kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

প্রত্নতত্ত্ব

মাটির নিচে প্রাচীন নিদর্শন

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাটির নিচে প্রাচীন নিদর্শন

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুুনি ইউনিয়নের রেজাকপুরে মাটি খুঁড়তেই মিলেছে মূর্তি, টেরাকোটা, মাটির তৈরির আংটা, কড়ি ইত্যাদি। ছবি : কালের কণ্ঠ

মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে নানা ধরনের প্রাচীন নিদর্শন। মিলেছে মূর্তি, টেরাকোটা, মাটির তৈরি বড় কড়াইয়ের আংটা, কড়ি ইত্যাদি। এসব নিদর্শন হাজার-বারো শ বছর আগের বলে ধারণা করা হচ্ছে। খননের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আরো খনন করা হলে আরো নিদর্শন মিলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুুনি ইউনিয়নের রেজাকপুরে মিলেছে এসব নিদর্শন। একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খননদল এখানে খননকাজ চালায়। গত ১২ মার্চ থেকে শুরু করে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এই খননকাজ চলে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা এই খননদলটির নেতৃত্বে ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রেজাকপুর গ্রামে আমরা যে নিদর্শনগুলো পেয়েছি তা এই খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা অঞ্চলে পাওয়া নিদর্শনের সঙ্গে মিল রয়েছে। বিশেষ করে ভদ্রা-হরিহর নদীর পারে যশোরের কেশবপুরের ভরতভায়নার নিদর্শনের সঙ্গে এর খুব মিল। সেখানকার ইটগুলোর সঙ্গে এখানে পাওয়া ইটগুলোর খুবই সাদৃশ্য রয়েছে। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, নিদর্শনগুলো এক হাজার থেকে বারো শ বছরের পুরনো হবে। ’ তবে সঠিক সময় নির্ধারণের জন্য আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।   

সুন্দরবনসংলগ্ন এই অঞ্চলে আগেও অনেক প্রাচীন নিদর্শন মিলেছে। এমনকি এই রেজাকপুর গ্রামের অনেক বাড়িতে এখানে যে ধরনের  বিশেষ টালিসদৃশ ইট পাওয়া গেছে, তার ব্যবহার আছে। এ থেকে অনুসন্ধানকারীদের  ধারণা, এই রেজাকপুর ও এর আশপাশে আরো অনেক প্রাচীন নিদর্শন আছে। স্থানীয়ভাবে মানুষের কাছে এগুলো ‘ঢিবি’ নামে পরিচিত ছিল এবং মানুষ এখানকার এই বিশেষ ইট নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। কপিলুমনি ও সংলগ্ন সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার একাধিক জায়গায় এমন ঢিবি রয়েছে।

এই অঞ্চলে বহুদিন আগে থেকেই মানুষের বসতি বলে ধারণা করা হয়। মহাকাব্য রামায়ণে কপিলেশ্বর মুনি ও বিশাল জলাভূমির বনের উল্লেখ রয়েছে। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে কপিলমুনিতে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও স্থানের উল্লেখ করেছেন। এই এলাকায় একাধিক ঢিবি থাকার কথাও বলেছেন। পুকুর খননের সময় এই অঞ্চলে বুদ্ধ প্রতিমা পাওয়া গিয়েছিল। কপিলমুনি বাজারের মন্দিরে থাকা বিষ্ণুমূর্তিটিও বারো শ থেকে চৌদ্দ শ বছর আগের বলে ধারণা করা হয়।

এখানকার খননের সঙ্গে যুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক দলটিও বলছে, কপিলমুনি, রেজাকপুর, রামনগর, সিংহজানি, কাশিমনগরসহ আশপাশের এলাকাজুড়ে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। তাঁরা রেজাকপুরের এই নিদর্শনটিকে ‘কপিলমুনি ঢিবি’ নামে অভিহিত করেছেন। এর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ২৫০ মিটার, প্রস্থ ১৮০ মিটার। ঢিবিটি সমুদ্রতল থেকে ৩.৪৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই ঢিবি এলাকা ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি। মানুষ এখানকার ইট নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে। সেখানে রাস্তা, বসতবাড়ি, গোয়ালঘর, পুকুর, ডোবা, ফলবাগান, বাঁশঝাড় ইত্যাদি রয়েছে। ঢিবির ইট তুলে তুলে সেখানে গর্ত করে ফেলা হয়েছে। আর ওই তোলা ইট নিজেদের ঘরবাড়িতে ব্যবহার করেছে। সেখানেই প্রায় ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৮০ মিটার প্রস্থ এলাকাজুড়ে খননকাজ চলছে। সমতল থেকে প্রায় সাত ফুট গভীরে মাটি খনন করা হয়েছে। এতে মূল প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা স্পষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি চলছে নমুনায়ন ও লিপিবদ্ধ করার কাজ। ঢিবিতে একটি বর্গাকার স্থাপত্য কাঠামো আবিষ্কৃত হয়েছে। বর্গাকার এই কক্ষটি ঘিরে একটি প্রদক্ষিণ পথ রয়েছে, যা একটি দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এখানে বিভিন্ন ধরনের মাটির পাত্র ও মাটির পাত্রের টুকরা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে হাঁড়ি, কলস, বাটি, থালা, বদনা, কড়াই, প্রদীপ ইত্যাদির অংশবিশেষ। এ ছাড়া পোড়ামাটির ফলকের ভাঙা অংশ, পোড়ামাটির প্রতিমার ভগ্নাংশ, অলংকৃত ইট, কড়িসহ বিভিন্ন ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণ পাওয়া গেছে।

বর্গাকার স্থাপত্য কাঠামোর উত্তর-পশ্চিম কোণ ও উত্তর-পূর্ব কোণের প্রদক্ষিণ পথের বাইরের দেয়ালের মাটির সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় কালো রঙের চাল পাওয়া গেছে। একে পোড়া চাল বলছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। এই চাল নিয়ে গবেষণা করলে এখানকার প্রাচীন আমলের ধানের প্রজাতিসহ প্রকৃতি-প্রতিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে তাঁদের ধারণা।

রেজাকপুরে খনন শুরু হওয়ার পর থেকে ছোট-বড় নানা মানুষ, শিক্ষার্থী, এমনকি বিদেশি প্রতিনিধিদলও এখানে এসেছে। এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে অনিসন্ধিত্সু পাঠক অ্যাডভোকেট বিপ্লব কান্তি মণ্ডল দুই-এক দিন পর পর এই খননস্থলে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক পরে হলেও রেজাকপুরে খননকাজ করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ একটি যথাযথ কাজ করেছে। তবে এই খননকাজটি আরো অনেক বিস্তৃত হওয়া উচিত। এত দিন খননে উদ্যোগী না হওয়ায় অনেক নিদর্শন হারিয়ে গেছে। যা আছে, তা রক্ষা করার জন্য খননকাজ আরো করা উচিত। ’



সাতদিনের সেরা