রির দ্বারা বাদকের নির্দেশানুযায়ী তৈরি। কেউ কেউ নিজের সারিন্দা নিজেই বানিয়ে নিতেন কুড়াল, খোন্তা, বাইশা, বাটাল দিয়ে। সে ক্ষেত্রে মনপবন, নিম, চন্দন, লোহা, শাল, বৈলাম ও মেহগনি কাঠ ব্যবহার করা হতো। ’

প্রদর্শনী দেখতে গাজীপুরের মাওনা থেকে আসা সাদিকুল হায়দার রুবেল বলেন, এক বন্ধুর কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি এসেছেন। এগুলো দারুণ সংগ্রহ।

আয়োজনটির সঙ্গে কাজ করছেন আসলামের দুই মেয়ে—সমন্বয়কারী হিসেবে জয়িতা অর্পা এবং শৈল্পিক নির্দেশনায় জাওয়াতা আফনান।

 

 



সাতদিনের সেরা