kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস

বিস্ময়ের ভাণ্ডার জাতীয় জাদুঘর

সালেহ ফুয়াদ   

১৮ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিস্ময়ের ভাণ্ডার জাতীয় জাদুঘর

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে দেশের হাজারো ইতিহাস-ঐতিহ্য। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মাত্র ১৩ টাকার বিনিময়ে হাসনাপুর চাকলার সদারাম সরদার যে তাঁর ছয় বছরের কন্যাকে জেনেশুনে দাসি হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিলেন, এ তথ্য আজকের বাংলাদেশে অবিশ্বাস্যই মনে হবে। কিন্তু এই বাংলায়ও রীতিমতো দলিল করে দাস কেনাবেচা হতো। নিকট অতীতে দাস হিসেবে মানুষ কেনাবেচার প্রমাণ পাওয়া যায় ময়মনসিংহ থেকে পাওয়া দুটি দলিলে। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো দলিল দুটি আছে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে।

বিজ্ঞাপন

দলিলটি সম্পাদিত হয় ১২১৪ বঙ্গাব্দের ৩ শ্রাবণ। বাংলা হরফে লেখা দলিলটি তৈরি হয়েছিল সেকালের তুলট কাগজের ওপর।

গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভারতের অংশ বাংলার ঢাকা শহর সফরে এলে স্থানীয় বিশিষ্টজনরা তাঁর কাছে এখানে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ঢাকাবাসীর এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে লর্ড কারমাইকেল ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট তৎকালীন সচিবালয়ের (বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের) একটি কক্ষে ‘ঢাকা জাদুঘর’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। পরের বছর ২৫ আগস্ট এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বর্তমানে শাহবাগে যে জাতীয় জাদুঘরটি রয়েছে, এটিই সেই ‘ঢাকা জাদুঘরের’ পরিবর্তিত রূপ।

মাত্র ৩৭৯টি নিদর্শন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা এই জাদুঘরে বর্তমানে প্রায় ৯৪ হাজার নিদর্শন রয়েছে। বাঙালি জাতির প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রাচীন বাংলার সব ধর্ম-বর্ণের জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপাদান, প্রত্ননিদর্শন ও বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহাসিক দলিল-নথিপত্র এই জাদুঘরের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ। প্রস্তর ও ধাতুর ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মুদ্রা, শিলালিপি, তুলট ও তালপাতায় লেখা সংস্কৃত, আরবি, উর্দু, ফারসি ও বাংলায় লেখা দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি আছে এখানে। বাংলাদেশে পাওয়া প্রাগৈতিহাসিককালের একমাত্র প্রস্তর কুঠারটি মনে করিয়ে দেবে, প্রস্তরযুগেও এখানে মানুষের বসবাস ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের হাতির টেরাকোটার ফলক পাওয়া গেছে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে প্রত্নতত্ত্ব খননের সময়। মন্দির বা গৃহ অলংকরণে ব্যবহৃত এ টেরাকোটা জানান দেয় এ অঞ্চলে তখনকার উন্নতমানের পোড়ামাটির শিল্পসামগ্রীর কথা। আছে টিপু সুলতান ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার তরবারি, উনিশ শতকে এ দেশের গজদন্তশিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি হাতির দাঁতের পাটি—এ রকম হাজারো নিদর্শন।

সংরক্ষিত সামগ্রী প্রদর্শন করতে জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে ছয়টি বিভাগ। ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কিত নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। ৫৩ হাজার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মুদ্রাসহ ৬৭ হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে এ বিভাগে। জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগ বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জীবনধারা সম্পৃক্ত লোকজ ও ধ্রুপদি আঙ্গিকের ঐতিহ্যমণ্ডিত শিল্পকর্ম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিভাগ সৃজনশীল ধারার সমকালীন শিল্পকর্ম সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণার কাজ করে। প্রদর্শনীর জন্য এ বিভাগে সাতটি গ্যালারি রয়েছে। জাদুঘরের ১০টি গ্যালারিতে গাছগাছড়া, কীটপতঙ্গ, পশুপাখি, মূল্যবান খনিজ ও শিলাজাত নিদর্শনের প্রদর্শন করে প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগ। জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগ সর্বসাধারণের জন্য নানামুখী অনানুষ্ঠানিক শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ বিভাগের গ্রন্থাগারে ৪০ হাজারেরও বেশি গ্রন্থ ও সাময়িকী রয়েছে। জাদুঘরের সংগৃহীত নিদর্শন যথাযথ উপায়ে সংরক্ষণের জন্য রয়েছে ‘সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগ’। প্রদর্শনীর জন্য জাদুঘরে মোট ৪৪টি গ্যালারি রয়েছে। এ ছাড়া সিলেটের ওসমানী জাদুঘর, ঢাকার আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা এবং ফরিদপুরের পল্লীকবি জসীমউদ্দীন সংগ্রহশালাও শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের অধীনে পরিচালিত হয়।

সাংস্কৃতিক চিন্তার বিনিময়, এর সমৃদ্ধি এবং জনসাধারণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা ও শান্তির উন্নয়নের জন্য ১৯৭৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালিত হয়ে আসছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস’ প্রতিবছর ১৮ মে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করে থাকে। গত বছর ১৫৮টি দেশের ৩৭ হাজার জাদুঘর এ দিবস পালন করেছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘জাদুঘরের শক্তি’। জাদুঘরকে বলা হয় সমাজের আয়না। কোনো দেশের জাতীয় জাদুঘর ঘুরলে সে দেশ ও জাতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এ জন্য এটিকে জনসাধারণের বিশ্ববিদ্যালয়ও বলা হয়।

 



সাতদিনের সেরা