kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

শতবর্ষী স্টিমার হবে ভাসমান হোটেল

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

১৫ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শতবর্ষী স্টিমার হবে ভাসমান হোটেল

শতবর্ষের ঐতিহ্যের পেডাল স্টিমার আর যাত্রীসেবায় ফিরছে না। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরিশাল নৌবন্দরে কয়লার আঁচে চলা পেডাল স্টিমারের ভোঁ ভোঁ আওয়াজের কথা অনেকের মনে আছে। কীর্তনখোলা, মেঘনা আর পদ্মা পাড়ি দেওয়া সেই স্টিমার এখনো ঢাকায় রয়েছে। তবে কয়লার আগুনে আর তা চলে না; বিকল্প এসেছে ডিজেল। আর স্টিমারের পেছনে থাকা সেই প্রপেলার নয়, ঠিক সাইকেলের মতো দুই পাশে চার থেকে আট জোড়া পেডাল ওঠানামা করে এগিয়ে চলে সেই জাহাজ।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের নদীতে একসময় চলত পেডালচালিত স্টিমার। এই অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিআইডাব্লিউটিসির এই স্টিমারগুলো। কিন্তু ঐতিহ্যের সেই পেডাল স্টিমার আর যাত্রীসেবায় ফিরছে না। ঢাকার বুকে সেই স্টিমার চালানো হলে নতুন করে দেশ-বিদেশের পর্যটক টানা যাবে। পেডাল স্টিমারই অন্যতম আকর্ষণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সেই ভাবনা থেকে পিএস টার্ন ও লেপচা নামের দুটি স্টিমারকে ভাসমান হোটেলে রূপ দেওয়ার জন্য দরপত্র আহবান করা হয়েছে।

হেরিটেজ স্টিমার

প্রায় শত বছর আগে ইংল্যান্ডের রিভার অ্যান্ড স্টিম নেভিগেশন (আরএসএন) কম্পানির বিশাল বিশাল স্টিমার চলাচল করত বাংলাদেশের নদীতে। বাহারি নাম ছিল সেসবের—ফ্লেমিঙ্গো, ফ্লোরিকান, বেলুচি ইত্যাদি।

আগে এসব স্টিমার কয়লার দ্বারা উৎপাদিত স্টিমে চলত বলে স্টিমার বলা হতো। এখন চলে ডিজেলে। এর পরও নাম রয়ে গেছে স্টিমার। আবার কোনো এক অজানা কারণে এর অন্য স্থানীয় নাম ‘রকেট সার্ভিস’। হয়তো আগের দিনে এটি ছিল সবচেয়ে গতিসম্পন্ন, তাই এ নামকরণ!

ইতিহাস বলছে, সারা বিশ্বে হাতে গোনা যে কয়টি পেডাল স্টিমার আছে, তার মধ্যে চারটি আছে বাংলাদেশে। এগুলোর নাম হলে—পিএস মাসহুদ, অস্ট্রিচ, লেপচা ও টার্ন। এর মধ্যে আকারে বড় হলো ‘মাসহুদ’ ও ‘অস্ট্রিচ’। প্রায় শতবর্ষ পুরনো স্টিমার দুটি তৈরি হয়েছিল যথাক্রমে ১৯২৮ ও ১৯৩৮ সালে কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে।

কয়লার বদলে ডিজেল

ব্রিটিশ আমলে মূলত বরিশাল থেকে ঢাকার মধ্যে যাত্রী পরিবহনের কাজে কয়লায় চলা স্টিমারগুলো ব্যবহৃত হতো। সেগুলোর গতিবেগ ঘণ্টায় পাঁচ থেকে ছয় নটিক্যাল মাইল। ডিজেল ইঞ্জিন আসার পর সেই  স্টিমার উঠে যায়। ডিজেল ইঞ্জিনের আরো বড় সুবিধা হলো, স্টিমারের পেছনে লাগানো প্রপেলারের সাহায্যে সেগুলো ঘণ্টায় আট থেকে দশ নটিক্যাল মাইল বেগে চলতে পারে।

