kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

পদ-পদবির দখল নিতে সংঘাত

মোবারক আজাদ   

২৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পদ-পদবির দখল নিতে সংঘাত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি পাঁচ বছরেও। ছাত্রলীগ করা অনেকের এই সময়ে ছাত্রত্ব শেষ হয়ে গেছে পদ-পদবি পাওয়া ছাড়াই। পদধারী মাত্র দুজন নেতা আছেন বছর তিনেক ধরে। বাকিরা হতাশায় নিমজ্জিত।

বিজ্ঞাপন

আর এই হতাশা থেকেই সংগঠনে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। নেতারাই বলছেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপে কেউ কারো নির্দেশনা মানতে চায় না। সামান্যতেই লেগে যায় সংঘর্ষ-মারামারি।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবারের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া করে কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশনা থাকলেও তা হয়নি। এই কমিটিতে পদ পেতে ১৪০০ জন জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন।

২০১৯ সালের ১৪ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজাউল হক রুবেলকে সভাপতি ও ইকবাল হোসেন টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এই কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ‘দ্রুত সময়’ শেষ হয়নি। এ জন্য সভাপতি ও সম্পাদককে দোষারোপ করছেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের নেতাকর্মীরা।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই চবি শাখা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এরপর সাড়ে পাঁচ বছর পার হয়েছে। এর মধ্যে দুই দফায় চবি শাখা ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বিলুপ্ত করা হয় ওই পূর্ণাঙ্গ কমিটি।

চবি ছাত্রলীগ মূলত দুই গ্রুপে বিভক্ত। একটি গ্রুপ নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী এবং অন্যটি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী। এই দুই গ্রুপের অধীনে আবার বিভিন্ন নামে ১১টি উপগ্রুপ রয়েছে। এসব উপগ্রুপের মধ্যে নাছিরের অনুসারী সিক্সটি নাইন, ভিএক্স, রেড সিগনাল, বাংলার মুখ, কনকর্ড, এপিটাফ, একাকার, উল্কা ও সংগ্রাম গ্রুপ। অন্যদিকে নওফেলের অনুসারী সিএফসি ও বিজয় গ্রুপ।

বর্তমান সভাপতি রেজাউল হক রুবেল সিএফসি গ্রুপের নেতা এবং নওফেলের অনুসারী। সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু সিক্সটি গ্রুপের নেতা এবং আ জ ম নাছিরের অনুসারী।

এসব উপগ্রুপের নেতাকর্মীরা জানান, রুবেল-টিপু দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে উপগ্রুপের নেতাকর্মীরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার দাবি তুলে আসছিলেন। কমিটির জন্য বেশ কয়েকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশও করেছেন তাঁরা। এর পরও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সর্বশেষ চলতি মাসের ১৩ জানুয়ারি চবি ছাত্রলীগের কার্যক্রম দেখতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই নেতা আসেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশী বিভিন্ন উপপক্ষের নেতাকর্মীরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার দাবি জানিয়ে মূল ফটকে তাঁদের আটকে দেন। পরে দুই নেতার আশ্বাসে তাঁরা সরে যান। এর পাঁচ দিন পরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি করাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক বিজয় গ্রুপ ও সিএফসির নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান। এতে উভয় পক্ষের অনন্ত ১৩ জন আহত হন।

এসব উপগ্রুপের নেতাকর্মীরা বলছেন, সঠিক সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় চবি ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ কোনো ধরনের পদ-পদবি ছাড়াই শিক্ষাজীবন শেষ করছে এবং ক্যাম্পাস ছাড়ছে। কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় তারা হতাশাগ্রস্ত। যেকোনো তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। কেউ কারো নির্দেশনা মানছে না। যদি পূর্ণাঙ্গ কমিটি থাকত তাহলে বিদ্যমান ১১টি উপগ্রুপের প্রতিটির সদস্য অনুসারে অনন্ত পাঁচ থেকে ৩০টির মতো পদ থাকত। ফলে শৃঙ্খলা বজায় থাকত এবং জুনিয়ররা নির্দেশনা মেনে চলত।

চবি ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিজয় গ্রুপের নেতা মো. ইলিয়াস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সামনে তাঁরা ঘোষণা দিয়েছিলেন ২৫ জানুয়ারির মধ্যে খসড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি তৈরি করে কেন্দ্রীয় সেলে পাঠাবেন। এখনো তাঁরা সে পথে আগাননি। এটা মোটেও সুখকর বিষয় না। কারণ যাঁরা ছাত্রলীগ করেন তাঁরা দিন শেষে পদ-পদবির প্রত্যাশা করেন।

দীর্ঘদিন রাজনীতি করে কোনো পদ-পদবি না পাওয়া অমানবিক ও দুঃখজনক বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সাবেক উপসম্পাদক ও আরএস গ্রুপের নেতা রকিবুল হাসান দিনার। তিনি বলেন, ‘২৫ জানুয়ারি মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার কথা ছিল। যেহেতু হয়নি। তাই আমাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে। ’

ভিএক্স গ্রুপের নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয় বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, আমাদের অভিভাবক আ জ ম নাছিরের নির্দেশনা মতে দ্রুত কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে পদপ্রত্যাশীদের দুঃখ ঘোচাবেন বর্তমান নেতারা। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্রলীগকর্মী বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে তাঁরা (রুবেল-টিপু) ব্যর্থ। তাঁদের কোনো সফলতার গল্প নেই। শিগগির এ কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হলে তা বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণা দেওয়া হোক। কারণ ক্যাম্পাসে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়ররা ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের। কিন্তু এখনো ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের বড় ভাইয়েরাও কমিটির আশায় বসে আছেন। অনেকে চলেও গেছেন। চলতি বছরে ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী চলে আসছে। এতে লম্বা একটা গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু ছাত্রলীগ কর্মীদের ‘পরিচয়হীনতায়ই’ নয়, ক্যাম্পাসে সব ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

ছাত্রলীগ সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদ পেতে ইচ্ছুকদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। এতে ১৪০০ জন জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন।

পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন সময় জানতে চাইলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁদের নানা সীমাবদ্ধতা, কর্মী যাচাই-বাছাই, করোনা মহামারিসহ ‘হল কমিটি আগে নাকি পূর্ণাঙ্গ কমিটি আগে’ এ রকম নানা কারণ দেখিয়েছেন।

জানতে চাইলে সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, জীবনবৃত্তান্তগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নতুন যাঁরা দিচ্ছে এগুলো দেখছি। কাজ শেষ হলে জমা দিয়ে দেব। কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে কথা হয়েছে। স্থানীয় অভিভাবক আ জ ম নাছির ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে।

সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, ‘আমরা জীবনবৃত্তান্তগুলো যাচাই-বাছাই করছি, অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকিয়ে ত্যাগী ও আদর্শ কর্মীদের নিয়ে কমিটি করতে। আশা করি এ মাসে (জানুয়ারি) নামগুলো কেন্দ্রে পাঠাব। আগামী মাসের যেকোনো সময় ২০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হবে। ’ তিনি বলেন, ‘সব জীবনবৃত্তান্তই যাচাই-বাছাই করে তালিকা করছি। কারণ পূর্ণাঙ্গ কমিটির পর আবাসিক হল কমিটি ও ফ্যাকাল্টি কমিটি দেওয়া হবে। ’

এসব বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে একাধিকবার তাঁদের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তাঁরা রিসিভ করেননি।

 



সাতদিনের সেরা