kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্না থামছে না

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি   

২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্না থামছে না

‘আমারে এখন দেখার কেউ নাই। বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে থাকি। চেয়ারম্যান মামুন ১৫ হাজার টাকা আর ২৫ কেজি চাল দিয়েছে। ওসব দিয়ে কী হবে! আমার তো সব শেষ!’ চোখের পানি মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন শৈলকুপার সারুটিয়া ইউনিয়নে গত ৩১ ডিসেম্বর নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত অখিল কুমারের স্ত্রী বাসন্তী রানী।

বিজ্ঞাপন

দিনমজুরের কাজ করতেন অখিল। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ভূমিহীন অখিল কিত্তিনগর আবাসন প্রকল্পে ঘর পেয়েছিলেন। সেখানে এখন বাসন্তী তাঁর মা-বাবাকে নিয়ে থাকেন।

একই নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হন হারান বিশ্বাস। তিনিও ওই আবাসনের বাসিন্দা ছিলেন। হারানের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীকে হারিয়ে প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আবাসনের ঘর ছেড়ে নাথপাড়া গ্রামে স্বজনদের সঙ্গে কাটছে তাঁর জীবন। হারান দিনমজুর ছিলেন।

ষাটোর্ধ্ব সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী ভোট নিয়ে কারো পক্ষে-বিপক্ষে কাজ করেনি। ওই দিন বিকেলে চা খাওয়ার কথা বলে তিনি বাজারে যান। আর ফিরে আসেননি। তিনি মারা যাওয়ার পর চেয়ারম্যান মামুন কিছু টাকা দিয়েছে কুলখানি করতে। প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে আমি এখন কী খেয়ে বাঁচব জানি না। ’ কথাগুলো বলতে বলতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সুফিয়া।

শৈলকুপার সারুটিয়া ইউনিয়নে নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতায় পাঁচজন মারা যান। আহত হয়েছেন আরো অনেকে। প্রতিপক্ষের বিপুল ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। হারান ও অখিলের পরিবারের মতো একই অবস্থা জসিম উদ্দীন, আব্দুর রহিম ও মেহেদি হাসান স্বপনের পরিবারের।

সারুটিয়া ইউনিয়নে দুই প্রভাবশালী চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহামুদুল হাসান মামুন ও বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী জুলফিকার কায়সার টিপুর সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতায় এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

সারুটিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নৌকা মার্কার প্রার্থী হন মাহামুদুল হাসান মামুন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী জুলফিকার কায়সার টিপু। ওই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন মাহামুদুল হাসান মামুন। পরাজিত জুলফিকার কায়সার টিপু হাফ ডজন হত্যা মামলা মাথায় নিয়ে বর্তমানে পলাতক।

গত ৩১ ডিসেম্বর ইউনিয়নের কাতলাগাড়ি বাজারে নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় অখিল কুমার ও হারান বিশ্বাস আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে হারান মারা যান। আর অখিল ৫ জানুয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এরপর ১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ইউনিয়নের ভাটবাড়িয়ায় জসিম উদ্দীন নামের এক যুবককে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। ৮ জানুয়ারি নির্বাচনী সহিংসতায় আহত আব্দুর রহিম রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

সব শেষ সারুটিয়া গ্রামের দবির শেখের ছেলে মেহেদি হাসান স্বপনকে গত ২১ জানুয়ারি রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করা হয়। গত শনিবার ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

সারুটিয়া ইউনিয়নের বিজয়ী চেয়ারম্যান মাহামুদুল হাসান মামুন বলেন, ‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্বাচন বানচাল করতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলেন। জনগণ ওই সন্ত্রাসী তৎপরতার পাল্টা জবাব দিয়েছে ভোটের মাধ্যমে। ’

জুলফিকার কায়সার জানান, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে জড়ানো হচ্ছে। এসব চক্রান্ত। তাঁকে এলাকাছাড়া করতে এসব করা হচ্ছে।

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার সাঈদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে বিবদমান পক্ষগুলো সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে নির্বাচনকেন্দ্রিক হানাহানিতে বেশ কয়েকজন মারা যান। প্রতিটি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। বেশ কিছু আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত আছে। ’



সাতদিনের সেরা