kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

পাঠাগার

বিজন গ্রামের বাতিঘর

এম. সাইফুল মাবুদ, ঝিনাইদহ   

২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিজন গ্রামের বাতিঘর

মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগারের সদস্যরা বই পড়ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঝিনাইদহের সীমান্তসংলগ্ন প্রত্যন্ত গ্রাম কালুহুদা। সেই গ্রামে কামরুজ্জামান টুটুল প্রতিষ্ঠা করেছেন মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগার। এ পাঠাগার ঘিরে এলাকার মানুষের মধ্যে বই পড়ার বেশ উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। তৈরি হয়েছে একটি পাঠকশ্রেণি।

বিজ্ঞাপন

মজার ব্যাপার হলো, টুটুল পাঠাগার গড়ে তোলার প্রেরণা পান ২০০০ সালে মহেশপুর এলাকায় হওয়া আকস্মিক বন্যা থেকে। সেই বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁদের এলাকার মানুষ। বই-খাতার অভাবে দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন টুটুল বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্য বই সংগ্রহ করে নিজের বাড়ির একটি ঘরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সুযোগ করে দেন। সেই থেকে শুরু হয় তাঁর পাঠাগার করার স্বপ্ন দেখা। স্বপ্নটা বাস্তবে রূপ নেয় ২০০১ সালের ১৩ জুলাই। মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু সেদিনই।   

মহেশপুর উপজেলার কালুহুদা গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে কামরুজ্জামান টুটুল। শৈশবে  পিতৃহারা হন টুটুল। বিধবা মায়ের উৎসাহে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (এমকম) অর্জন করেন তিনি।

৫০টি বই নিয়ে মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়। টুটুল তখন বিকমের ছাত্র। তখন থেকে কেটে গেছে দুই দশক। বইয়ের সংগ্রহ এখন সাড়ে পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগার এখন এলাকার বাতিঘর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামসহ এলাকার মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা এবং সরকারি কিছু অনুদানে টুটুলের স্বপ্ন আজ অনেকটাই স্বার্থক। শুরুর টিনের ছাপরা থেকে এখন তা উন্নীত হয়েছে পাকা ঘরে।

বই পড়ার পাশাপাশি টুটুল গ্রন্থাগারের সদস্যদের নিয়ে মানবিক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালান। রাস্তার পাশে ও গরিব মানুষের বাড়িতে বিনা মূল্যে বৃক্ষরোপণ করেন তিনি। পাঠাগারের উদ্যোগে দরিদ্রদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, গরিব-মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের সহায়তা, কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বাল্যবিয়ে, যৌতুক, নারী নির্যাতন, ইভ টিজিং, মাদক ও আর্সেনিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে প্রজেক্টরের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করেন টুটুল। তরুণ প্রজন্মকে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস জানাতে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনীও করেন। এ গ্রন্থাগারের ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার’-এ আছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই। ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য শিশু কর্নার ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে টুটুলের।

গ্রন্থাগারের সদস্যসংখ্যা এখন ২৮২। টুটুলের গ্রন্থাগার দেখে উৎসাহিত হয়ে মহেশপুরের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে আরো ১০টি পাঠাগার। বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগিতায় মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগারের ব্যবস্থাপনায় গত বছর ঈদুল ফিতরে দরিদ্রদের মধ্যে শাড়ি ও লুঙ্গি বিতরণ করা হয়। ঈদুল আজহায় একটি বড় গরু কোরবানি করে গ্রামের দরিদ্র মানুষের মধ্যে মাংস বিতরণ করা হয়।

কামরুজ্জামান টুটুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার গ্রামসহ এ এলাকার মানুষের জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করাই মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগারের লক্ষ্য। শূন্য হাতে এলাকার মানুষের ভালোবাসা পুঁজি করে, অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ আমার স্বপ্নের গণগ্রন্থাগারটি মানুষের কাছে জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত। ’ টুটুল এ জন্য তাঁর মা শুকতারা বেগমের কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি মহেশপুরের বাইরে গেলে গ্রন্থাগার দেখাশোনা করেন তাঁর মা।

পাঠাগারের ঘরটি পাকা হলেও এখনো প্লাস্টারসহ জানালা-দরজার কিছু কাজ বাকি রয়েছে। জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রজেক্টরের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের কাজ ব্যাহত হচ্ছে একটি ল্যাপটপের অভাবে।

মা শুকতারা বেগম বলেন, ‘টিউশনির আয় ও বাড়ির গাছের ফল বিক্রি করে পাওয়া অর্থ, এমনকি আমার সাংসারিক খরচের টাকা থেকেও লাইব্রেরির পেছনে ব্যয় করে টুটুল। লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর আমি তাকে চাকরির জন্য চাপ দিয়েছি। কিন্তু সে তার প্রাণের লাইব্রেরি ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। ’

পাঠাগারের উপদেষ্টা সহকারী অধ্যাপক আবু জাহিদ বলেন, ‘মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগার এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে। এ ছাড়া অসাম্প্রদায়িক, মানবিক মানুষ টুটুল নিঃস্বার্থভাবে অসহায় ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহযোগিতা করে চলেছেন। ’



সাতদিনের সেরা