আর পুরনো স্টিমারে পেডালগুলো লাগানো থাকে দুই পাশে। ঠিক যেভাবে সাইকেলে পেডাল করলে তা এগোতে থাকে, কয়লার স্টিমারের ক্ষেত্রেও পেডালগুলো দুই পাশে ওঠানামা করত, এগিয়ে যেত স্টিমার। শুরুর দিকে এসব স্টিমারে জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহার করা হতো। আশির দশকের শুরুতে এগুলো ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়। বড় দুটি পেডাল দিয়ে সামনের দিকে এগোয় বলে এর অন্য নাম পেডাল স্টিমার।

যাত্রীসেবা বন্ধ : ঢাকার সদরঘাট থেকে ছেড়ে স্টিমার চাঁদপুর হয়ে পরদিন সকালে বরিশাল পৌঁছে। বরিশালে যাত্রাবিরতি করে আধাঘণ্টার মতো। এরপর নলছিটি, ঝালকাঠি, কাউখালী, হুলারহাট (পিরোজপুর), চরখালী, বড় মাছুয়া, সন্ন্যাসী হয়ে মোরেলগঞ্জ। আগে খুলনা পর্যন্ত যেত, কিন্তু নাব্যতা সংকটের কারণে আর যেতে পারে না।

জানা গেছে, এ পথে বর্তমানে এমভি মধুমতী ও এমভি বাঙ্গালী নামে মাত্র দুটি সরকারি জাহাজ সপ্তাহে দুই দিন সার্ভিসের মাধ্যমে কোনো রকম টিকে আছে। গেল ঈদে ঢাকা, বরিশাল ও মোরেলগঞ্জ রুটে প্রথম বিশেষ সার্ভিস দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এমভি মধুমতীর মাস্টার আব্দুল হাই বলেন, পিএস মাসহুদ সার্ভিসে আনা হয়েছিল গত এপ্রিলের শুরুতে। কিন্তু ফিটনেস না থাকায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দু-তিনটি ট্রিপ দিয়ে বাদামতলী ঘাটে রাখা হয়েছে। সংরক্ষণ করা হবে জাহাজটি। এটিই ছিল পেডাল ইঞ্জিনচালিত সর্বশেষ স্টিমার। পিএস টার্ন ও লেপচা করোনার আগে এ পথে চলত। ওই দুটি স্টিমারকে ভাসমান হোটেলে রূপ দেওয়ার জন্য দরপত্র আহবান করা হয়েছে। অস্ট্রিচও গেছে তিন-চার বছর আগে।

আব্দুল হাই আরো বলেন, এর মাধ্যমে পেডালচালিত স্টিমার আর হয়তো সার্ভিসে আসছে না। সত্তরের দশকের আগে এই জাহাজগুলো ঢাকা, বরিশাল ও মোরেলগঞ্জ রুটে চলাচল করত। মাস্টার হাই বলেন, তিনি একসময় পিএস মাসহুদ চালিয়েছেন। পেডাল ইঞ্জিনচালিত এ ধরনের স্টিমার আর নেই। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য দুই পাশে প্রপেলার। এগুলোর স্পিড নেই, মান্ধাতা আমলের; কিন্তু ঐতিহ্যবাহী।

বিআইডাব্লিউটিসির বরিশালের ব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন বলেন, পিএস মাসহুদ সার্ভিসে নেই। এটির ফিটনেস না থাকায় ডক ইয়ার্ডে রাখা হচ্ছে। পিএস টার্ন ও লেপচা নামের স্টিমার দুটি ভাসমান হোটেলে রূপ দেওয়ার জন্য দরপত্র আহবান করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এগুলো আর হয়তো যাত্রী সার্ভিসে আসতে পারবে না। বিদেশি পর্যটকদের কাছে বেশ প্রিয় এ সার্ভিস। অনেক বিদেশি শুধু এটাতে চড়তেই বাংলাদেশে আসেন।



সাতদিনের সেরা